ঢাকা, রবিবার, ২৬ মে ২০১৯, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

প্রেক্ষিত গণহত্যা : সোনার পাথরবাটি ও কাঠালের আমসত্ত্ব

২০১৯ মে ১৩ ১৪:৫০:০৯
প্রেক্ষিত গণহত্যা : সোনার পাথরবাটি ও কাঠালের আমসত্ত্ব

শামসুল আরেফিন খান


পৃথিবীর ইতিহাসে গণহত্যার অনেক বিবরণ রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডের দায় চেপেছে এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। ৭৩ বছরে তিন কোটি মানুষ হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ইতিহাসবিদ জেমস এ লুকাসের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে এ ভয়ানক তথ্য। ১৯৪৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি এ দেশটির হাতে নিহত হয়েছে ২ থেকে ৩ কোটির বেশি নিরীহ বেসামরিক মানুষ। মার্কিন পরাশক্তি আধিপত্য লড়াইয়ের মিশনে টার্গেট করে একটার পর একটা দেশে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। পছন্দের সরকার বসাতে গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে দেশে দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে গোপন অভিযান পরিচালিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সারা বিশ্বে এভাবেই আধিপত্য কায়েম রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার ৩৯ তম প্রেসিডেন্ট ৯৩ বছর বয়সী কার্টার বলেছেন, ‘মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া উচিত ছিল। কারণ আমরা শুধু সামরিক শক্তির কারণে সুপারপাওয়ার নই, বরং সেখানে মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকারও রয়েছে।’ সে অঙ্গীকার শুনিয়েছে ব্যর্থ পরিহাস।

একাত্তর সালে বাংলাদেশের নৃশংস গণহত্যায় ইন্ধন যুগিয়েছিলেন তখনকার মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে স্মারকে জানিয়েছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী গিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করতে। তারা পারবে। তাদের সে শক্তি আছে। তবে একটা পর্যায়ে হয়তো তাদের সক্ষমতা হ্রাস পাবে। তখন তাদের সহায় সরঞ্জাম দিতে হবে। নিক্সন তার সুপারিশ মাটিতে ফেলেন নি। একই সময়ে আবার ঢাকার কন্সাল জেনারেল আর্চার ব্লাড, ইউএসএইডও, মার্কিন তথ্য কেন্দ্রের অধিকারিকগণ একযোগে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ খ্যাত যে তারবার্তা প্রেরণ করেন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে তাতে তারা বাংলাদেশে ভয়াবহ গণহত্যা এবং নির্মম নারী নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানান। শুধু তাই নয় তারা ব্যাপক সহিংসতায় চালিত ব্যাপক সিরিয়াল হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যা, গণনিধন এবং গণতন্ত্র দলন রোধে মার্কিন ব্যর্থতায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে সকলি গরল ভেল। সকলই অরণ্যে রোদন। কোনো নিন্দা, কোনো ক্ষোভ প্রতিকারে ফলজ হয়নি। মানবতার যত ক্রন্দন, যত আর্তনাদ, যত হাহাকার, সবই বিফলে গেছে। বিশ্ব বিবেকের ‘ভর্ৎসনা’; ‘করো কী করো কী নন্দলাল’ গোছের সোরগোলে কোনো কাজই হয়নি। অদৃশ্য সহায়তায় নরহত্যা গাণিতিক হারে প্রবৃদ্ধ হয়েছে। নারকীয় আগুন-সন্ত্রাস লেলিহান হয়েছে। গরিবের ঘর পুড়েছে। কৃষকের কপাল পুড়েছে। শ্রমিক কাজ হারিয়েছে। নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে অকল্পনীয় বীভৎসতায়। শকুনের মতো বাঙালি মেয়েদের খুবলে খেয়েছে নরপশুরা। নবচেতনায় জেগে ওঠা বাঙালি তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জানকসম যুদ্ধ করেছে হানাদার নরঘাতকদের বিরুদ্ধে।

এই যুদ্ধে নারী নির্যাতন যে কতটা ভয়াবহ ছিল, তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এগেইনস্ট আওয়ার উইল : ম্যান, উইম্যান অ্যান্ড র‌্যাপ গ্রন্থে, পৃ. ৮৩, সুসান ব্রাউনি মিলার লিখেছেন, ‘কোনো কোনো মেয়েকে পাকসেনারা এক রাতে ৮০ বারও ধর্ষণ করেছ।’

ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির ‘যুদ্ধ ও নারী’ শীর্ষক গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘এক-একটি গণধর্ষণে ৮-১০ থেকে শুরু করে ১০০ জন পাকসেনাও অংশ নিয়েছে।’

খুলনার ডা. বিকাশচন্দ্র চক্রবর্তী লিখেছেন : ‘যুদ্ধ শেষে ক্যাম্প থেকে কয়েকটি কাচের জার উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ফরমালিনে সংরক্ষিত ছিল মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ। নারীদেহের সেই টুকরোগুলো কাটা হয়েছিল খুব নিখুঁতভাবে। পাকা কসাইয়ের মতো।

বাটিয়ামারা কুমারখালীর মো. নুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘মার্চে মিরপুরের একটি বাড়ি থেকে একটি বাঙালি পরিবারের সবাইকে ধরে আনা হয় এবং তাদের কাপড় খুলতে বলা হয়। তারা এতে রাজি না হলে বাবাকে বলা হয়, নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করতে। ছেলেকে আদেশ করা হয় মাকে ধর্ষণ করতে। এতেও রাজি না হলে প্রথমে বাবা এবং ছেলেকে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয় এবং মা-মেয়ে দুজনকে দুজনের চুলের সঙ্গে বেঁধে উলঙ্গ অবস্থায় টানতে টানতে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।’
যুদ্ধ-পরবর্তী নারী পুনর্বাসন কাজে সম্পৃক্ত সমাজকর্মী মালেকা খান তার জবানবন্দিতে বলেছেন : ‘আমাদের সংস্থায় আসা ধর্ষিত নারীদের প্রায় সবারই যৌনাঙ্গ ছিল ক্ষত-বিক্ষত। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ছিঁড়ে ফেলা রক্তাক্ত যোনিপথ। দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা স্তন।’

বেয়নেট দিয়ে কেটে ফেলা স্তন-উরু ও নিতম্ব এবং পশ্চাদ্দেশে ছুরির আঘাত নিয়ে নারীরা পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসত। এত নির্মম ও ভয়াবহ নারী নির্যাতনের নির্মম আলেখ্য পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও লেখা হয়নি। জার্মান হলোকাস্টে কম করে ৬০ লাখ লোককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বেশ কিছুদিন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে রাখার পর কয়েক লাখ নারী ও শিশুকে বিবস্ত্র করে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারা হয় । কিন্তু কোনো নারী ও শিশুর ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন হয়েছিল, তেমনটা ইতিহাসের কোনো বিবরণে উল্লেখ আছে বলে শুনিনি। জার্মান গণহত্যার যে সকল প্রামাণ্য চলচ্চিত্র রয়েছে, তার অনেকটাই দেখেছি। কোনোটাতেই নারী নিপীড়নের এমন অমানবিক দৃশ্য অবলোকনে আসেনি।

বিচারপতি কে এম সোবহান লিখেছেন, ‘১৮ ডিসেম্বর মিরপুরে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া একজনকে খুঁজতে গিয়ে দেখি, মাটির নিচে বাঙ্কারে ২৩ জন সম্পূর্ণ উলঙ্গ, মাথা কামানো নারী।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. রতন লাল চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘যুদ্ধের পরপর ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন স্থানে উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে বেশ কিছু বিধ্বস্ত নারীকে। তাদের পোশাক এবং চলাফেরা থেকে আমরা অনেকেই নিশ্চিত জানতাম, ওরা যুদ্ধের শিকার এবং ওদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’ তাদের বেশির ভাগই ছিল মফস্বলের মেয়ে। অপমান, লজ্জা মাথায় নিয়ে তারা একসময় মুখ লুকিয়েছে। তাদের সবার নাম-পরিচয় তাই কেউ জানে না। আমরা জানার চেষ্টা করিনি স্বাধীন দেশে তারা কী ভাগ্য বরণ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। এই নরপশুর নেতৃত্বেই রাও ফরমান আলী, রহিম খান, টিক্কা খানের মতো পাকিস্তানি জেনারেল এ দেশের ওপর চালায় শতাব্দীর ঘৃণ্যতম গণহত্যা। সেই সঙ্গে এসব বিকৃত রুচির জেনারেলদের পরিকল্পনায় সংঘটিত হয় ধর্ষণের মহোৎসব। সাংবাদিক আনা ফ্রাঙ্ক লিখেছেন : ‘মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতন নিয়ে যত ঘাঁটছি আমার বিস্ময় তত বেড়েই চলছে। দুঃখের বিষয়, আমরা বরাবরই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পুরোনো কিছু গল্প বলে পাশ কাটিয়ে যেতে চাই। আর এর ফাঁকে আড়াল হয়ে যায় নির্মমতার অনেক গল্প, যে গল্প হার মানাবে হিটলারের নির্মমতাকে। আমার হিসাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিত নারীর প্রকৃত সংখ্যা হয়তো ১০ লাখও হতে পারে।’

ব্রিগেডিয়ার আবদুল রহমান সিদ্দিকী তার East Pakistan The End Game বইতে লিখেছেন, ‘নিয়াজি জওয়ানদের অসৈনিক-সুলভ, অনৈতিক এবং কামাসক্তিমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতেন। “গতকাল রাতে তোমাদের অর্জন কী আমার বাঘেরা?” চোখে শয়তানের দীপ্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করতেন তিনি। অর্জন বলতে তিনি ধর্ষণকেই বোঝাতেন।’

সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের সকল ডিভিশন কমান্ডারের কনফারেন্সে এক অফিসার তুলেছিলেন পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক বাঙালি নারীদের ধর্ষণের প্রসঙ্গ। নিয়াজি তখন সেই অফিসারকে বললেন, ‘আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি। যুদ্ধক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়ো।’ তারপর তিনি হেসে বললেন, ‘ভালোই তো হচ্ছে, এসব হিন্দুয়ানি বাঙালি রক্তে সাচ্চা মুসলিম পাঞ্জাবি রক্ত মিশিয়ে তাদের জাত উন্নত করে দাও।’ আর এই ধর্ষণের পক্ষে তিনি যুক্তি দিয়ে বলতেন, ‘আপনারা কীভাবে আশা করেন একজন সৈন্য থাকবে, যুদ্ধ করবে, মারা যাবে পূর্ব পাকিস্তানে এবং যৌনক্ষুধা মেটাতে যাবে ঝিলমে?’

ধর্ষণে লিপ্ত এক পাকিস্তানি মেজর তার যুদ্ধদিনে বন্ধুকে চিঠিতে যা লিখেছিল তা এ রকম : ‘আমাদের এসব উচ্ছৃঙ্খল মেয়েদের পরিবর্তন করতে হবে, যাতে এদের পরবর্তী প্রজন্মে পরিবর্তন আসে, তারা যেন হয়ে ওঠে ভালো মুসলিম এবং ভালো পাকিস্তানি।’

স্বাধীনতার পর ধর্ষিতা বাঙালি মহিলাদের চিকিৎসায় নিয়োজিত অস্ট্রেলীয় ডাক্তার জেফ্রি ডেভিস গণধর্ষণের ভয়াবহ মাত্রা দেখে হতবাক হন। তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে আটক পাক অফিসারদের জেরা করেন যে তারা কীভাবে এমন ঘৃণ্য কাজ-কারবার করেছিল। অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক বিচলিত হলেও পাক অফিসারদের সাচ্চা ধার্মিক হৃদয়ে কোনো রকম রেখাপাত ঘটেনি। তাদের সোজাসাপ্টা সরল জবাব, ‘আমাদের কাছে টিক্কা খানের নির্দেশনা ছিল যে একজন ভালো মুসলমান কখনোই তার বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করবে না। তাই আমাদের যত বেশি সম্ভব বাঙালি মেয়েদের গর্ভবতী করে যেতে হবে।’ নিয়াজি ধর্ষণে তার সেনাদের এতই চাপ দিতেন যে তা সামলে উঠতে না পেরে এক বাঙালি সেনা অফিসার আত্মহত্যা করতে বসেন।

১৯৪৫ সালে শুরু হলো ভিয়েতনাম যুদ্ধ। ১৯৭৫ পর্যন্ত যুদ্ধ চলেছিল। ১৯৭৩ সালে মার্কিন সৈন্যরা দেশে ফিরে গেল। সে পর্যন্ত দক্ষিণ ভিয়েতনামে তিন থেকে পাঁচ লাখ মার্কিন সৈন্য বছরের পর বছর অবস্থান করেছে। তারা সেখানে ঘর-সংসার পেতে অগণিত বংশধর ছেড়েছে। কাউকে তারা দেশে নিয়ে গেছে। অনেককে নেয়নি। যাদের ফেলে গেছে তাদের সন্তান স্বীকৃতি দিয়ে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করেছে। সুদীর্ঘকালের এই যুদ্ধদিনে হানাদারেরা ধর্ষণসহ বহু অমানবিক অপরাধ করেছে। কিন্তু পাকিস্তানের নরপশুরা বাংলার মা-বোনের ওপর যে পাশবিক অত্যাচার করেছে মাত্র ৯ মাসে, সে তুলনায় তা নস্যি।

জুন ২২, ১৯৪২ থেকে পরবর্তী ৮ মাস জার্মানির নাৎসী বাহিনী সোভিয়েত রাশিয়া দখল করে মাত্র ৮ মাসে ২৮ লাখ মানুষকে হত্যা করে। ছাদহীন বন্দিশিবিরে আটকে তাদের অনাহার, খরতাপ ও তুষারপড়া মাইনাস ৩০ সেলসিয়াস শীতে খোলা আকাশের নিচে ফেলে রেখে হত্যা করা হয়। ১৮ থেকে ৬০ বছরের সব মানুষকেই যুদ্ধবন্দী করা হয়েছিল। লাখ লাখ নারীকে দাসশ্রমিক করে বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়। কিন্তু তাদেরকে নেকড়ের মতো ছিন্নভিন্ন করে উচ্ছোষণ করার ঘটনা সেখানেও দৃশ্যমান হয়নি। পাকিস্তানের খাঁটি মুসলমান হানাদাররা ৭১ সালে বাংলার মা-বোনের ওপর যে ব্যভিচার করেছে, তার কোনো তুলনা মেলে না সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসে। চরম ঘৃণায় তাদের দহন করিও বাঙালি যত দিন সূর্য উদিত হবে আকাশে।

২. ৯ এপ্রিল থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বক্সনগর থানার বাঙালি দারোগা বাবুর পান্থশালায় শুয়েবসে আমরা চার-পাঁচজন মিলে অন্ন ধ্বংস করছি। তীর্থের কাকের মতো বসে আছি একটা উজ্জ্বল উদ্ধারের আশায়। আগরতলা থেকে সবজির গাড়ি কবে আসবে মাছ-মাংস আনাজ ও মনোহারি নিয়ে ? কাঁঠাল নিয়ে ফিরবে। তাতে যদি মেলে একটু ঠাঁই, তবেই হবে পরিত্রাণ। আর যদি শপথ অনুষ্ঠান শেষ করে মুজিবনগর থেকে মুস্তাফা সারোয়ার ভাইয়ের বিগ ব্রাদার এমএনএ শামসুজ্জোহা বড় কোনো গাড়ি নিয়ে আসেন আপনজনদের এই পাণ্ডববর্জিত স্বজনহীন বিদেশ বিভুঁইয়ের সরাইখানা থেকে উদ্ধার করতে এবং যদি তিনি না বলেন, ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী/ আমারই সোনার ধানে গিয়াছে ভরি’ তবেই হয়তো কপাল খুলবে। এমএনএ সারোয়ার সাহেব প্রতিদিনই অভয় দিচ্ছেন। কিন্তু আমি তো ভাবছি হৃদয়টা যতই বড় হোক, গাড়িটা যদি ছোট হয় তাহলে কী হবে উপায়? ভেবে কোনো ক‚লকিনারা করতে পারছি না। বাঙালি বাবু আশ্বাস দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। একটা উপায় হবেই।

চারদিকে ছোট-বড় টিলা আর অরণ্যরাজি। উদ্বাস্তুর অভয়ারণ্য এই কাঁঠালারণ্য। জয় বাংলা শুরু হওয়ার আগে যাতায়াত কেনাকাটি সবই চলত পাশের দেশের ভেতর দিয়ে অবাধে। সীমান্তে মাশুল ছিল খুবই নগণ্য। একটা কাঁঠাল, সে পাকাই হোক আর কাঁচাই হোক, যথেষ্ট ছিল। টিলার ওপর যেদিকে তাকাই কেবল কাঁঠালগাছ। গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত ছোট-বড় কাঁচা-পাকা কাঁঠাল। আমাদের মতো শঙ্কাতাড়িত শত শত মানুষ কাঁঠাল গাছতলায় শুয়ে-বসে অলস দিন অতিবাহিত করছে। খাদ্য বলতে একমাত্র এই কাঁঠাল। কাঁচা কাঁঠালের ইচড় ভাজি। কাঁঠাল বিচির সালুন। আর ভরপেট পাকা কাঁঠাল। যুব কংগ্রেস এবং সিপিএম ভিন্ন আয়োজনে নঙ্গরখানা খুলেছে। কিন্তু ত্রাণ সরবরাহ এতই অপ্রতুল যে বানের জলের মতো উথলে পড়া শরণার্থীদের চাহিদার সিকি ভাগও সংকুলান হচ্ছে না। কাঁঠাল না থাকলে অনাহার জেঁকে বসত এত দিনে। অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে সংক্রামক রোগের মহামারি দেখা দিত। কাঁঠাল গরিবের দুর্দিনের সহায়। সারা বাংলায় মরা কার্তিক ও আষাঢ় শ্রাবণ মাসে দরিদ্র মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তির ফল ফসল এই একটাই। কাঁঠাল খেতে মিষ্টি। কিন্তু এই ফল খেয়ে ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়ার তেমন আশঙ্কা নেই। বরং শরীরে শক্তি জোগাতে এর জুড়ি মেলা ভার। দুর্ভাগ্য একটাই যে রাজনীতির কারখানায় যে ‘কাঁঠালের আমসত্ত্ব’ উৎপন্ন হয়, তাতে গরিবের ফাটা কপাল জোড়া লাগে না। দারিদ্র্য, অভাব, অনটন, হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ, অতুষ্টি কাঁঠালের আঠার মতো গরিবের কপালে সেঁটে থাকে।

কাঁঠালের গুণের কোনো শেষ নেই। পুষ্টিগুণ, দ্রব্যগুণ এবং ঔষধি গুণ বলে শেষ করা যাবে না। কাঁঠাল ফাইবার-সমৃদ্ধ ফল। হজমশক্তি বাড়ায় এবং পেট পরিষ্কার রাখে। লোকে জানে না। বিশ্বাস করে না। তবু এ কথা সত্যি যে এই ফলে রয়েছে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম, যা শরীরের ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্সকে ঠিক রাখে। এর ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হার্টও ভালো থাকে।

বিশাল আকৃতির এই ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ এবং বিটা ক্যারোটিন। চোখ ভালো রাখতে ভিটামিন ‘এ’ যে অপরিহার্য, তা কে না জানে। কাঁঠালে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকার ফলে ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ে। বলিরেখাও কমে। কাঁঠালে রয়েছে ভিটামিন বি৬ এবং প্রচুর পরিমাণ ক্যালরি। তবে এতে কোনো রকম কোলেস্টেরল নেই। কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে, যা রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ বাড়ায়। রক্তাল্পতায় যারা ভুগছেন, তাদের কাঁঠাল খাওয়া উচিত। গবেষকেরা বলছেন, এই ফল নিয়মিত খেলে পাইলস এবং কোলন ক্যান্সারের আশঙ্কা কমে বলেও বিশেষজ্ঞরা অভিমত রেখেছেন।

উচ্চমানের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ ফল কাঁঠাল। এতে ভিটামিন সি রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। তাই কাঁঠাল খেলে শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে। এমনকি ক্যান্সার ও টিউমারের বিরুদ্ধেও শরীরে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। কাঁঠালে অসামান্য ক্যালসিয়াম থাকে, যা হাড় শক্ত রাখে। শুনেছি, কাঁঠালের বিচি থেকে ক্যানসারের ওষুধ পাওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞ গবেষকেরা। কাঁঠাল কাঠ সারি হলে ঘুণে ধরে না। তাই তার বাণিজ্যিক সমাদর রয়েছে। আগার কাঁঠাল মানুষ খায়। গোড়ার কাঁঠাল শিয়ালে খায়। তাই বুঝি এর ইংরেজি নাম হয়েছে জ্যাক ফ্রুট।

এত গুণ এত পুষ্টি। তবু অভিজাত ঘরের ডাইনিং টেবিলে কাঠালের প্রবেশাধিকার নেই। শূদ্র কামিনের মতো। কাঁঠাল গরিবের বন্ধু। অরণ্য সন্নিহিত এই টিলার পাদদেশের সমতলে রয়েছে গরিব বসতি। তারা যে গবাদিপশু লালন করে, তাদের খাদ্যচাহিদার বড় অংশ পূরণ করে সবুজ কাঁঠাল পাতা। শুকনো পাতা হয় রান্নার ইন্ধন। আমার বউ সিলেটের মেয়ে। কাঁঠাল তার আম জাম আঙুর আপেলের মতোই প্রিয় ফল। তার ধারণা শিল্প উপাদান হিসেবেও বাঙালির গর্বের ফল এই কাঁঠাল বেশ ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। আমারই কেবল পেটে সয় না। মেয়েটা পছন্দ না করলেও চেখে দেখে। কিন্তু ছেলেটা গন্ধই সইতে পারে না। কাঁঠাল খাওয়ার ওস্তাদ আমার এক অভিজাত শালাবাবু। একাই একটা মাঝারি কাঁঠাল সাবাড় করে দেয়। আরেক কাঁঠালপ্রেমী আমার সফরসঙ্গী ‘আকাশের আব, মাটির দুল আব্দুল’। মা বলে খা, বাপ বলে ‘লেক’ বানানের আব্দুল খালেক। বাড়ি বরিশাল। কাঁঠাল পেলে সে মন্ডা-মিঠাই ছোঁবে না। (তার এই অদ্ভুত বানানবিদ্যার কথা এই ধারাবাহিক রচনায় আগের কোনো এক পর্বে লিখেছি।)

৩. থানাদার বাঙালিবাবুর সরাইখানা থেকে বেরিয়ে পড়ার জন্য আমি অতিশয় অধীর হয়েছি দেখে এমএনএ মুস্তাফা সারোয়ার বেশ একটা ওজনদার কথা বললেন। ‘সবজির গাড়ি দু-এক দিনের মধ্যেই আসবে। ফিরতি যাত্রায় কাঁঠাল নিয়ে যাবে। সেই গাড়িতে বাঙালিবাবু তোমাদের তুলে দিতে পারে। কিন্তু তোমার গায়ে তো বামপন্থী সিল মারা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তো তুমি ঠাঁই পাবে না। কাজেই তোমাকে যেতে হবে জোহা ভাইয়ের সঙ্গে। আমরা চিঠি দিয়ে দেব সিলেটের এমএনএ দেওয়ান ফরিদ গাজীর কাছে। তিনি তোমার বাধা দূর করবেন।’ আমি একটু বিস্মিত হলাম। কিন্তু অবিশ্বাস করলাম না। কারণ ব্যাধিটা পুরোনো। মহাত্মা গান্ধী ভারতের কংগ্রেস থেকে বামপন্থীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছিলেন, যাতে তারা স্বাধীনতার ফসলের ভাগীদার না হতে পারে। ব্যাঙ নিধন করলে মশা উত্যুঙ্গ হয়। তেমনি বাম শক্তিকে পিষে ফেললে জঙ্গিরা জেঁকে বসে। গান্ধী প্রাণ হারালেন ভারত স্বাধীন হওয়ার মাত্র ৫ মাসের মধ্যে এক হিন্দু জঙ্গির হাতে। তার ঘাড়ে যে ভূত সওয়ার ছিল, সেই একই ভ‚তের আসরে প্রতিষ্ঠালগ্নে যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিল তাদেরকে ৫৭ সালে আওয়ামী লীগ থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হলো। সংগ্রামী দল আওয়ামী লীগ থেকে লোহিত কণিকা হারিয়ে গেল। শ্বেতকণিকার প্রাদুর্ভাব ঘটল।

বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে খুব সচেতন ও সতর্ক ছিলেন। তিনি দক্ষিণপন্থী হাঙ্গর নওয়াবজাদা নাসরুল্লাহ খান ও নুরুল আমীনের নেতৃত্বে চালিত পিডিএমের পেট থেকে আওয়ামী লীগকে টেনে বের করলেন ১৯৬৩ সালে। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের তিরোধানের পর। ১৯৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিস ফাতেমা জিন্নাহকে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রার্থী করে মওলানা ভাসানীর হাত ধরে মুজিব উঠে দাঁড়ালেন। ৬ দফার পালে হাওয়া লাগল লাল অক্ষরে রচিত আরও ৫ দফা তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর। মওলানার হাতে গড়া কৃষক আন্দেলনের কর্মী ও ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান বুক পেতে দিল পুলিশের গুলির সামনে। হাঁপানি রোগী বৃদ্ধ ভাসানী রাজপথে নেমে এসে জেলের তালা ভেঙে শেখ মুজিবকে মুক্ত করার কসম কাটলেন। আবার সেই মওলানাকেই তো শ্রীমতী গান্ধী বর্ডার থেকে হেলিকপ্টারে চাপিয়ে কলকাতা থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় দিল্লি নিয়ে নিজের হেফাজতে রাখলেন ‘কাকাবাবুর’ বিশেষ মর্যাদায়। ভাসানী দিল্লির বিশেষ মেহমান। আর বঙ্গবন্ধু মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে বন্দী। রাজনীতিতে যে শেষ কথা নেই, এটা তারই একটা বড় প্রমাণ। বঙ্গবন্ধু মুজিবের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তার গায়েও তো রয়েছে বামপন্থী সিল। আবার তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাথি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। এই জুটিই তো বিপন্ন শেখ মুজিবের ‘এসওএস’ বার্তা নিয়ে ২৫ মার্চ রাতে দিল্লি ছুটলেন আজরাইলের আগে আগে। দশ কদম গিয়ে ডানরত্ন ব্যারিস্টার কামাল হোসেন কেটে পড়লেন।

মুস্তাফা সারোয়ারের ভগ্নিপতি ব্যারিস্টার আমীর-উল। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৫৭ সালে। তখন তিনি কমিউনিস্ট যুবলীগের সদ্য কারামুক্ত পাঁড় কর্মী। আরও তাজ্জব ব্যাপার তো সেটাই যে কমিউনিস্টরা যাকে সাম্রাজ্যবাদের দালাল মনে করত, সেই বুর্জুয়া নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৯৫৭ সালে দেশের সমস্ত জেল খালি করে দিয়ে কমিউনিস্ট রাজবন্দীদের মুক্তি দিলেন। ব্রিটিশ আমল থেকে আন্দামান দ্বীপে যারা জেল খাটা শুরু করেছিলেন, তারা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কল্যাণে কয়েক যুগ পর জেলের বাইরে এসে মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিলেন। তাদের নিয়েই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মদাতা মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী জহরলালের সহযোদ্ধা সীমান্ত গান্ধী খান আব্দুল গাফফার খানের হাত ধরে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রতিষ্ঠা করলেন। এরই নাম রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধ তারই সেরা ফসল। গরিবের জন্য হতে পারে সেটা কাঁঠালের আমসত্ত্ব। ইতিহাসের জন্য সোনার পাথরবাটি।

লেখক : ক্যালিফোর্নিয়া প্রবাসী।