ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

এ লড়াই কঠিন লড়াই- এ লড়াই জিততে হবে

২০১৯ অক্টোবর ২৫ ২২:১৬:৫৫
এ লড়াই কঠিন লড়াই- এ লড়াই জিততে হবে

রণেশ মৈত্র


সেপ্টেম্বর, ২০১৯ থেকে বাংলাদেশে এক লড়াই শুরু হয়েছে। যেন একটা যুদ্ধ। এর সুরু করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁকে বহু পদক্ষেপের কঠোর সমালোচক (অবশ্য সেগুলি গঠনমূলক) হলেও, তাঁর কয়েকটি গণমুখী কাজের প্রশংসা করে থাকি এবং তা কয়েক দফায় লিখে প্রকাশও করেছি নানা সংবাদপত্রে।

সে কাজগুলির মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং দ্রুততার সাথে আদালত প্রদত্ত রায়গুলির বাস্তবায়ন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তাদের শাস্তিও দ্রুত বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি (তবে তা অনেক কম খরচে করার সুযোগ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলেন-সুতরাং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো উচিত), নিজস্ব অর্থায়নে বিশাল পদ্মা সেতুর যথাসম্ভব দ্রুত নির্মাণ প্রভৃতি।

তেমনই দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাশা করি তাঁর সুরু করা দূর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই-যা মোটামুটি এখনও চলছে এবং তা অব্যাহতভাবে চলবে।

বহুবার বিভিন্ন সরকারকে দূর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরু করতে দেখেছি বটে তবে তার শিকার হয়েছেন শুধুমাত্র বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীরা। সরকার দলীয় নেতারা কদাপি ঐ অভিযানগুলির জালে আটকা পড়েন নি। এবারেই প্রথম তার ব্যতিক্রম ঘটলো এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে এবং দূর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরু নিজের ঘর থেকেই দুর্নীতি বিরোধী অভিযান শুর করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলো। আশা করি শেষ পর্য্যন্ত এবং দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে সকল দূর্নীতিবাজকেই ঐ জালে আটকানো সম্ভব হবে।

ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাদের একটি বড় অংশের দূর্নীতি অকল্পনীয় এবং তারা আজ বেপরোয়। একটানা এগার বছরের দলীয় শাসনের সুযোগে অন্যায়, অবৈধ সুযোগ গ্রহণ তারা একাট্ট্র। এ অভিযান ঠেকাতে তারা বহুদূর পর্য্যন্ত যেতে পারে। জামায়াতের নেতার বাড়িতে গিয়ে পালাতেও তাদের লজ্জাবোধ নেই এটাও প্রমান হলো। এর পরেও তারা মুখে জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান তোলে শুধু মাত্র দল ও মানুষকে বিভ্রান্ত করে আপন ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যে এবং তাতে তারা সফলও হয়েছে। এবারে এদের বিষদাঁত ভাঙ্গা প্রয়োজন এবং বিশ্বাস করতে চাই এ প্রতারকদের বিষদাঁত ক্ষমাহীনভাবে এবারে ভেঙ্গে দেওয়া হবে।

শুধু ছাত্রলীগ-যুবলীগ নয়। অনুরূপ কাজে লিপ্ত বহু সংখ্যক আওয়ামীলীগ ও চৌদ্দ দলীয় নেতা ও বিরোধী মহলেও তাদের অস্তিত্ব যথেষ্ট সংখ্যক আছে। নইলে এই যুবলীগের বা ছাত্রলীগের নেতারা এত বড় সাহস পেলেন কোত্থেকে ? বেশ কিছু মন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রী, এম.পি ও ছোট-বড় আমলা এই একই কাজে জড়িত। এরা অত্যন্ত ধূরন্ধর তাই সকল সম্ভাব্য পথে এদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনাগুলো বের করতে হবে এবঙ যথোপযুক্ত শাস্তির বিধান করতে হবে।

এরা বহুদূর যেতে পারে বহু চক্রান্তও করতে পারে। যদি দেখে তাদের স্বার্থ, তাদের অবৈধ পন্থায় উপার্জিত কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হারাতে বসেছে, যদি দেখে দীর্ঘ মেয়াদী সাজা নিশ্চিতভাবেই পেতে চলেছে তবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা এক বা একাধিক সিন্ডিকেট গঠন করে প্রধানমন্ত্রীকে সজোরে আঘাত হানবে এবং এমন কি সরকার উৎখাতের অপচেষ্টাতেও মেতে উঠতে পারে।

এই চিহ্নিত গণ দুশণদের অসাধ্য কোন কিছুই নেই। দীঘদিনের লালিত এই সুখের পায়রারা যুব ও ছাত্র সমাজের স্বার্থরক্ষার কোন কাজ করে নি। দিবারাত্র মদ, জুয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে সম্পদ বৃদ্ধি ও জৈবিক ক্ষুধা মিটিয়েছে। তাই অস্তিত্ব রক্ষায় এরা অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে ওঠার আশংকা কিন্তু অমূলক নয়।

বঙ্গবন্ধুর ভুল থেকেও শিক্সা নেওয়া প্রয়োজন। যখন তিনি যুদ্ধের ধ্বংসলীলা অপসারণ করে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে নিতে উদ্যোগী হন এবং দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচনে প্রবৃত্ত হন তখনই ঘরশত্রু বিশ্বাসঘাতক খোন্দকার মোশতাক দেশী-বিদেশী শত্রুরা একজোটে বঙ্গবন্ধুর মত অবিস্মরণীয় ও শক্তিশালী, জনপ্রিয় নেতার নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে উৎখাতই করে নি বঙ্গবন্ধুকেও সপবিারে নিহত করতে পিছুপা হয় নি। বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভক্ত এবং মুক্তিযুদ্ধের সফল নায়ক, মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদকে অপসারণ করায় ঐ ষড়যন্ত্রকারীদের বাড়তি সুবিধা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রীর আশে পাশেও তেমন ঘরের শত্রু বিভীষণদের অস্তিত্ব থাকতে পারে স্তাবকতায় তারা নোবেল পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। এমনতরো স্তাবকের তো অভাব নেই। তারা অসংখ্য-অগুন্তি। তাই তাদের দ্রুতই চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এই আশ পাশের লোকেরা বলতে আমি রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ীসহ সকল স্তরের কাছের মানুষকেই বুঝাতে চাইছি।

সামনে কৃষকলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ প্রভৃতির কাউন্সিল অধিবেশন। হঠাৎ করে এই সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অধিবেশন ডাকায় এ সংগঠনগুলির ভাল সংখ্যক নেতা-নেত্রীর মনেই আতংক বিরাজ করছে। বড় বড় পদের জন্য রীতিমত লবিং ও সুরু হয়েছে। আবার কোন কোন নেতা .. অনুযায়ী পদায়ন বাণিজ্যের কথাও ভাবছেন না তা নয়। কারণ যে সকল কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হবে তার সভাপতি-সম্পাদক থেকে সুরু করে সবগুলিই প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে বা তাঁর পছন্দমত হবে তা স্বাভাবিক নয়। কারণ অত সময় তাঁর নেই। তাই এ ব্যাপারে যাঁদের উপর তাঁকে নির্ভর করতে হয় বা হবে তাঁরা কেউ কেউ হয়তো অতীতের মতই প্রাপ্তি যোগের আশায় মশগুল। কাজেই প্রত্যাশা এমনটি যাতে না ঘটে, শ্বাবকেরা যেন প্রাধান্য না পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখে ... সৎ, নিষ্ঠাবান, সচ্চরিত্র সম্পন্ন একটি নেতৃত্ব গড়ে উঠুক সম্মেলনগুলি মাধ্যমে।

আর কড়াকড়ি ভাবে দেখা প্রয়োজন, এই সব সংগঠনের কেউ যেন ঠিকাদারী করার সুযোগ না পান। পেলে কাঁচা টাকার লোভে পড়ে আবার তাঁরা অনেকেই নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে সরকারি ব্যয় অযৌক্তিভাবে বাড়াতে থাকবে। এর অনেক উদাহারণও আছে যা প্রধানমন্ত্রীরও জানা।

বিষ্ময়কর লীগে না কি যখনগুলি বাংলাদেশে নির্মাণ ব্যয় পৃথিবীর সব চাইতে বেশী। কি করে তা সম্ভব হাজারবার ভেবেও তা বুঝে ওঠা যায় না। কারণ বেকারত্ব বেশী থাকায় বাংলাদেশে শ্রমিকের মজুরী আজও সর্বাপেক্ষা কম, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যও তাই। তা হলে কেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ নির্মাণ ব্যয় বাংলাদেশের হবে ? এটা শ্রেফ দুর্নীতি-জোচ্চুরীর কারণে ঘটছে। নির্মাণ ব্যয় ঠিকমত হলে এতদিনে শুধু পদ্মা সেতু নয়, দ্বিতীয় যমুনা সেতু, হাইওয়ে সম্প্রসারনের মত শত শত উচ্চামান সম্পন্ন রেলের বগি বা আমদানী করে বিপুল উন্নয়ন কাজ সমাধা করা সম্ভব হতো। আর তা না হওয়াতে দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড উপযুক্ত মাত্রায় ঘটতে পারছে না। ক্ষতি হচ্ছে দেশের ও জনগণের । কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু নেতা বা তজ্জাতীয় ব্যক্তি আঙুল ফুলে করাগছ হচ্ছে। রাজসিক দালান-কোঠা, গাড়ীঘোড়া এবং অকল্পনীয় ব্যাংক ব্যালান্সের মালিক হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন।

এবারে তাই সাপের লেজে পা দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক যে দেশে কিলবিল করা এই সাপগুলো ফণা তুলবে। কিন্তু তা যেন কোন ক্রমেই না করতে পারে ছোঁবল না মারতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধানে সাপগুলিকে মেরে ফেলতে হবে। নইলে ফণা তুলে রক্তে ভিষ ঢুকানোর মত ছোঁবল মারতে ওরা দ্বিধা করবে না। নির্মম হলেও ইতিহাস তেমন কথাই বলে।

আমরা জাতীয় পার্টি ও বিএনপির দুর্নীতি দেখেছি। দেখেছি তখন দুর্নীতিতে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে চিহ্নিত করতে। তখনকার দুর্নতির হোতারা আজও কেন যে ধরা ছোঁয়ার বাইরে তা বুঝে ওঠা দুস্কর। তবে এমন তথ্য বোধ হয় দুর্লভ নয় যে ভি দলীয় কুখ্যাত ঐ দুর্নীতিবাজদের অনেকে সরকারি দলের কারও কারও সাথে প্রকাশ্যে দিব্যি ব্যবসা বাণিজ্য করে দেশে বিদেশে বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে যাচ্ছে।

ভাবনায় আসে ১৯৪৭ মুসলিমলীগ অনেক লোকেই কাছে তেকে দেখার সুযোগ পেয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশ একটা অংশ দুর্নতিবাজ ছিণে সন্দেহ নেই। কিন্তু আজকের দুর্নীতিবাজদের সাথে তাদের তুলনা করলে দেখা যাবে তারা নস্যি। এ কথা বললে, ভাবতে লিখতেও লজ্জা লাগে কারণ পাকিস্তানের মত ইংরেজদের সাথে আপোষ করে স্বাধীন হয় নি বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কারও দয়ায় দান নয়। রীতিমত দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে নিয়মতান্ত্রিক গণ আন্দোলন এবং নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ ও চার লক্ষাধিক নারীর সম্ভম, লাখোকোটি বাড়িঘর ব্যবসাস্থল প্রভৃতি হারাণোর বিনিময়ে এই দেশের স্বাধীনতা অর্জন।

এখানে দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতার স্থান কিছুতেই হতে পারে না। তাবে যে কোন মূল্যে রুখতে হবে নইলে আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা আমরা রক্ষা রুখতে কিছুতেই পারব না।

ব্যাংক লুঠকারীরাও দেশের বড় জন্য আজও এদের গায়ে কাঁটার আচড় লাড়ে নি। উল্টো আরও ঋণ খেলাপিদেরকে নানাবিধ নতুন সুযোগ দিয়ে যৎসামান্য ঋন পরিশোধের বিনিময়ে বিশাল অংশের নতুন লোন পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে যাঁরাই থাকুন তাঁদেরকেও এই সরকার বা জনগণের শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে। যে সকল ব্যাংক মালিক, ব্যাংক কর্মকর্তা বা হিসাবধারী এ জাতীয় লুন্ঠনকারীরা নিজ নিজ স্বার্থে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা ধ্বংশ করে দিচ্ছে। এখানেও আঘাত হানা অত্যন্ত জরুরী।

আসলে এ সকল পরিস্থিতি মিলিয়ে আমাদের দেশের রাজনীতি তার গৌরব হারিয়েছে। প্রায় শতভাগ মানুষের বিবেচনাতেই রাজনীতি একটি ব্যবসা হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছে। এ থেকে রাজনীতিকে উদ্ধার করে রাজনীতিতে মানুষের স্বেচ্ছামূলক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চলমান এই অভিযান এক বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে আর তার জন্য নিম্নাক্ত পদক্ষেপগুলি অত্যন্ত জরুরী:-

দুই, অংশগ্রহনমূলক সুষ্ঠ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে স্বাধীন নিরপেক্ষ এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা;

তিন, নির্বাচনে সৎ, যোগ্য, দেশপ্রেমিকদেরকে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকদেরকে (ব্যবাসীদেরকে নয়) মনোনয়ন দেওয়:

চার নির্বাচনকে টাকা, ও অস্ত্রের খেলার হাত থেকে উদ্ধার করা এবং

পাঁচ, রাজনীতি ও নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার সম্পূণ বে-আইনী ঘোষণা করা।

এ চ্যালেঞ্জ নি:সন্দেহে কঠিন রীতিমত কঠিন এ লড়াই কিন্তু এ লাড়াই এ

লেখক : সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।