ঢাকা, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২ পৌষ ১৪২৬

প্রচ্ছদ » প্রবাসের চিঠি » বিস্তারিত

জাতিসংঘে হ্যাট্রিক করতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা

২০১৯ সেপ্টেম্বর ২৬ ১৪:১১:৪৮
জাতিসংঘে হ্যাট্রিক করতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা

প্রবাস ডেস্ক : একই বিষয় নিয়ে পরপর তিনবার জাতিসংঘে ভাষণ দিয়ে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা রোহিঙ্গা সংকট নিরসন নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিশ্বনেতাদের সামনে ভাষনের হ্যাট্রিক করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামীকাল (২৭ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন নিয়ে তিনি আবারো ভাষণ দেবেন। গত দু'বছর ধরে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিশ্বনেতাদের সামনে গত দু'বছর ধরে তিনি ভাষন দিয়ে আসছেন।এবারে বিশ্বনেতাদের সামনে চার প্রস্তাব তুলে ধরবেন তিনি। জাতিসংঘ সদর দফতরে গত মঙ্গলবার ওআইসি এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ওই চার প্রস্তাবের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। খবর বাংলা প্রেস।

‘রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: এ ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক ওই বৈঠকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে বাংলাদেশ পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে কফি আনান কমিশনের সুপারিশের পূর্ণ বাস্তবায়ন, রাখাইন রাজ্যে ‘বেসামরিক পর্যবেক্ষকসহ সেফ জোন’ প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। এবারও বাংলাদেশ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চার প্রস্তাব তুলে ধরবে। প্রস্তাবগুলো হচ্ছে:
রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মিয়ানমারকে তার রাজনৈতিক সদিচ্ছা স্পষ্ট করতে হবে, বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বাতিল করে রোহিঙ্গাদের মধ্যে মিয়ানমারের প্রতি আস্থা তৈরি করতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের ব্যবস্থা করতে হবে, রাখাইন রাজ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে মিয়ানমারকে অবশ্যই অন্যদের মতো রোহিঙ্গাদেরও নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিশ্বনেতাদের সামনে ভাষনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন,অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণের মাধ্যমে চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করতে হবে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে রাখাইন রাজ্য হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত সকল রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিলেন তিনি।

ওই ভাষনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এই মুহূর্তে নিজ ভূখণ্ড হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত ৮ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান নৃশংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থার ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। এই নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

আন্তর্জাতিক আভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে গত তিন সপ্তাহে চার লাখ ত্রিশ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া ঠেকানোর জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সীমানা বরাবর স্থলমাইন পুঁতে রাখছে। এতে আমরা ভীষণভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এ সব মানুষ যাতে নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন এখনই তার ব্যবস্থা সুষ্ঠ ব্যবস্থা গ্রহন করার জন্য আহবান জানান তিনি।

একই সঙ্গে তিনি সব ধরণের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের নিন্দা জানান। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলছে। তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা বন্ধে এবং ঐ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ ও জাতিসংঘের মহাসচিবসহ রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানান।

এদিকে, গত ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণসহ মিয়ানমার সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কথা জাতিসংঘে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব হয়েছে মিয়ানমারে, তাই এর সমাধান সেখানেই হতে হবে।

দ্রুত রোহিঙ্গা সংঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে, আমরা তার আশু বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। এ জাতীয় ঘটনাকে অগ্রাহ্য করে শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত ও অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে গত বছর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আমি পাঁচ-দফা প্রস্তাব পেশ করেছিলাম। আমরা আশাহত হয়েছি-কেননা আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমারকে প্রতিবেশী দেশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম থেকেই আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে মিয়ানমার মৌখিকভাবে সব সময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কোন কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না। শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা আশাহত হয়েছি, কেননা আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।”

সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আন্তরিক চেষ্টার পরও বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কতটা মানবেতর জীবনযাপন করছে, সেই চিত্র প্রধানমন্ত্রী ১৯৩ দেশের এই বিশ্বসভায় তুলে ধরেছিলেন।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার মধ্যে একাধিক চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ী বাংলাদেশ সব প্রস্তুতিও নিয়েছে। কিন্তু তারপরও মিয়ানমার যে নানা কৌশলে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত করছে- সে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে বলেন।

তিনি বলেন, “মিয়ানমার মৌখিকভাবে সব সময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না।”

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত নিপীড়ন চলে আসছে কয়েক দশক ধরে। বিভিন্ন সময়ে সহিংসতার মুখে সেখান থেকে পালিয়ে এসে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। তাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বার বার আহ্বান জানানো হলেও মিয়ানমার সাড়া দেয়নি।

২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কয়েকটি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ঘাঁটিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর সেখানে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। জাতিসংঘের হিসাবে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা গত এক বছরে বাংলাদেশে এসেছে।

ব্যাস্তচ্যুত এই রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা জাতিসংঘে তার ভাষণে বলেন, “একজন মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশাকে আমরা যেমন অগ্রাহ্য করতে পারি না, তেমনি পারি না নিশ্চুপ থাকতে।”

তিনি আরো বলেছিলেন জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে-আমরা তার আশু বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। 'আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, মিয়ানমার প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় প্রথম থেকেই তিনি আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। কিন্তু পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়নমারের এই নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা সাধ্যমত তাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিশুদের যত্নের ব্যবস্থা করেছি।”
এই কাজে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসিসহ বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যতদিন তাদের দেশে ফেরত যেতে না পারছে, ততদিন তাদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রেখে নতুন আবাসন নির্মাণের কাজে সরকার হাত দিয়েছে।

“আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। একইসঙ্গে রোহিঙ্গারা যাতে সেখানে যেতে পারেন তার জন্যও আমি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চাচ্ছি।”

(পিআর/এসপি/সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯)