ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

প্রচ্ছদ » প্রবাসের চিঠি » বিস্তারিত

ভৈরবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদ এবং তার পরের ঘটনা

২০১৯ আগস্ট ০৫ ১৩:২০:৫৩
ভৈরবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদ এবং তার পরের ঘটনা

মাহবুবুর রহমান : ১৫ই আগষ্ট বিকালের কর্মসূচি ছিলো নিউ হোষ্টেলে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সকলের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় মিলাদের আয়োজন৷জোহরের নামাজের পর আক্কাছ ভাইয়ের আমন্ত্রনে মসজিদের ইমাম সাহেবরা এলেন৷স্হানীয় আওয়ামী লীগ ছাত্র লীগের নেতা-কর্মীরা আসতে শুরু করেছেন৷এমন সময় শোনা গেল ভৈরব থানার পুলিশ আমাদের নিউ হোষ্টেল ঘেরাও করেছে ৷তৎকালীন টাউন দারোগা কয়েকজন পুলিশ নিয়ে উপরে আসলেন, সিপাহিরা ছিলো সবারদিকে রাইফেল তাক করে ৷নির্দেশ দেয়া হলো সবাইকে থানায় যেতে হবে ৷কেউ পালাবার চেষ্টা করা হলে গুলি করা হবে ৷বাজার মসজিদের কয়েকজন ইমাম সাহেব সহ সকলকেই ধরে নেয়া হলো থানায়, তার মধ্য থেকে ২২ জনকে করে লকআপে অর্থাৎ ভৈরব থানার ছোট্ট হাজতে পুরা হলো ৷কারণ আমাদের অপরাধ শুধু মিলাদ এর আয়োজন৷পুলিশ এবং তৎকালীন টাউন দারোগার অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ আমাদের সেদিন হজম করতে হয়েছিলো ৷

আমাদের ২২ জনকে সকালে অভূক্ত অবস্থায় হাতে হেন্ডকাপ এবং কোমরে দড়ি বেঁধে ১০টার লোকাল ট্রেনে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে কড়া পুলিশ পাহারায় পায়ে হেটে ভৈরব রেল ষ্টেশনে নিয়ে যায় ৷কিশোরগঞ্জ জেল খানায় আমাদের সাধারণ কয়েদিদের সাথে যে ঘরটায় রাখা হয়, সেখানে মানুষতো দূরের কথা পশুকেও রাখা যায়না ৷সাবজেলে থাকবার জঘন্যতম এক অভিজ্ঞতা সেদিন হয়েছিলো ৷সারা রাত আমরা কেউ ঘুমোতে পারিনি, সারা রাত বসে ছিলাম ৷পরদিন সকালে যে খাবার দেয়া হয়েছিলো তা যেন অমৃত মনে হয়ে ছিলো ৷কারণ আমাদের সকলের পেটে ছিলো সর্বগ্রাসী ক্ষুধা ৷শুরু হলো আমাদের জেল জীবন ৷প্রথম দফায় ১২ জনকে মুক্তি দেয়া হলো, জেলারকে বুঝিয়ে একটা আলাদা সেলের ব্যাবস্থা করা হলো আক্কাছ ভাইয়ের প্রচেষ্টায় ৷

অতপর বাকি ১০ জনের মধ্যে ৫ জনকে জেলা কর্তৃপক্ষ মুক্তি দিলেন ৷আমরা বাকী রইলাম ৫ জন আক্কাছ ভাই আমি, আমার বন্ধু আসাদ, মফিজ এবং তারই সহপাঠী দ্বিজেন ৷দ্দিজেন যদিও ছাত্র রাজনীতিতে তেমন জড়িত ছিলোনা, একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্র হিসেবে, সন্দেহভাজন হিসেবে আমাদের সাথে রাখা হয় ৷ জেলে থাকা অবস্থায় অনেক নতুন অভিজ্ঞতার সামনাসামনি হতে হয়েছিলো ৷এমন কতো ঘটনা মোকাবেলা করতেন, আমাদের অকুত ভয় আক্কাছ ভাই, আমার জীবনে যত শাহসী মানুষ দেখেছি, তিনি আজও আমার বিচারে তার মতো সৎ সাহশীকে আর কোথাও দেখিনি ৷৪০ দিন বাদে এবার এলো সরকারী অফিসার এস. বি. থেকে হোম মিনিষ্ট্রির তদন্তে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে, জেলারের কক্ষে আমার ডাক পড়ল ৷ আমি গেলাম ৷

আমাকে আমার নাম ধাম ঠিকানা রয়স এসব জিজ্ঞেস করার পর বলা হলো-আচ্ছা ১৫ই আগষ্ট সকালে ঘুম থেকে জেগে তুমি গ্রেফতার হবার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কি করেছো তার একটা বিবরন দাও ৷আমি শুরু করলাম সকালে কি কি করলাম ব্যাক্তিগত কাজ এসব বলে এক সময় যখন বলতে শুরু করলাম আমাদের জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীতে আমরা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছিলাম, তার এবং তার পরিবারের সকলের আত্বার মাগফেরাত এবং শান্তির জন্যে দোয়া চাইতে ৷তিনি হেসে তাচ্ছিল্লর সাথে বলেছিলেন হে যুবক তূমি কি জানো তুমি কি বলছো ৷আমি অত্যান্ত শান্তগলায় বলেছিলাম আমি খুব ভালো করে জানি আমি কি বলছি ৷তিনি বলেছিলেন দেখো যুবক, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুকে এখন মুছে দেয়া হয়েছে ৷অতএব তুমি যদি সহসায় মুক্তি পেতে চাও তাহলে এই কথাগুলো বাদদিয়ে বলতে হবে

আমি প্রতি উত্তরে বলেছিলাম দেখুন তিনিতো একছন মুসলমানও ছিলেন, আর তার জন্যে মিলাদ পড়তে গিয়ে আজ এই সাব জেলে বিগত একমাসেরও বেশী সময় ধরে আছি ৷তাকে বঙ্গবন্ধু জাতীর জনক এসব বলার জন্য যদি কোন আর বড় ধরনের শাস্তি বর্তমান সামরিক সরকার আমার জনায নির্ধারন করেন, আমি একটুও চিন্তিত নই মনে পড়ে সেদিন সেই মুহুর্তে খুবই শান্ত ভাবে এই কথাটী বলতে পেরেছিলাম ৷ আমাকে অনেক রকম ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হলো, বললো তোমাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, সামরিক আইনের ৫/২এ ধারায় তোমার এই সাক্ষাতকার হোম মিনিষ্ট্রির মাধ্যেমে যাচাই হবে, এসব বললে জীবন জেলেই কাটাতে হবে, সহজ ভাষায় বলো সময়মতো জেল থেকে বেরিয়ে পরিবারের কাছে ফিরে যাও, সব পাল্টে গেছে ৷

আমি ওনাকে বলালাম আমি যা বলেছি সরল সত্য, আপনি তাই লিখুন, লিখিত কাগজটায় আমার স্বাক্ষর লাগলে আমি যা বলেছি তা না লিখলে আমি কাগজটায় সাইন করবোনা ৷ অতপর ভদ্রলোক আমারদিকে কিছুক্ষন তাকালেন এবং মাথা নেড়ে লিখতে শুরু করলেন, আমার পরে আক্কাছ ভাইয়ের সাথে আরোও প্রচন্ড বাকবিতন্ডা হয়, মনে হয় এস বি অফিসারের রিপোর্টের পরেই বিশেষ আইনের ধারার আদেশ আমাদের নামে আসে, অনির্দৃষ্টকালের আটক আদেশ সহ জেলা কারাগারে পাঠাবার নির্দেশ আদেশটা যেদিন এলো, সাব জেলার আমাকে এবং আক্কাছ ভাইকে তার অফিসে ডাকলেন, জেলার বললেন আপনাদের ময়মনসিংহ জেলা কারাগারে পাঠাবার নির্দেশ এসেছে ২/৩ দিন পর ঈদ ঈদের ছুটি শুরু হয়ে গেছে, আপনাদের পাঠাতে প্রয়োজনীয় ফোর্স পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ, তাই আপনারা ঈদ করে যাবেন, না এখনি যাবেন, আমরা মনে মনে আনন্দিত হলাম৷কারণ তৎকালিন ময়মনসিংহ জেলা কারাগারে সারা জেলার ৩৫০ জনের বেশী রাজবন্দিকে বিনা কারনে জিয়াউর রহমান তার মার্শাল বিভিন্ন আইনে রাজবন্দি করে রাখা হয়েছিলো৷

কিশোরগঞ্জ জেলে রাজবন্দির মধ্যে শুধু আমরা পাচজনই ছিলাম ৷মনে হলো আমরা যেন একটা নরক থেকে একটা নতুন স্বর্গ যাত্রার একটা নতুন জগতের পরিবেশে যাচ্ছি ৷জেলারকে অনুরোধ করলাম, ভাই আমরা কালই চলে যেতে চাই ৷ জেলার সাহেব আমাদের আবেগ আমাদের উচ্ছ্বাসকে মনে হলো বুঝতে পারলেন ৷ফোর্স ব্যাবস্থা করতে পারলে আমি আপনাদের কালই পাঠাবো ৷আমরা সকালের অপেক্ষায় রাতে কেউ ঘুমালামনা, সকাল হলো৷ সকাল ৮টার মধ্যে খবর পেলাম আমাদের ময়মনসিংহ নেয়া হবে ৷ আমরা তৈরি হলাম ৷ আমাদের স্কট করে নেয়ারজন্য ৪ জন পুলিল ও একজন অফিসার এলো৷জেল গেটে পুলিশ অফিসারের সাথে আমাদের দেখা, পুলিশ অফিসার অত্যান্ত বিনয়ের সাথে বলল, ভাই আমি একজন বি এ পাশ করা পুলিশ ৷আপনারা সকলেই শিক্ষিত আমি আপনাদের সন্মান করে হাত কড়া লাগাবোনা ৷

রিকশায় চড়ে আমরা কিশোরগঞ্জ রেল ষ্টেশনের দিকে রওয়ানা হলাম ৷কিশোরগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী ভৈরব নূর ষ্টিম প্রেসের শাহজাহান ভাই-এর শ্বশুর পরিবার যাদের অবদান, আমাদের কিশোরগঞ্জ সাবজেলের খাবার ক্ষেতে হয়নী, এই পরিবারটি প্রতিবেলার খাবার পঠিয়েন, আমরা যতোদিন ছিলাম, শুধু খাদ্য নয় জীবন যাপনের নিত্য প্রয়োজনীয় সকল কিছুই অকৃপন ভাবে সরবরাহ করে গেছেন ৷ আমরা তাদের সাথে পথিমধ্যে দেখা করে যাবো, এই অনুরোধও পুলিশ সদস্য ভাইরা রেখেছিলেন ৷তাদের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে যখন আমরা পুলিশসহ গেলাম তিনি সেই সময়ে আমাদেরকে নগদ ৩০০ টাকা হাত খরচ নগদ, প্রচুর সিগারেট, বিস্কুট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দিয়েছিলেন ৷ট্রেনে চড়ে আমরা সন্ধ্যার পর পর জেলা শহর ময়মনসিংহ পৌঁছলাম ৷ ভাবলাম জেলে গেলে আমরা রাতের খাবার পাব না স্টেশনের কাছের একটা হোটেলে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে আমরা খেলাম ৷৩০০ টাকা শেষ হয়নী, অবশিষ্ট টাকা দিয়ে বিমল মিত্রের কড়ি দিয়ে কিনলাম বইটিসহ আরো কখছু বই কেনা হলো ৷

জেল গেটের কাজ সম্পন্ন করার পর ভমতরে ঢুকা মাত্রই দেখলাম, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন, ভৈরবের বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা জনাব ছায়েদুল্লা ৷তাকে আমদের পুর্বে গ্রেফতার করা হয়েছিলো ৷এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় যুব নেতা জনাব ছৈয়দ আহম্মদ এবং বর্তমানে আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ,প্রসংগত উল্লেখ না করলেই নয়, আমাদের আক্কাছ ভাই, হামিদ ভাইয়ের অত্যান্ত স্নেহভাজন ছিলেন, ভিতরে আমাদের যে দালানে নেয়া হলো,সেই দালানে সারা জেলার সকল আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিষ্ট পার্টি জাসদের এবং ছাত্র লীগ, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মিদের বন্দি করে রাখা হয়েছে ৷

তবে আমরা দারুণ আনন্দিত ৷নরক থেকে যেনো নতুন স্বর্গে এলাম ৷পরদিন থেকে আমাদের একটা মেস অর্থাৎ১০/১২ জনের গ্রুপ করা হলো ৷কিশোরগঞ্জের বিশিষ্ট ন্যাপ নেতা জনাব নাজিম কবির (তিনি এখন একজন প্রয়াতো বহু বছর আগে মৃত্যুকে আলিংগন করেছেন) আমাদের এই কবির ভাই ছিলেন,সকলের কেন্দ্র মনে হতো তিনিই এই পরিবারের মা সকলের সকল চাওয়া তিনি বুঝতেন, এবং আরো ছিলেন বাবু বিকাশ মজুমদার, সেকালের অত্যান্ত ত্যাগি ন্যাপ নেতা, শ্রদ্ধেয় গংগেস সরকার আমরাফ নবাগত পাচ জন, এবং এবিসন সাংমা ও গোপাল কোচ নামক দুই জন উপজাতীয় বন্দি সহ আমরা ছিলাম একটি পরিবার, আমাদের সুখ দুঃখের সকল সাথীদের নয়ে, সেখানে একটা সমাজ তৈরি হয়েছিলো ৷বাইরের জগতটা আমাদের দারুনভাবে আকর্ষণ করতো আত্মীয় মা বাবা আপন জনের মুখ অনেকদিন দেখিনি ৷কবে দেখতে পাবো তাও আমাদের কারো জানা ছিলোনা ৷

মুক্তির জন্য নিদারুণ প্রতিক্ষা তেমন প্রকট ছিল না কেননা ইতিমধ্যেই আমাদের কারাগারের অভ্যন্তরের সমাজটাকে মনের অজান্তে কেমন যেনো ভালোবেসে ফেলেছিলাম একদিন আমার মুক্তির সংবাদ এলো ৷ইতিমধ্যে অনেকেরই আসছে মুক্তির সংবাদ ৷জিয়ার সরকার আন্তরজাতিক চাপে আমাদের ছাড়তে বাধ্য হলেন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, আজ আমি চলে যাব ৷ চলে যাচ্ছি কারাগারের সদর ফটকের কাছে ৷আমার মনে হচ্ছিলো পিছনের ফেলে যাওয়া আমার এতোদিনের পরিবারের সাথীদের ছেড়ে যেতে যেনো দুঃখ হচ্ছিলো, কোথায় একটা কষ্ট আমাকে সামনে যেতে, আনন্দ অনুভূতির কাছে একটা বেদনাকে সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি, তার কাছে আমার মুক্তির আনন্দ বড় করে আমার মনকে আন্দলিত করতে পারছে না, লোহার বড় সদর দরজায় মাথা নিচু করে বাইরে যখন তাকালাম-আমি দেখলাম আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা এবং আমার বড় ভাই, আমার অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছেন পত্রিকার মাধ্যমে আমার মুক্তির সংবাদ জেনেছেন ৷সেদিন আমার কোন রাজনৈতিক সহকর্মী আমাকে নিতে আসেনি, নিষিদ্ধ ছিলো সকল কিছু নিষিদ্ধ ছিলো বঙ্গবন্ধু, নিষিদ্ধ ছিলো রাজনীতি, তবুও নিজের মনের কাছে প্রশ্ন ছিলো রাজনৈতিক সহকর্মী আর পরিবারের সম্পর্কের বাঁধন কোনটা আজও উপলব্ধি করতে পারিনি ৷

লেখক : ইতালীর ভেনিস প্রবাসী।