ঢাকা, রবিবার, ৭ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

গার্মেন্টস শ্রমিক অতঃপর করোনাভাইরাস ট্রান্সমিশন

২০২০ মে ০৭ ১১:১৬:০৬
গার্মেন্টস শ্রমিক অতঃপর করোনাভাইরাস ট্রান্সমিশন

কবীর চৌধুরী তন্ময়


দেখুন, গার্মেন্টস মালিক-সরকার পক্ষ মনে করছেন শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। আমিও বিশ্বাস করি। অনেক সিনিয়র অর্থনীতিবিদের সাথেও কথা বলেছি। গার্মেন্টস মালিক, যে কয়েকজন আমার বন্ধু-কথা বলেছি। তারাও মনে করেন, মহামারি করোনাভাইরাসের এই দিনগুলোতেও গার্মেন্টস বন্ধ রাখলে অচিরেই অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে যা ১৮ কোটি মানুষের জন্য বড় ধরণের ঝুঁকি। আর এই ঝুঁকি বা ওই ধ্বংসের হাত থেকে করোনাভাইরাস পরবর্তী সময়ে খুব তাড়াতাড়ি জাতিকে রক্ষা করা যাবে না। ফলে অনেক দিন পুরো বাংলাদেশকে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাটতে হবে।

এদিকে করোনাভাইরাসের ধাক্কায় মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি তলানিতে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির পূর্বাভাস, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের এই প্রবৃদ্ধি ২ থেকে ৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে। করোনা পরিস্থিতি কতদিন দীর্ঘায়িত হবে, তার ওপর জিডিপির পতন নির্ভর করছে বলে মন্তব্য বিশ্বব্যাংকের। আবার শুধু জিডিপি’ই নয়, করোনাভাইরাস দারিদ্র্যের হারেও নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। নগর দারিদ্র্য বাড়ার পাশাপাশি গ্রাম অঞ্চলেও গরীবের সংখ্যা বাড়বে বলে আভাস সংস্থাটির।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। তবে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। পরের ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে প্রবৃদ্ধি।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্টউইগ শেফার বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করে নিজ দেশের জনগণকে সুরক্ষা দেওয়াকে প্রাধান্য দিতে হবে। কেননা দরিদ্র মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে থাকেন।

এখন মহামারি করোনাভাইরাস বা কভিট-১৯ এর প্রাদুর্ভাবে অর্থনীতি যেমন ঝুঁকিতে আছে, ঝুঁকিতে আছে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যও। কোনটাকে গুরুত্ব দিতে হবে, সেটা সরকারকে আগে ঠিক করতে হবে। কারণ, মানুষ বাঁচলে দেশ ও অর্থনীতি রক্ষা হবে।

আর এটাই বাস্তব-দেশের দরিদ্র মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে আছেন। কিন্তু শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম দরিদ্র গার্মেন্টসকর্মীরা যেভাবে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, আইইডিসিআর-এর কোনও রকমের স্বাস্থ্যবিধি না মেনে গার্মেন্টসের কাজে যোগ দিয়েছে বা কর্মস্থলে যোগ দিতে রীতিমত বাধ্য হয়ে এসেছে-ওইসব লক্ষ-লক্ষ গার্মেন্টসকর্মীর মাঝে ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে তখন তারা সবাই গার্মেন্টসের কাজে যোগ দিতে পারবে? নাকি হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সাথে আরেক যুদ্ধে নিজেদের জড়িয়ে রাখবে?

ছুটি বাড়িয়ে লম্বা করলে কার্যত কী লাভ হবে-এটি বোধগম্য হচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যবসায়িক সংগঠনও মনে করছে, রমজানের দিনগুলোতে বা ঈদের আগেই তারা দোকান-শপিংমল খোলা রাখা উচিত। হয়তো খোলাও হবে। ইফতারের আয়োজনের জন্য ইতোমধ্যেই অনেক রেস্টুরেন্ট খোলা রাখা হয়েছে। বাজারগুলোতে কেউই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না।

এ নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সংবাদকর্মীদের বিশ্লেষণ এবং সাধারণ ক্রেতাদের সাথে আলোচনা করে যেটা বোঝা যায়, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তাদের বাধ্য হয়েই এভাবে বাজারে আসতে হয়েছে, হচ্ছে। সরকার খোলা মাঠে বাজার করার কথা বললেও এখনো অনেক খোলা মাঠ খোলাই আছে। নতুন করে ভ্রাম্যমান বাজার-বিক্রেতাও তৈরি করা তেমন সম্ভব হয়নি।

অব্যবস্থাপনার জন্য মূলত জনসমাগম এড়িয়ে চলা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। অন্যদিকে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ যেভাবে ধান কাটার মহোৎসবে মেটে উঠেছে; কোথাও কেউ জনসমাগম বা সামাজিক দূরত্ব বজায় আছে-প্রতীয়মান নয়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিও বটে।

তাই তথাকথিত ছুটি বাড়িয়ে-বাড়িয়ে যতই লম্বা করা হোক-আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমাদের উদ্যোগগুলো কার্যত সফল হবে না। করোনাভাইরাস থেকে খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশ মুক্ত হবে বলে মনেও হয় না। সরকারের নানা উদ্যোগ সফল করতে হলে কিংবা করোনাভাইরাস থেকে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে ‘কঠিন’ ও ‘কঠোরভাবে’ ১০ থেকে ১৫ দিনের লক-ডাউন অতি জরুরী।

আমাদের মনে রাখতে হবে, অভ্যাসগত ভাবেই আমরা আড্ডা প্রিয়। যেখানে শাস্তিযোগ্য আইনকে না মানার অভ্যাস সকল শ্রেণীপেশার মানুষের মাঝে প্রতীয়মান, সেখানে সরকারের মৌখিক বা প্রজ্ঞাপন-লিখিত আদেশ মানা-অনুসরণ করা; ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব বেশি আশার আলো দেখছি না। আর বাস্তবতাও তাই।

অন্যদিকে করোনাভাইরাস বা কভিট-১৯ এ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন-দিন বেড়েই চলেছে। অনেকে পরিবার আর সামাজিক ঘৃণার ভয়ে ডাক্তারের কাছে সংক্রামনের তথ্য গোপন করেছে, করছে। ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, র‌্যাব সদস্যও আক্রান্ত হয়েছে। ডাক্তারের পাশাপাশি কয়েকজন পুলিশ সদস্য ইতোমধ্যে নিহত হয়েছেন। গণমাধ্যমকর্মীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত সিনিয়র সাংবাদিক হুমায়ুক কবির খোকনও প্রথম সাংবাদিক হিসেবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিহত হয়েছেন।

হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তাঁর স্ত্রী-পুত্র। মহামারি করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সম্মুখযুদ্ধে ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, র‌্যাব সেনাবাহিনীর সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে-সাথে গণমাধ্যমকর্মীরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে-ঘাটে সমানতালে কাজ করে চলেছেন। বিশ্বাস-অনুমান করতে কষ্ট হলেও পরিসংখ্যানে মনে হচ্ছে, হয়ত কয়েকদিনের মধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের ঘর ছাড়িয়ে যাবে।

জেলা কিংবা বিভাগকে করোনাভাইরাস সংক্রামনের পরিসংখ্যাণ বিশ্লেষণ করে ঝুঁকি অনুযায়ী জোন ভিত্তিক ভাগ করে-করে সরকার দ্রুততার সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করেও অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু যাদের ওপর অর্থনীতি নির্ভর, তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে কিংবা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে অর্থনীতিকে কিভাবে রক্ষা করা যাবে? সরাসরি যদি বলি, গার্মেন্টসকর্মীহীন গার্মেন্টস কিভাবে সচল থাকবে? তার মানে, গার্মেন্টসকর্মীদেরও বাঁচিয়ে রাখতে হবে এবং সেটা যথাযথ ব্যবস্থার মাধ্যমে।

গার্মেন্টস মালিক-শ্রমিকদের জন্য সরকারের প্রণোদনার ভালো উদ্যোগও আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কোনো কিছু না বুঝে, বিচার-বিশ্লেষণ না করে এক সন্ধ্যায় গার্মেন্টসকর্মীদের ঢাকায় নিয়ে আসা আবার রাতেই ফিরিয়ে দেওয়া; মালিক-সরকার উভয় পক্ষই বিতর্কিত হয়েছে। সেসাথে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় অনেকের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এখন সীমিত আকারে গার্মেন্ট খোলা রাখার কথা বলা হলেও মূলত সীমিত শব্দটি বাস্তবে খাতা-কলমে আর প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সীমাবদ্ধ। গণমাধ্যমে গার্মেন্টসকর্মীরা স্বীকার করেছে, কাজে যোগ না দিলে তাদের চাকুরীচ্যুত করাসহ বকেয়া বেতনও দেওয়া হবে না। তাই রীতিমত বাধ্য হয়েই গার্মেন্টসে যোগদানের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রামে এসেছে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বৃষ্টি ও করোনাভাইরাসের শঙ্কা উপেক্ষা করেই মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌরুট দিয়ে ছুটে চলা ঢাকাগামী হাজার-হাজার গার্মেন্টস কর্মীদের ছবি-ভিডিও; মনে হচ্ছে করোনাভাইরাসকেই যেন স্বাগত জানাচ্ছে বাংলাদেশ!

সরকারের কঠোরনীতি আর সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত লক-ডাউন বা সেচ্ছায় ১০ থেকে ১৫ দিন বাসায় থাকা কার্যকর বা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। কভিট-১৯ ট্রান্সমিশন রোধ করতে পারলেই করোনাভাইরাসকে প্রতিহত করতে-সরকারের যথাযথ উদ্যোগেই সম্ভব।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট ফোরাম (বোয়াফ)।