ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬

প্রচ্ছদ » ঘুরে এলাম » বিস্তারিত

বালি ভ্রমণ : পর্ব-৫

বৃষ্টিভেজা দিনে দেখা হলো না জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভা

২০১৯ মার্চ ১৪ ১৮:৫৬:১২
বৃষ্টিভেজা দিনে দেখা হলো না জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভা

মুহাম্মদ সেলিম হক : ইন্দোনেশিয়ায় আসার আগে জানতাম, যে শহরে বেড়াতে যাচ্ছি সেখানে একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি আছে। এসব আগ্নেয়গিরি পৃথিবীর জন্য বিপদ সংকেত কিনা জানিনা। বাংলাদেশ হতে ইন্দোনেশিয়া আসলাম আজ কটা দিন অতিবাহিত হল মাত্র।

আমাদের পরিবেশ আর ওদের মধ্যে অনেকটা পার্থক্য রয়েছে। ফলে হঠাৎ পরিবেশ ও বিছানা পরিবর্তনের ফলে রাতে ঘুমটা ভালো হয়নি। কারণ সকালে ভোরে উঠতে হবে। বরাবরের মতো সকাল ৮টায় হোটেল লবিতে গাড়ি হাজির।

গাড়ির সাথে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার একটি পরিবার। আগের রাতে ডলার পরিবর্তন করতে গিয়ে এ যুগলের সাথে আমাদের পরিচয়। আমি আর আমার সহকর্মী সমীর বাবুর বাংলা আলাপে তারা কৌতূহলী হয়ে থাকালো সেদিন।

সাত সমুদ্র তের নদীর পার বালিতে আবার বাংলাদেশী! বিস্ময়ের ভঙ্গিতে একে অপরের সাথে পরিচয়। বাড়িও আমার একই জেলা চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় তবে বসবাস করেন ওনারা ঢাকায়। অনেকে বলে থাকেন নোয়াখালীর লোক নাকি পৃথিবীর সব দেশেই আছে। এখন দেখি সাতকানিয়ার লোক ও।

এ দম্পতি আবার এক সাথে তিনটা দেশে ঘুরে বেড়াবেন। বাঙ্গালী জেনে হাত বাড়িয়ে বললো তার নাম হেলাল। সংক্ষিপ্ত পরিচয়ে একেবারে ঘনিষ্টতা বেড়ে গেলো। তিক্ত মরুভূমিতে যেনো এক পশলা বৃষ্টি। স্বদেশী মানুষের সাথে একাকার ভাবে মিশে গেছি আমরা।

নাটকীয় ভাবে এই দম্পতির সাথে পরিচয় হবার পর খরচ কমানোর জন্য এক গাড়িতে ৪ জন হলো এবার। এভাবে বালির ৫ম দিনের বেড়ানোর পরিকল্পনা করি আমরা। বালিতে আসলাম আগ্নেয়গিরি দেখবনা তা হয়না। তাই বালি ভ্রমণে এ দৃশ্য দেখার জন্য কৌঁতূহল বেড়ে গেলো।

গাড়ি নিলাম, ৭ ঘন্টায় ভাড়া গুনতে হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার রুপিয়া। শেয়ারিং হওয়াতে সুবিধাটা হলো। চলতে চলতে আলোচনা হচ্ছে আমাদের। জানালেন, স্বদেশী বন্ধু হেলালের সফর ২৫ দিনের। থাইল্যান্ড বেড়ানোর পর আসলেন বালিতে এখান থেকে যাবেন মালয়েশিয়াতে। তবে এটা এদের প্রথম ভ্রমণ নয়। এর আগেও দক্ষিণ কোরিয়া যায় এ কাপল। ড্রাইভার এদের পরিচিত। দেশ থেকে আসার আগে অনলাইন জগতে বুকিং দেওয়া।

ভাড়া ও আগের তুলনায় কম নিলেন। কিন্তামানি মাউন্ড, রাইস টেরস উবুদ, মাঙ্কি ফরেস্ট, ওয়াটারফল যাওয়ার কথা ড্রাইভার কে জানালো হলো প্রথমে কিন্তামানি যাবো। কুটাবিচ থেকে প্রায় দেড় ঘন্টার পথ। আগ্নেয়গিরি দেখবো সামনা সামনি দাড়িয়ে। কৌতূহল ও অনূভুতিটা ভিন্ন রকম ছিলো। আগে দেখেছি সমুদ্র আর মন্দির। এবার আগ্নেয়গিরি।

যাওয়ার পথে চোখ পড়লো স্বর্ণ ও সিলভার শপিং মলে। এক অসাধারণ স্বপ্নীল এক ভবন তৈরি করলেন। এ মলে প্রবেশে আপনাকে করবে মনোমুগ্ধকর, চোখের পলক কেবল উঠবে আর পড়বে। ভাবছি এটা বুঝি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য্য একটি দর্শনীয় স্পট।

সাদা আর সোনালী রংয়ের আবরণে বাইরের সৌন্দর্যময় বালির কারুকার্য মূর্তির চোখ এক পলকও ফেলতে দিবে না। বিরতিহীন ভাবে থাকাবেন অপলক দৃষ্টিতে। ভিতরে আরো বিস্ময়কর। স্বর্ণ আর রুপায় সাঁজালো যেন আদর মাখানো স্থানটি। প্রাণ জুড়িয়ে যায় দেখে দেখে তবে দামও আকাশের উপরে তোলা।

সমীর বাবুর পীড়াপীড়িতে একটা কানের দুল দেখলাম বৌদির জন্য। দাম বাংলা টাকায় প্রায় ৪লাখ টাকা। একটাতে সবার আগ্রহ যেন হারিয়ে গেলো। এ যেন বিল গেটসের জন্য, আমাদের নয়। রুপার বেলায় কম নয়, তবে আর্ট আছে প্রতিটি ডিজাইনে।

কেউ স্বর্ণ আর রুপা না কিনলেও ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারেনি। কিন্তমানির পথে পথে চলতে রাস্তার ধারে চোখ পড়বে কদম কদমে মন্দির। বাড়ির সামনে বাশঁ আর কাপড়ের গেইট।

শহরে ফেলে গ্রামে প্রবেশ করেছি মনেহয়। সাথে প্রকৃতির পরিবর্তন ক্ষণে ক্ষণে। রোদ যেন হারিয়ে মেঘের আনাঘোনা। সুবজের পর সবুজ। গাছের সারি আর স্কুটি সমান তালে চলছে। বুঝে উঠতে পারছিনা, বালির সৌন্দর্যময় জায়গা বদলের সাথে ভিন্নতা। একেক সময় একেক আবহাওয়া।

দীর্ঘ ভ্রমণে ঘন্টা খানিক পর মিললো রাস্তার পাশে কমলার বাগান। পথে বিক্রি কেন্দ্র। গাড়ি থামিয়ে নামলাম। পযর্টকদের আকর্ষণ করার জন্য ছোট ছোট দোকানে ফলের পশরা সাঁজিয়ে বসে আছে বালির মহিলারা।

আপনাকে বাগানে প্রবেশের অনুমতি দেবেন। ইচ্ছা মতো কমলা খেয়ে স্বাদ কিনতে পারবেন। টক কমলা প্রতি কেজি ১৫ হাজার রুপিয়া। মিষ্টি স্বাদের কমলা ২০ হাজার রুপিয়া। শুধু কমলা নয় মিলবে আম, কলা আর ইন্দোনেশিয়ার লোকাল ফ্রুটস। কিন্তমানির পথে যতই যাচ্ছি ততই আকাশে মেঘ ভর করছে, তবে বৃষ্টি হবে এটা ধরে নিয়েছি।

আকাশে অভিমানী বৃষ্টির জল আমাদের দেখা হলো না আগ্নেয়গিরির লাভা। দুরে অস্পষ্ট কেবল দেখছি পাহাড় আর ধোঁয়া। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট ছোট ঘর। মৃত্যুর সাথে লড়াই করে এদের বসবাস। পাহাড়ের সাথে গড়ে উঠেছে রেস্টুরেন্ট। দুপুর বেলার খাবার ট্যুরিস্টরা এখানে সেরে ফেলেন। রোদের বেলায় সাগর হতে ৩ হাজার ফুট উচ্চতায় মাউন্ট দেখতে প্রতিদিন ট্যুরিস্টদের পদচারণায় এখানকার পরিবেশ মুখর হয়ে উঠে।

এখানে রয়েছে কয়েক হাজার পুরনো দিনের মন্দির। প্রবেশে টিকেট কাটতে হয়। দাম বেশি আর পূর্বের মতো স্টাইল হওয়াতে দেখার আগ্রহটা কমে গেলো। বাইরের ছবি তুলতে চাইলে কয়েকজন মহিলা ঘিরে ধরলো। আবদার করলো মন্দিরে প্রবেশের কাপড় নিতে।

প্রতি পিস ২০ হাজার রুপিয়া। দরাদরি করে শেষমেষ চারটি নিলাম ২০ হাজার রুপিয়া দিয়ে। মন্দিরের আশেপাশে বিক্রি করা হয় হাতের তৈরি নানা পেন্টিং। আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত পাথর দিয়ে এ পেন্টিং আঁকা হয়। দেখতে ও দারুন। দেবতা আর প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এদের পেন্টিং এ। বৃষ্টি হওয়ার কারণে হতাশার দীর্ঘশ্বাস বের হলো কিন্তামানি মাউন্ড ছেড়ে রওনা দিলাম রাইস টেরস দেখার জন্য।

দুপুরবেলা পৌঁছলাম রাইস টেরস। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম চাষের মতো এলাকা। আমাদের দেশেরটা দেখার মতো আকর্ষণ করেনি কিন্তু এরা করেছে। ১০ হাজার রুপিয়া টিকেটে প্রবেশে আপনি দেখতে পারবেন ইন্দোনেশিয়ার ধান চাষ। পাহাড় কেটে কিভাবে ধান চাষ করা হয়।

প্রকৃতি পরিবেশে পর্যটকদের সামনে কিভাবে নিখুঁত উপস্থাপন করলো সাথে দোলনা খেলা তা অবাক কান্ড। সাহস থাকলে আপনি চড়তে পারবেন। দেখতে দেখতে কখন যে আপনি পাহাড়ের চূর্ড়ায় যাবেন টের ও পাবেন না। নির্মল পরিবেশের সাথে হালকা ভ্যাপসা গরমে কেমন জানি ক্লান্তি ভর করলো শরীরে। খাবারের সন্ধানে ঘুরে ফিরে পেলাম বালির খাবার। খুজঁলাম দেশীয় খাবার। মিলবে বলে এমন কোন সুযোগ নেই জানালো ড্রাইভার। কেএফসি চাইলাম, নেই। শেষমেষ ডাবই ভরসা।

শেষ বিকেলে পৌঁছলাম উবুদের মাঙ্কি ফরেস্ট এ। টিকেটের দাম একটু বেশি। জনপ্রতি ৫০ হাজার রুপিয়া। ৭০ বছর আগেকার বানরদের নিয়ে এ বাগান। বানরের বয়সকাল কত জানিনা। বানরের আনাগোনা আর গাছগাছালি ডালপাল দেখার জন্য এ বুঝি উবুদে আসা। আপসোসটা বাড়লো প্রবেশের পর এতো টাকায় কেবল বানর দেখা। তবে বাইরে ঐতিহ্য বিল্ডিং আর ট্যুরিস্টদের টইটুইম্বরতা দেখে বুঝতে কষ্ট হলো না উবুদ ট্যুরিস্ট জোন পড়ন্ত বিকেল ফরেনাদের ভারে নুয়ে পড়ছে পুরো এলাকা। আর ভাবছি এদের তুলায় আমাদের দেশে কম কিসের।

কয়েক কদম ওয়াটার ফলে গিয়ে দেশের কথা আরো বেশি মনে পড়লো। ১৫ হাজার রুপিয়া দিয়ে প্রবেশ করে ঝর্না দেখার আর আগ্রহ থাকলো না আর। এ চেয়ে আমাদের সিলেট শতগুন এগিয়ে থাকবে। তারপরেও কেন সাদা চামড়ার মানুষ গুলো আমাদের এখানে য়ায় না।

প্রকৃতির নিয়মে সূর্যটা হেলে পড়ছে। এই প্রকৃতি কত কিছু দিলো ইন্দোনেশিয়ার বালিকে। সন্ধ্যার আগে পৌঁছবো আমাদের হোটেলে। গাড়িতে চলছে আমাদের পিছিয়ে পড়ার গল্প। সাগরের কুলঘেঁষে গাড়ি চলছে। শব্দহীন শহরে সারি সারি গাড়ি। জ্যাম নেই, ভাবনাহীন জীবনের সন্ধ্যার সাথে বালি রঙিন হয়ে উঠে শহরের অলিতে গলিতে....

(চলবে)

লেখক :সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সংগঠক কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম।