ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

প্রচ্ছদ » ঘুরে এলাম » বিস্তারিত

বালি ভ্রমণ : শেষ পর্ব

বালি ভ্রমণ শেষে দেশের পথে যেদিন

২০১৯ মার্চ ২৪ ১২:৪৩:২০
বালি ভ্রমণ শেষে দেশের পথে যেদিন

মুহাম্মদ সেলিম হক : দেখা অদেখার মাঝখানে বালিতে কেটে গিলো টানা সাতটি দিবস। সমুদ্র জলের মায়া, পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য, বালিজির আতিথিয়তা আর ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে অন্দরমহলে ঘুরাঘুরি আর কাটানো সময়টা ছিল সত্যিই অসাধারণ।

ভ্রমণ মানেই কিছু অদেখা জিনিস দেখা। কিছু ভালো লাগার মুহুর্ত স্মৃতির পাতায় যোগ করা। সাথে কিছু নিজের পছন্দ সই জিনিস কেনাকাটা। আর সে দেশের রকমারি খাবারের স্বাদ নেওয়া। যেন একটা অন্যরকম অনুভূতির গল্প আর অভিজ্ঞতা।

ইন্দোনেশিয়ার টুপি, লুঙ্গি ঐতিহ্যের কথা আগে জানা ছিলো আমার। তবে মসলার কথাও টুকটাক জানতাম। কিন্তু ভ্রমণে বালিতে এসব উপাদান একেবারে চোখে পড়েনি। কারণ হয়তো আমরা যেখানে গেলাম সেসব এলাকায় মুসলিমদের সংখ্যা কম। জাকার্তা গেলে হয়তো মিলতো।

অপরদিকে বেড়াতে গেলে পরিবারের জন্য কিছু জিনিস নিতে হয়। বালির ট্যুরিস্ট এলাকায় কুটাবিচ, উবুদ এলাকায় শপিং সেন্টারে কোন পণ্যের উপর নজর দিলে যার দাম হাঁকান লাখ লাখ রুপিয়া। সেজন্য একদিনে শপিং বা কেনাকাটা না করে ভ্রমণের সময় ভিন্ন ভিন্ন স্পট থেকে কেনাকাটা ভালো।

আপনি দেখবেন কুটাবিচের ঘাটে ঘাটে নানান পণ্যের পসরা সাজিয়ে রাস্তায় বিক্রি করছে দোকানিরা। দামও সেরকম হাকেঁ। একজোড়া স্যান্ডেল ১ লাখ রুপিয়া। একটি হাফ প্যান্ট ৮০ হাজার রুপিয়া। রোদ সানগ্লাসে হাত দিলে তিন লাখ রুপিয়া। দামের তুলনায় মান তেমন ভালো না। ছোট ছোট দোকান ছাঁড়িয়ে বড় দোকানে গেলে আরো বাড়তি। তবে মান কিছুটা ভালো। কুটাবিচে রয়েছে ডিসকোভারি শপিং মল, কেফোর মল, টেম্পলেট মলের মতো নানা নাম করা শপিং সেন্টার।

প্রতিদিন দিনে ঘুরাঘুরির পর সন্ধ্যা হলে শপিং সেন্টারে আমরা টুঁ দিয়ে দেখতাম। পরখ করতাম কিন্তু দেশের সাথে দামের পার্থক্য থাকলে কেনা হতো না। হয়তো ট্যুরিস্ট এলাকা বলে একটু বেশি, তা নয় অনেক বেশি এক্সপেনসিভ। বালি ভ্রমণে যারা যাবেন তারা যেন টুরিস্ট এরিয়া থেকে কিছু ক্রয় না করেন। কম দাম ভালো জিনিস কোথায় মিলে সে তথ্য জানতে চাইলে ট্যাক্সি ড্রাইভার জানালো, বালিতে কৃষ্ণা নামে কয়েকটা শপিং মল রয়েছে। যেখানে এক রেইটে সব পণ্য কেনাবেচা হয়। মানও ভালো। কুটাবিচ থেকে ট্যাক্সি ভাড়া ৩০ হাজার রুপিয়া।

এক রাতে রওয়ানা হলাম। দোকানের সামনে বিশাল কৃষ্ণ মূর্তি। বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। বালির সব ঐতিহ্যবাহী জিনিস রয়েছে। সাথে মিলবে রকমারি শুকনো খাবার প্যাকেট। বালির তৈরি কসমেটিকস, ঐতিহ্যবাহী গলার মালা, নানান পদের কফির সমাহার। দামও কম চাইলে নিতে পারেন বাংলা মুদ্রায় দাম পড়বে দুই শত টাকা কফির প্যাকেট। স্বাদ মজাদার ও দারুন। কুটাবিচের তুলনায় দাম কম। সে কারণে সমীর বাবু’র ১২ লাখ রুপিয়ার কেনাকাটা করতে সাহস করলেন।

বালির রাজধানীর নাম ডেনপাস। আমরা যেখানে থাকতাম নাম তার (কুটাবিচ)। সেখান থেকে রাজধানী পথ মাত্র ১০ কিলোমিটার। কেনাকাটার জন্য এটাই ছিল উৎকৃষ্ট জায়গা। দেশে আসার রাতে কম সময় নিয়ে রাজধানীতে গেলাম।

ট্যাক্সি দরাদরি করে নিলাম আসা যাওয়া চার ঘন্টা। ১ লাখ ৫০ হাজার রুপিয়া। ট্রাফিক জ্যামের কারণে ঘন্টাখানিকের মতো লাগলো ডেনপাসা-এ পৌঁছাতে। তথ্যটি সকলের জেনে রাখা দরকার। যদি এ দেশটাতে ভ্রমণে যান। বালিতে সন্ধ্যা হয় সাড়ে সাতটার কাছাকাছি আর মার্কেট/ শপিং মল গুলো বন্ধ হয় রাত ১০ টায় সময়।

তাই বেড়ানোর ফাঁকে নয়, একদিন শুধু শপিং করার জন্য সময় বের করা ভালো। সেটা বুঝলাম দেশের ফেরার আগের রাতে। রাজধানী ডেনপাসে কয়েকটি বড় শপিং মল রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো মাথাহারা ডুয়াপ্লাজা। বিশাল ভবন এক ছাদের নিচে সব কিছু। দামে কুটাবিচ (টুরিস্ট এরিয়া) থেকে তিনগুণ সস্তা। ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যপূর্ণ আর দেশ বিদেশের নানা পণ্যের সমাহার এখানে।

মেয়েদের হিজাব, ইন্দোনেশিয়ার হাফশার্ট, টুপি, মেয়েদের থামি, শিশুদের আইটেম, পারফিউম আর জুতার বাহারি ডিজাইনে চোখ জুড়িয়ে যায়। চার তলা বিশিষ্ট এ মলে শত শত কাস্টমারের ভিড়ে বালির মেয়েদের কোন ক্লান্তি নেই। কিছু কিনেন বা না কিনেন। এক ঝলক হাসি আপনাকে দিবেন-ই এরা। সময়ের অভাব আমরা তেমন কিছু কিনতে পারিনি। তবে এখান থেকে চকলেট কিনতে ভুল করবেন না। না হলে এয়ারপোর্টে তিনগুন বেশি দামে কিনতে হবে।

একশত ডলার খরচে আপনার বাজারের ব্যাগ ভরে যাবে। সমীর বাবু হিসেবে মিলিয়ে দেখলো আমাদের দেশের চেয়ে দামে সস্তা, কোয়ালিটিও ভালো। তাই আমাকে আপসোস করে বল্লেন, আগে কেন এখানে আসিনি আমরা। বাইরে ট্যাক্সিওয়ালার অপেক্ষায় তাড়াহুড়া হোটেলের পথে রওয়ানা দিলাম।

বালিতে খাবারের দামটা বেশি। আমাদের দেশের মত প্লেটভর্তি ভাত, ডাল আর গরুর মাংস কিংবা মাছে ভাতে ঝুল পাওয়া বড়ই কঠিন। ইন্দোনেশিয়ানেরা তিন বেলা ভাত খায়। আমাদের মতো নয়, অল্প ভাত, মাছ, সবজি আর মুরগী। এরা ভাতকে বলে নাসি গোয়িং আর মুরগীকে আইয়ের।

একবেলা ভাত খেতে খরচ পড়বে বাংলাদেশের প্রায় ৭/৮’শ টাকা জনপ্রতি। তবে কুটাবিচে একটা ইন্ডিয়ান রেস্তোরা রয়েছে নাম তার “নাইট কুইন”। এক রাতে তিনটি রুটি, এক বাটি ডাল আর দুটো এক লিটার পানির দাম আসলো ২৭৫ লাখ রুপিয়া সাথে যোগ করে দিলেন ট্যাক্স আর সার্ভিস চার্জ। তারপর থেকে এসব রেস্তারার কাছে যেতাম কিন্তু ভিতরে প্রবেশের সাহস হতো না। পরে কেএফসি’তে খেয়ে কোন মতে রাত পার করতাম। ৩৫ হাজার রুপিয়ার বিনিময়ে অনায়াসে ডিনার শেষ করা যায় অবশ্যই স্বাদ ও ভালো।

বালি ভ্রমণে নারকেল এর ডাব আপনার প্রাণে শক্তি ও সাহস যোগাবে। ২০ হাজার রুপিয়ায় মিলবে বিশাল ডাব ভেতরে প্রচুর পানি। সাথে ডাবের ছানা কি সুস্বাদ। দরাদরি করলে ১৫ হাজার দিয়ে মিলবে। দুপুরবেলার খাবার একটা ডাব-ই যথেষ্ট বলে মনেহয় আমার।

সমীর বাবু কেবল বলতো আমাদের সকালে ইডেন হোটেলে যে ব্রেকফাস্ট দিতো তার দাম কত হবে? যেখানে ম্যানুয়ালে থাকতো পাঁচটি দেশের খাবার সহ প্রায় ৫০টি ম্যানু আইটেম। সকালে খেলে দুপুরবেলা পযর্ন্ত ফিট থাকা যায়। ওদিকে মনে মনে অংকের হিসাব কষে বলতেন এ খাবার বাইরে নাকি অন্তত ৬ লাখ রুপিয়া নিশ্চিত।

বালির শেষ রাতে হোটেলের বেডরুমে একটি চিরকুট পেলাম। তাতে লেখা ছিল কাল সকাল ১০টায় হোটেল লবিতে গাড়ি আসবে। আপনাকে ১০টা ৩০মিনিটে এয়ারপোর্ট ড্রপ করা হবে শুভরাত্রি। বালি ভ্রমণে বিদায় মুর্হুত এসে গেছে। কখন যে সময় শেষ হয়ে গেল টেরও পেলাম না।

সকালে আকাশে বৃষ্টিজল নামলো। যেন আমাদের বিদায়ে বালি কাদঁছে। অচেনা জনপদ যেন কত দিনের চেনা জানা পথ মনেহল। ২০মিনিটে পৌঁছলাম গুষ্ঠী মরা রায় আন্তজার্তিক এয়ারপোর্ট। ছিমছাম গুছালো এয়ারপোর্ট। পরিবেশ দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো আর ভাবছি আমাদের রাজধানী ঢাকার শাহ্ জালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে মশার কামড়ের কথা।

একটি প্রদেশে তাদের বিমান বন্দর কত উন্নত। সবাই ব্যস্ত ম্যানিব্যাগ খোলা নিয়ে যার যত রুপিয়া ততই ঢালছে চকলেট কেনার জন্য কারণ ইন্দোনেশিয়ার টাকার মান নেই। তাই সব খরচ করে সবাই বাড়ি ফিরছে। শেষ বেলাতেও সাগর। সমুদ্রতটে এয়ারপোর্ট। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার সময় কখন যে চলে যাবে ঢেরও পাবেন না। বালিতে বিদায়ের দিনে আপনার হৃদয় নাড়াতে কত রকমের আয়োজন যে এরা করেছে। আপনার কল্পনাকে ও হার মানাবে শেষ বেলায়...

তবে আপন হয়ে রইল স্মৃতিময় অধ্যায় বিদায় ইন্দোনেশিয়া !!

লেখক :সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সংগঠক চট্টগ্রাম।