ঢাকা, সোমবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ৮ কার্তিক ১৪২৪

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

অদম্য বিশ্বাসের দৃশ্যমান পদ্মা সেতু

২০১৭ অক্টোবর ০৪ ১৫:২৭:০৯
অদম্য বিশ্বাসের দৃশ্যমান পদ্মা সেতু

কবীর চৌধুরী তন্ময়


পদ্মার বুকে পদ্মা সেতুর দৃশ্যমান-এই ছবিটি শুধু মুল মিডিয়াতেই শোভা পায়নি; স্যোশাল মিডিয়া জুড়েও এক আনন্দোচ্ছল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে পদ্মার দুই পাড়ের বসবাস করা মানুষজন থেকে আরম্ভ করে দূরের মানুষজনের মাঝেও। অনেকে আবার গাড়িতে করে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এই দৃশ্য অবলোকন করেছে। সেই দৃশ্য নিজ মোবাইলে ধারণ করে ইন্টারনেটেও ভাইরাল করেছে।

বলা যেতে পারে, সকল ষড়যন্ত্রকারীদের মুখে চুন-কালি মেখে অবশেষে পদ্মার বুকে পদ্মা সেতু ঠায় দাঁড়িয়ে জানান দিচ্ছে, যে দেশে বঙ্গবন্ধু’র কন্যা শেখ হাসিনার মতন নেতার অদম্য আত্মবিশ্বাস অটুট থাকে, সে দেশ ও জাতি কখনো কারো কাছে মাথা নত করতে পারে না। আর সেটা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানীসহ পুরো বিশ্বকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বুঝিয়েছিল। এখন তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও দেশি-বিদেশি সকল ষড়যন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে অবশেষে নিজ অর্থায়নে কীভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায় তার দৃষ্টান্ত পদ্মার বুকে পদ্মা সেতুর দৃশ্যমান করার মাধ্যমে আবারও প্রমাণ করেছে।

মনে পড়ে খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে বিএনপিসহ চার দল এবং সমমনা দলের আয়োজিত মহাসমাবেশের কথা। তখন বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তাঁর প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছিলেন, দুর্নীতির কারণে এ (শেখ হাসিনা) সরকার পদ্মা সেতু করতে পারবে না। আর এ দুনীতির সঙ্গে কারা জড়িত, বিশ্বব্যাংক স্পষ্ট করে সরকারকে জানিয়েছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বিশ্বব্যাংক টাকা ছাড় করবে না। সেই সঙ্গে আইএমএফ, জাইকাসহ অন্যান্য দাতা গোষ্ঠীও টাকা ছাড় করবে না। আমরা জানি, কারা এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তাই আমরা ক্ষমতায় এলে তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাব। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দুটি পদ্মা সেতু করা হবে। একটি হবে মাওয়ায় অন্যটি পাটুরিয়ায়।

এখানে দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, বেগম খালেদা জিয়ার কোনও স্বপ্নই আর পূরণ হবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ একদিকে ইতোমধ্যেই পদ্মার বুকে পদ্মা সেতু ঠায় দাঁড়ানোর দৃশ্যটি তার একটি স্বপ্নকে শেখ হাসিনার একক সাহস আর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এখন সময় মাত্র। অন্যদিকে ২০১৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কানাডার আদালত পদ্মা সেতুর দূর্নীতির মামলাটি শুধু খারিজই করেননি বরং এটি যে গুজবের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল তাও বিশ্ববাসির কাছে তুলে ধরেন। আবার এই মামলার যে কোনো দালিলিক তথ্য-প্রামণ নেই তাও স্পষ্ট করেন।

তাহলে বলতেই হচ্ছে, খালেদা জিয়ার সেই মিথ্যা অভিযোগ, তিঁনিও জানেন কারা কারা দূর্নীতির সাথে জড়িত এগুলো তখন ছিলো নিছক গুজব যা তথ্য-প্রমাণ নির্ভর করে না। আর অন্যটি শেখ হাসিনার সরকার পদ্মা সেতু করতে পারবে না-এটাও পদ্মার বুকে পদ্মা সেতুর দৃশ্যমানের মিথ্যা প্রমাণীত।

বন্ধুগণ! মেজর জিয়া, বিএনপি ও খালেদা জিয়া যে শুধু তখন এই ধরনের মিথ্যাচার বা গুজব ছড়িয়েছে তা কিন্তু নয়। পরিকল্পিতভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ সম্ভ্রম হারানো নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অনবরত মিথ্যাচার করে জাতিকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করার ষড়যন্ত্র করেছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানী ছায়া রাষ্ট্র বানানোসহ দূর্নীতিতে পাঁচ-পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন করেছে। সিরিজ বোমা হামলা করে জাতিকে জিম্মি করার ষড়যন্ত্র, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার করে তাদের অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করার ষড়যন্ত্র, যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারকাজ চিরতরে বন্ধ করার ষড়যন্ত্র থেকে আরম্ভ করে এমন কোনো ষড়যন্ত্র-মিথ্যাচার নেই যে খালেদা জিয়া ও বিএনপি করেনি।

সেইসব মিথ্যাচারে তখন বিএনপি’র ব্যক্তি বন্ধু এবং তাদের মিত্র মহলও যুক্ত হয়েছিল। মিডিয়া, স্যোশাল মিডিয়া এমনকি টেলিভিশন টকশোগুলোতেও পদ্মা সেতুর দূর্নীতি নিয়ে পারলে উলঙ্গ হয়ে সমালোচনা করে। সেইসব ষড়যন্ত্রকারী-মিথ্যাচারদের অনেকেই তখন বলেছিল, পদ্মা সেতু তো দূরে থাক; পদ্মা সেতুর একটা পিলারও দাঁড় করাতে পারবে না। শুধু তাই নয়। তখন পদ্মা সেতুর কথিত দূর্নীতি নিয়ে শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের নিয়েও নানা রকমের রং রাঙ্গিয়ে ঢং সাজিয়ে মিথ্যাচার করে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে।

আজ সত্য এতোটাই তিক্ত হয়ে সেই সব ষড়যন্ত্রকারী-মিথ্যাচারদের মুখে কলঙ্কের কালি মেখে পদ্মা সেতুর শুধু একটা পিলার নয়, দুই দুটো পিলারের মাঝে স্প্যান বসিয়ে দৃশ্যমান করা হয়েছে। পদ্মার বুকে পদ্মা সেতু শেখ হাসিনার সততা আর অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের এক অন্যন্য উদাহরণ হয়ে ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে রইল।

একটু পিছনে গেলে মনে পড়ে, পদ্মা সেতুর এই দৃশ্যের দৃশ্যায়ণ করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে এই শেখ হাসিনাকে। দেশি-বিদেশি সকল ষড়যন্ত্রের কারণে বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলো যখন পদ্মা সেতুর প্রকল্প থেকে তাদের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেয়, তখন ষড়যন্ত্রকারীসহ বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু’র কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর অদম্য সাহস আর অটুট বিশ্বাসের সাথে আমাদের নিজেস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু হবে বলে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন।

ষড়যন্ত্র-মিথ্যাচারকারীরা তখন শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে হাসি-তামাশার বিষয় বস্তু বানিয়েছিল। মিডিয়া, স্যোশাল মিডিয়াসহ সমাজ-রাষ্ট্রের কতিপয় বুদ্ধিজীবী নিজ-নিজ হিসেব নিকেস দিয়ে বার-বার এটি কখনো সম্ভব নয় বলে যে ধরনের সমালোচনা করেছে শেখ হাসিনা তা পাত্তা না দিয়ে বরং নিজ সংকল্পে অটল থেকে পদ্মা সেতুর নির্মাণের জন্য অর্থ তহবিল সংগ্রহের কাজে মনোযোগ দিয়েছিল।

তিঁনি সাধারণ মানুষের কাছে উদাত্ত আহবান জানান তহবিল সংগ্রহে সহযোগিতার জন্যে।

২০১২ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে পদ্মা সেতুর অর্থ সংগ্রহে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংকে দুটি করে ব্যাংক হিসাব খোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং ৮ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় তফসিলি ব্যাংকগুলো হিসাবও খোল হয়। আর মন্ত্রিসভার সভার বৈঠকে সরকারের সকল মন্ত্রী তাদের এক মাসের সম্মানী পদ্মা সেতু অর্থ ফান্ডে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করে। পাশাপাশি সচিবরাও তাদের একটি উৎসব ভাতার সমপরিমাণ অর্থ পদ্মা সেতুর অর্থ ফান্ডে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী সেই অর্থ নির্ধারিত ব্যাংকে জমাও করেন তারা।

অবাক করার বিষয়, পদ্মা সেতুর অর্থ তহবিল সংগ্রহের তখন রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী-সাংসদ, সচিব, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণ ও প্রবাসীরা পর্যন্ত শেখ হাসিনার আহবানে সাড়া দিয়ে টাকা পাঠানো শুরু করেন। তখন কতিপয় ষড়যন্ত্রকারী-মিথ্যাচারগণ ছাড়া সবাই শেখ হাসিনার ডাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।

আর সেই সাহস নিয়েই একটি সুনির্দিষ্ট্য পরিকল্পনা এবং শেখ হাসিনার একান্ত চিন্তা-ভাবনায় সাজানো হয় পদ্মা সেতুর অর্থ ভান্ডার। ৬ হাজার ৮শ’ ৫২ কোটি টাকা ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরের বাজেটে প্রথম বরাদ্দ করার মাধ্যমে নিজেস্ব অর্থায়নে মুল পদ্মা সেতুর কাজ এগুতে থাকে। পরবর্তী ২০১৪-২০১৫ সালে ৮ হাজার ১শ’ কোটি, ২০১৫-২০১৬ সালে ৭ হাজার ৮শ’ কোটি, ২০১৬-২০১৭ সালে ৬ হাজার কোটি এবং ২০১৭-২০১৮ সালের অর্থ বছরে ৫ হাজার ৫শ’ ২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।

২০১২ সালের ১০ জুলাই শেখ হাসিনা মন্ত্রী সভার বৈঠকে পদ্মা সেতুর প্রস্তুতিমুলক কাজ শুরু করার নির্দেশ দানের মাধ্যমে নিজেস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ চুড়ান্ত হয় এবং ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মুল সেতুর কার্যক্রম শুরু করেন।

ষড়যন্ত্রকারী, দূর্নীতিবাজদের কাছে অবাক হলেও সত্য যে, পদ্মা সেতুর প্রকল্পে কথিত দূর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার মতন সবগুলো দাতা সংস্থা যেখানে পিছু হটে; সেখানেই শেখ হাসিনা আশার আলোর মশাল জ্বালিয়ে সামনে হাঁটে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের সাথে যখন বিশ্ব মোড়লও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পক্ষে, সেখানেও বঙ্গবন্ধু’র কন্যা শেখ হাসিনা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল দীপ্ত সাহসে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। অবশেষে দেশিয় ও আন্তর্জাতিক সকল ষড়যন্ত্র শেখ হাসিনার অদম্য সাহস, সততা আর আত্মবিশ্বাসের কাছে পরাজয় বরণ করে পদ্মার বুকে পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান ইতিহাস।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট ফোরাম (বোয়াফ), মোবাইল : ০১৭১১০৭৫১৮৭, kabir_tanmoy@yahoo.com