ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

হাওলাদার বাবার সৈয়দ পুত্র : বরগুনার বাটপার বাবুল চোরার কাহিনি শেষ হবার নয়!

২০১৯ অক্টোবর ১৭ ২২:৪৮:১৩
হাওলাদার বাবার সৈয়দ পুত্র : বরগুনার বাটপার বাবুল চোরার কাহিনি শেষ হবার নয়!

শফিকুল রাজু


এসএসসির গন্ডি না পেরিয়েও সার্টিফিকেট জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি নাম পাল্টে নিয়েছেন, বাগিয়ে নিয়েছেন উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ! তার টাকা ও সম্পদের উচ্চতাও হিমালয় সমান! এই বিখ্যাত ব্যক্তিটি হলেন বরগুনা জেলার ফুলঝুড়ি ইউনিয়নের আন্ধারমানিক গ্রামের আলী আকবর হাওলাদারের বখাটে ছেলে বাবুল হোসেন; যিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদেশ সফরের সঙ্গী হয়েছেন বেশ কয়েকবার! অনুসন্ধানে তার সম্পর্কে বেরিয়ে এসেছে আরও বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য।

বাবুল হোসেনই হালের এস এম মশিউর রহমান শিহাব,তার পূর্ণ নাম হচ্ছে সৈয়দ মোহাম্মদ মশিউর রহমান শিহাব। বরগুনাতে ইদানীং তিনি জিকে শামীমের কার্বন কপি হিসেবেই আলোচিত। তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন সার্টিফিকেট জালিয়াতির মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে। অনুসন্ধানে জানা যায় মশিউর রহমান শিহাব ১৯৯৩ সালে রোডপাড়া শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে এক বছর পড়াশুনার পরে গৌরিচন্না মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে দুই বছর পড়াশুনা করে ১৯৯৬ সালে নবম শ্রেণিতে বরগুনা কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই ১৯৯৮ সালে বরগুনা থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এসব বিদ্যালয়ের ভর্তি বই ও দৈনিক হাজিরা খাতায় তার নাম উল্লেখ ছিলো মোঃ বাবুল হোসেন। পিতার নামের জায়গায় ছিলো আলী আকবর হাওলাদার। দীর্ঘদিন নিরুদ্দেশ থাকার এক দশক পর বাবুল হোসেন সৈয়দ মোহাম্মদ মশিউর রহমান শিহাব তথা এস এম মশিউর রহমান নাম ধারণ করে আবির্ভূত হন বরগুনায়। বরগুনায় বর্তমানে এমন কথা প্রচলিত রয়েছে যে, এই বাবুল হোসেন প্রকৃত মশিউর রহমান মারা যাওয়ার পর, তার সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে নিজের নামে চালিয়ে নাম-ধাম পদবি সবই পরিবর্তন করে নিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরগুনা জেলা আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা বলেন, বর্তমানে বাবুল হোসেন তার নামের পদবির জায়গায় সৈয়দ উপাধি ব্যবহার করেন, যেখানে তার বাবার নামের পদবি হচ্ছে হাওলাদার। হাওলাদার বংশে নিশ্চয়ই সৈয়দ পদবি নিয়ে কেউ জন্মাবে না! এটা ভাবলেই বাবুল হোসেনের জালিয়াতির সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায়।

বরগুনা থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে বাবুল হোসেন ঢাকায় এসে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন বলে জানা যায়। এ সময়ে তার নেতৃত্বে শান্তিনগর মগবাজার এলাকায় ভয়ঙ্কর এক ছিনতাইকারি চক্র গড়ে ওঠে। এছাড়া এসময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন লোকজন এবং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করতে থাকেন তিনি। রাজধানী ঢাকার একাধিক থানায় তার বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই ও জালিয়াতির ১০টিরও অধিক মামলা হয়। ৩১ অক্টোবর ২০০৭ সালের এমন একটি মামলার এজাহারে দেখা যায়, মশিউর রহমান নামধারী বাবুল হোসেন ত্রিরত্ন ট্রেডার্সের কর্ণধার জনৈক জাহাঙ্গীর আলম সিকদারের নিকট থেকে কাগজ বিক্রির উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ থেকে মালামাল খালাসের কিছু জাল দলিলপত্র বানিয়ে ১৫ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে উধাও হয়ে যান। জাহাঙ্গীর আলম সিকদারের এজাহারের প্রেক্ষিতে ঢাকার কোতোয়ালি থানা পুলিশ ২০০৮ সালের ২৮ জুন যে অভিযোগপত্র দেয় [মামলা নম্বরএম আর ৫৭৩/০৮] , সেখানে তদন্তে বেরিয়ে আসে ফিল্মি স্টাইলে জালিয়াতির চমকপ্রদ বিভিন্ন তথ্য। অভিযোগপত্রে জালিয়াতির সত্যতা খুঁজে পাওয়ার সাথে সাথে বাবুল হোসেনের পরিচয় উল্লেখ করতে গিয়ে এস এম মশিউর রহমান, মো. আসাদুল আলম, বাবুল, বাটপার বাবুল, শিহাব উদ্দিন, জিয়াদ, নিলয়, শিহাব নিলয় নামসহ তার সম্পর্কে সর্বমোট ৮টি নামের অস্তিত্ব খুঁজে পায় ঢাকার কোতোয়ালি থানা পুলিশ।
ঢাকার কোতোয়ালি থানার ওই জালিয়াতি মামলায় আটক থাকাবস্থায় বাবুল হোসেনকে এক এগারোর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় গ্রেফতার হওয়া আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রীর সেবক হিসেবে নিয়োগ করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। চতুর বাবুল ব্যক্তিগত কাজকর্ম দিয়ে সেই প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্যের মন জয় করে নেন। এরপর ২০০৮ এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে বাবুল হোসেন সে প্রভাবশালী রাজনীতিকের আনুকূল্য পেয়ে জামিনে মুক্ত হয়ে আরো দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠেন। জেল থেকে মুক্ত হয়ে বাবুল স্পন্দন পাওয়ার এন্ড এনার্জি লিমিটেড নামে তৃতীয় শ্রেণির ক্যাটাগরির একটি লাইসেন্স করে বিদ্যুৎ ভবনের কতিপয় অসাধু মহলের সহযোগিতায় ঢাকা পাওয়ার ডিসট্রিবিউশন কোম্পানির বিভিন্ন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে বেশকিছু বড় বড় টেন্ডার বাগিয়ে নেন। বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, তাকে বাদ দিয়ে অন্য কেউ ঢাকা পাওয়ার ডিসট্রবিউশন কোম্পানিসহ বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির টেন্ডার বাগাতে পারেন না। এমনকি অন্যকেউ এসব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ পেলেও সেখান থেকে কমিশন দিতে হয় মশিউর রহমান নামধারী বাবুল হোসেনকে। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোয় তিনি অঘোষিত ‘টেন্ডার কিং' হিসেবেই পরিচিত। এমন কথাও শোনা যায়, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কোথাও টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে বাবুল হোসেনের স্পন্দন পাওয়ার এন্ড ডিসট্রিবিউশন কোম্পানি সেখানে দরপত্র ফেলার পাশাপাশি প্রতিযোগিতার জন্য পছন্দের কিছু লোকজনকে দিয়ে বেশ কয়েকটি দরপত্র নিজেরাই ফেলেন। এসব জায়গায় তার সঙ্গে আলোচনা না করে কেউ কোনো দরপত্র জমা দিতে পারেন না। এসবের পাশাপাশি ই-টেন্ডারেও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তার। অর্থের বিনিময়ে কিংবা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এখানেও কাজ দিতে বাধ্য করেন তিনি। এসব ঠিকাদারি কাজ বাগাতে একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীকেও ব্যবহার করেন বাবুল।

মূলত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েক বছরের ব্যবধানে ভোজবাজির মতো অবস্থা পাল্টে যায় বাবুল হোসেনের। তারপর কায়দা-কানুন করে বিভিন্নজনকে হাত করে বাগিয়ে নেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক পদও। মূলত এরপরই আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। তিনি যে কেবল নিজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পন্দন পাওয়ার এন্ড এনার্জি লিমিটেডের নামে বড় বড় সব কাজ একাই বাগিয়ে নিচ্ছেন তাই নয়, অন্য কেউ কাজ পেলেও হিস্যা ঠিকই বুঝিয়ে দিতে হয় বাবুল হোসেনকে। তাকে কমিশন না দিলে অন্যরা নাকি কাজ করার সুযোগই পান না। মোদ্দাকথা এটাই, বাবুলের রাজ্যে টাকার বিকল্প কিছু নেই। আর এভাবেই দিন ভিখারি বাবুল হোসেন মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গিয়েছেন! ঢাকার ১৫ নিউ ইস্কাটন রোডের কুইন গার্ডেন পয়েন্টে মিনা বাজারের উপরে তার বিলাসবহুল অফিস। বরগুনা পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে বিলাসবহুল অত্যাধুনিক ভবন, তার পৈত্রিক নিবাস রোডপাড়ার আন্ধারমানিক গ্রামে তৈরি করেছেন বিলাসবহুল আরেকটি অট্টালিকা। ক্রয় করেছেন প্রায় হাজার বিঘা জমি। তাছাড়া ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় নামে বেনামে রয়েছে ২০টির বেশি প্লট এবং ফ্ল্যাট। একাধিক অস্ত্রধারী দেহরক্ষী দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকার পাশাপাশি সবসময় গাড়িবহর নিয়ে চলাফেরা করেন এই বাবুল হোসেন। নিজের নিরাপত্তায় তার গাড়ির আগে ও পরে থাকে একাধিক গাড়ি। ব্যাপারটা এমন যে, জিকে শামীমের মতো তিনিও নিজেই নিজের জন্য ভিআইপি মর্যাদার পরিস্থিতি তৈরি করে নিয়েছেন! রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে শুরু করে সামাজিক অনুষ্ঠান যেখানেই তিনি যান, সঙ্গে থাকে একাধিক অবৈধ অস্ত্রধারী দেহরক্ষী। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক মানের একজন মাদক ও ইয়াবা ব্যবসায়ী বলেও আলোচনা রয়েছে বিভিন্ন মহলে। তার আপন ভাগ্নে সুমন খান মাত্র কিছুদিন পূর্বে মাদক চোরাচালানের দায়ে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছেন, যিনি বাবুল হোসেনের ছত্রছায়ায় থেকে বরগুনায় মাদকের বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।

কতো কথা বললাম! এখনো আসল কথাটিই বলা হয়নি! দেশ জুড়ে বহুল আলোচিত বরগুনার রিফাত হত্যা মামলার দুর্ধর্ষ আসামি বাটপার বাবুল চোরা ওরফে মশিউর রহমান শিহাবের আপন ভাতিজা কামরুল হাসান সাইমুন। সাইমুন এখন জেলখানায় আটক। শিহাবের বড় ভাই কাওছার হোসেন হাওলাদারের ছেলে এই সাইমুন। এখানেও মজার একটি বিষয় লক্ষণীয়, কাউসার হোসেন হাওলাদারের ভাই বাবুল হোসেন হাওালাদার কিংবা মশিউর রহমান হাওলাদার হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক ছিল! কিন্তু না, তিনি হলেন হাওালাদার ভাইয়ের সৈয়দ ভাই, সৈয়দ মোহাম্মদ মশিউর রহমান শিহাব! ঘাটাঘাটি করলে আরও কতো বিস্ময় বেরিয়ে আসে, সেটা তো জানে শুধুই সময়!

আজ না হয় থাকুক এ টুকুই! লেখা হবে পরে বাবুলের আরও ইতিহাস! কেননা হাওলাদার বংশের সৈয়দ সন্তান তথা বরগুনার বাটপার বাবুল চোরা ওরফে হালের এসএম মশিউর রহমান শিহাবের কাহিনি তো শেষ হবার নয়!

লেখক : কবি ও সমাজ সচেতক।