ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬

প্রচ্ছদ » মুক্তিযুদ্ধ » বিস্তারিত

৮ জুন, ১৯৭১

জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ভাষায় বাঙালীরা স্বতন্ত্র

২০১৯ জুন ০৮ ১০:১৪:১৯
জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ভাষায় বাঙালীরা স্বতন্ত্র

উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ ডেস্ক :ফেনীতে তান্দুরা রেল স্টেশন-বেলোনিয়া নদীর তীরে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটিতে পাকসেনারা ব্যাপক আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান ত্যাগ করে বেলোনিয়া মূল প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে চলে আসে। অপর দিকে পাকসেনারা আনন্দপুর পর্যন্ত এগিয়ে এসে সেখানেই দৃঢ় অবস্থান নেয়। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক ক্ষতির স্বীকার হয়।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং-এর মস্কো সফরকালে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিসংগ্রামে নৈতিক সমর্থন ও সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ঢাকায় এক নম্বর বিশেষ সামরিক আদালত আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দিন আহমদ, তোফায়েল আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান ও পিপলস পত্রিকার সম্পাদক আবিদুর রহমানের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচার করে। বিচারে ৫ জনের প্রত্যেককে ১৪ বছর সশ্রম কারাদন্ড প্রদান এবং তাদের সম্পত্তির শতকরা ৫০ ভাগ বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়।

বগুড়ার জাতীয় পরিষদ সদস্য হাবিবুর রহমান এক বিবৃতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটিয়ে বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের (মুক্তিবাহিনী) সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি একজন খাঁটি পাকিস্তানি হিসেবে দেশের সেবা করে যাবেন। সময়মতো পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করায় তিনি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীকে অভিনন্দন জানান।

বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার, আলোক ডগলাস হিউম লন্ডনে বলেন, নতুন অর্থনৈতিক সাহায্য প্রকল্পে সম্মত হবার আগে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য বৃটেন পাকিস্তানের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তবে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দিতে পারি না।

রয়েল কমওয়েলথ সোসাইটির লন্ডন হেড কোয়ার্টারে প্রদত্ত ভাষণে বাংলাদেশের প্রতিনিধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচার পতি আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, সংবাদপত্র খুললেই আপনারা দেখতে পাবেন পূর্ব বাংলার নাগরিকরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। ভারতে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে কিন্তু এসবের কারণ কী? কোথায় এ হত্যাযজ্ঞের সূচনা? এই মানবিক লাঞ্ছনার জন্য দায়ী কে? তিনি বলেন, আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, পূর্ব বাংলার জনগণ তাদের প্রত্যাশা আর আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতা এবং রাজনৈতিক শাসন ও অর্থনেতিক শোষণে দীর্ঘদিন ধরে জর্জরিত ছিল।

১৯৭০-এর ডিসেম্বরে জনগণ ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের কথা মনে রেখেই। তারা শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ভোট দেয়। কারণ তারা বৈদেশিক বাণিজ্য ও অন্যান্য বিষয়ে ৬ দফার দাবিতে প্রদেশের হাতে ক্ষমতা দিয়েছিল, যাতে অভিন্ন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিকে স্বীকার করে দুটি অঞ্চলই হাতে হাত ধরে এক পাকিস্তানের শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি বলেন, ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনে আওয়ামী লগের জয়লাভ করার ব্যাপার টাকে ইয়াহিয়ার মন্ত্রণাদাতারা ভালো চোখে দেখেনি। সামরিক একনায়কেরা বুঝতে পেরেছিল জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার সময় এসে গেছে। এই উপলব্ধিতেই তারা মাত্র ৩০টি আসন পাওয়া জুলফিকার আলী ভুট্টোকে নিজেদের দলে টেনে নিল।

ভুট্টো ঘোষণা করলেন ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন তিনি বয়কট করবেন। চাপের মুখে ইয়াহিয়া পরিষদ অধিবেশন বাতিল করলেন। শেখ মুজিবুর রহমান নিয়মতান্ত্রিকভাবে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে হরতালের কর্মসূচি দিলেন। পূর্ব বাংলার সমগ্র জনগোষ্ঠী তাঁর আন্দোলনের সাথে যোগ দিল। কেননা, পূর্ব বাংলার জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের আইনসম্মত শাসক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। বিচারপতি চেীধুরী বলেন, এই পরিস্থিতিতে ইয়াহিয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। শেখ মুজিব তা গ্রহণ করেন। আর শেখ সাহেব যখন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন, তখন জাহাজ ভর্তি অস্ত্র ও পাকসেনা পাঠানো হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। তারপর ঘটলো ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনা। যার শুরু বৃহস্পতিবার ২৫ মার্চের রাতে। আমার ছাত্র ও অধ্যাপকরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও এ্যাপার্টমেন্টে ঘুমিয়ে আছে, পুরো ঢাকা শহর নিদ্রামগ্ন-সেনাবহিনী নেমে এল পথে, নির্বিচারে হত্যা করলো ছাত্র ও অধ্যাপকদের। তিনি বলেন, পূর্ব বাংলার জনগণ জেগে উঠেছে। আওয়াজ তুলেছে স্বাধীনতার। নতুন এক দেশের অভ্যুদয় হয়েছে-তা আজকের বাংলাদেশ। কোনো দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিক বা না কৌশলগত কারণে না দিক, বাস্তবতা হলো ইয়াহিয়ার বাহিনী ঢাকাকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে। এই বাহিনীকে প্রত্যাখ্যান করেছে সমগ্র জাতি। কারো পক্ষেই বাংলাদেশকে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্বাধীন রাখা সম্ভব নয়। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে এভাবে বন্দি রাখা যাবে না।

আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার ও পাকসেনা পূর্ব বাংলা নিয়ন্ত্রণ করছে’ তা মোটেই সত্যি নয়। সংখ্যালঘূর নিয়ন্ত্রণে জনগণকে আতঙ্কিত করে কখনো কোনো দেশ চালানো যায় না। পূর্ব বাংলার জনগণ জানে পাকিস্তানের এই শাসন, পাক সেনা এই আস্ফালন আর বেশি দিন টিকবে না। আমরা এখন ভালোভাবেই জানি, উপনিবেশ থেকে আমরা আমাদের স্বাধীনতার মর্যাদাকে আয়ত্ত করতে যাচ্ছি।

তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, জীবনযাপন,সংস্কৃতি ও ভাষায় আমরা স্বতন্ত্র। আমাদের জনগোষ্ঠী আলাদা। জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার আমাদের আছে।

তথ্যসূত্র : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

(ওএস/পিএস/জুন ০৮, ২০১৯)