ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

'রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা তহবিল ১০৮৭ এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা'

 

২০১৭ অক্টোবর ১০ ২২:৩৬:১১
'রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা তহবিল ১০৮৭ এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা'
 

সমরেন্দ্র বিশ্বশর্মা


৯ অক্টোবর সোমবার সকাল ১০ টায় নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরনার্থীদের জন্য মানবিক কারণে আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনে সমাজের মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, বিভিন্ন বিভাগীয় কর্মকর্তা সহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সমন্বয়ে একটি সভা আহবান করেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুকতাদিরুল আহমেদ ।

অবশ্য আমি যথাসময়ে গিয়ে সভাস্থালে দেখি, কেউই সভায় আসেননি। তখন মনটা কিছুটা খারপ হলেও ১১টার মধ্যে আবার একে একে সব প্রতিনিধি এসে যার যার আসনে বসতে শুরু করেছেন। শুরু হল সভা। সভাপতির স্বাগত ব্যক্তব্য দিলেন নির্বাহী অফিসার। তার সারিতে এসে বসেন, উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নারী নেত্রী জাহানারা রোজি, কেন্দুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো: সিরাজুল ইসলাম এবং কিছুক্ষণ পর আসেন উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো: মোফাজ্জল হোসন ভূঞা। স্বাগত বক্তব্য দিয়ে উপজেলা নির্বাহী সকলের মতামত আহবান করেন।

এরপর প্রথমে বক্তব্য রাখেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: সাইফুল ইসলাম। এরপরই আমি দাড়াঁই কথা বলতে। শুরুতেই গত কিছুদিন আগে আমার একটি লেখা ‘‘রোহিঙ্গা শরনার্থী আশ্রয়, বিশ্ব মায়ের দায়িত্ব পালন করলেন শেখ হাসিনাই” এই শিরোনামে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সর্ম্পকে কিছু বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা শরনাথীদের সহায়তা দিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি ও সকল পেশাজীবিদের নিকট বিনয়ের সঙ্গে আহবান জানাই। তাছাড়া আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকেও উলামা পরিষদের কাছে দেয়া মাত্র ২০০ টাকা অনুদানের কথাও প্রকাশ করি। সেই সঙ্গে জনকল্যাণে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আমাদের পথ চলা, এ শ্লোগান নিয়ে গত ৩০ জুন গঠিত কেন্দুয়া উপজেলা প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকেও ২ হাজার টাকা রোহিঙ্গা শরনার্থীদের সহায়তা দিতে ঘোষনা করি।

সভায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, রূপালী ব্যাংক কেন্দুয়া শাখা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাখাওয়াৎ হোসেনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তিনি তার নিজের টাকা দিয়েই রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা তহবিল রূপালী ব্যাংক কেন্দুয়া শাখা চলতি হিসাব নং-১০৮৭ খুলে দিয়েছেন। এ জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবারও ধন্যবাদ। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ১০৮৭ হিসাব নম্বরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দেয়া ২ লক্ষাধিক টাকা জমা পড়েছে বলেও জানা যায়। উলামা পরিষদ, শিল্পপতি মনিরুজ্জামান শামীম এবং কেন্দুয়া হরিসভা দূর্গামন্দির সোমবারের সভাতেই নগদ অর্থ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের হাতে তুলে দেন। এরপর উপস্থিত সকলেই সহায়তায় দিতে প্রতিশ্রুতি দেন।

সভা শেষ করে উপজেলা পরিষদ গেইটের সামনে সন্ধানী পেপার এন্ড রাজিব কম্পিউটারে বসে আমার পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসাবে সংবাদ লিখছিলাম। লেখাও প্রায় শেষের দিকে তখন বেলা অনুমান দেড়টা। ঠিক এই মুহুর্তে আমার ০১৭১৮৭০৪৪২৬ নম্বারে অজ্ঞাত একটি নম্বার থেকে ফোন আসে। ফোনের সে প্রান্ত থেকে বলা হয়, দাদা আপনার স্ত্রী অপু রানী বিশ্বাস অটো রিকশায় চাকায় কাপড় পেচিয়ে দিয়ে দূর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। আমি খবরটি শুনে স্বব্দ হয়ে যাই। মনে মনে খুব কষ্ট পেয়েছি। সারা জীবনের জন্যই হয়তা আমার স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলেছি। কারণ অটো রিকশায় চাকায় কাপড় পেচিয়ে দূর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাই বেশি হয়। এই ধরনের সংবাদ আমি নিজেও পরিবেশন করেছি অনেক। তারপর রিকশা যোগে চিরাং মোড়ে গিয়ে বিষন্ন মনে অপেক্ষা করতে থাকি আমার স্ত্রীর জন্য। কিছুক্ষণ পর অটো রিকশাটি আমার আহত স্ত্রীকে নিয়ে এলো। চেনা যাত্রী হিসাবে পেলাম বাট্টা গ্রামের দলির লিখক সুলতান ভাই। আরেক জন গগডা গ্রামের। তারা দু জনই বোনের মর্যাদা দিয়ে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে সেবা যতœ দিয়ে নিয়ে আসেন আমার স্ত্রীকে। তারপর আমি আমার স্ত্রী অপুকে আমার কোলে বসালাম। দেখি তার বাম হাতে পেটে-পিটে ব্যাথা পেয়েছে আঘাত লেগেছে। হাসপাতালে যাচ্ছি আর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি। মনে মনে পরম করুনাময় সৃষ্টিকর্তার প্রতি বারবার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমার স্ত্রীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলাম, তারা সেখানে জরুরী চিকিৎসা দিয়ে বললেন, ইচ্ছা করেলে ভর্তি করতে পারেন অথবা বাসায় নিতে পারেন। স্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী আমি তাকে বাসায় নিয়ে এলাম। বাসায় রেখে বিকালে আবার সংবাদ লিখতে বসলাম দুটি সংবাদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় নগত অর্থ জমা দেয়ার একটি অপরটি আমার স্ত্রী অসুস্থার। মূলত আমি যে কথাটি বলতে চাচ্ছি, তা হলো তা হলো, ‘‘ভূপেন হাজারিকা লাখো লাখো মানুষের মাঝে গেয়েছেন মানুষ মানুষের জন্যে, একটু সহানুভূতি, আবার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন সবার উপর মানুষ সত্য, তার উপরে নাই ইত্যাদি। আমি বলতে চাচ্ছি রোহিঙ্গারাও মানুষ। তারাও অসহায় নির্যাতিত হয়ে আমাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে এসেছে। এদের মধ্যে দুধের শিশু, প্রাপ্ত বয়স্ক, যুবক, নারী ও শতবর্ষী কিছু মানুষও আছে। তাদের সুন্দর বাড়িঘর পেলে রেখে এখানে এসেছে আশ্রয় নিতে। এখানে তাদের কোন বাড়ি নেই, কোন ঘর নেই। এক অজানা উদ্দেশ্যেই তারা এসেছে। কিন্তু আমরা যেভাবে বাসাবাড়ি নিয়ে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধাসহ বসবাস করছি তারাও কিন্তু আমাদের মত বাড়িঘর ফেলে রেখে এসেছে। বর্তমানে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রিত অথ্যাৎ গোটা বাঙ্গালি জাতির আশ্রিত শরনার্থী তারা। এই অসহায় মানুষের পাশে দাড়িঁয়েছেন শেখ হাসিনা। তাই প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি আমরা যদি এই রোহিঙ্গাদের তহবিলে ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকা, ১০০ টাকা, ২০০ টাকা, ৫০০ টাকা, ১০০০ টাকা, ২০০০ টাকা, ৫০০০ টাকা, ১০০০০ টাকা, ৫০০০০ টাকা অথ্যাৎ যার যে সামর্থ্য আছে সেই সামর্থ্য মোতাবেক রূপালী ব্যাংক, কেন্দুয়া শাখা চলতি নং- ১০৮৭ তে টাকা জমা দেই অথবা ইউএনও অফিসে জাম দেই তাহলে অসহায় রোহিঙ্গাদের অনেক উপকারে আসবে। আমার সামান্য কিছু টাকায় যদি একটি বৃদ্ধ মানুষের বা একটি দুধের শিশুর জীবন বাঁচে, তাহলে এর চেয়ে বড় মানবতা এবং মানুষের জন্য ধর্ম কর্ম আর কিছু থাকতে পারে আমি মনে করি না। এ কথা আমি মানি এবং দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি। কারণ আমি মনে করি, রোহিঙ্গাদের জন্য সামান্য যে কিছু অর্থ জমা দিয়েছি কেন্দুয়া উলামা পরিষদের কাছে এর ফলেই হয়তবা সৃষ্টিকর্তা আমার স্ত্রীকে এই দূর্ঘটনা থেকে সাক্ষাত বাঁিচয়ে রেখেছেন।

তাই আমি বিনয়ের সঙ্গে কেন্দুয়া উপজেলাসহ দেশের সকল মানুষকে অনুরোধ জানাবো, মানবতার পাশে দাড়াঁন, রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য রূপালী ব্যাংক, কেন্দুয়া শাখায় চলতি হিসাব নং-১০৮৭ তে অথবা নিজ নিজ উপজেলার হিসাবে অথবা কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের হিসাবে টাকা জমা দিন, বিপন্ন মানবতার পাশে দাড়াঁন। শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের বানীতে বলেছেন, অপরের মঙ্গল কামনা করাই, নিজের মঙ্গলের প্রসূতি।

লেখক: সমকাল সাংবাদিক ও উপদেষ্টা সম্পাদক দৈনিক ময়মনসিংহ প্রতিদিন, সভাপতি কেন্দুয়া উপজেলা প্রেসক্লাব।
মোবাইল : ০১৭১৮৭০৪৪২৬
E-mail: sbskendua@gmail.com