ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

প্রচ্ছদ » শিল্প-সাহিত্য » বিস্তারিত

মাছ খেলা 

২০২০ মে ১১ ২২:৫৬:৪৩
মাছ খেলা 

বিশ্বজিৎ বসু


সকাল থেকে আকাশে মেঘ ছিল। দুপুর হতে অঝোরে বৃষ্টি । মনি কাকা কাঁথার তলে শুয়ে গোঁফে দিচ্ছে তেল। বৃষ্টি থামলেই যাবে মাছ ধরতে ।বৃষ্টির পর বড়শিতে মাছ ধরা পরে বেশী । সে কত রকমের মাছ। পুটি, টেংরা, টাকি, বাইম, কই, শিং । মাঝে মাঝে সরপুঁটি, রামেশ্বর টেংরাও ধরা পরে।

মনি কাকার মাছ ধরার বড়শিও অনেক। এর কোনটা পুটে বড়শি, পুটি মাছ ধরে। কোনটা কইয়ে বড়শি, কই মাছ ধরে। কোনটা শোলে বড়শি, শোল মাছ ধরে। এরকম আরো আছে বোয়ালে বড়শি, নলা বড়শি।

এক এক রকমের বড়শির ছিপও এক এক রকম। ছিপগুলো প্রায় সবই বাঁশের কঞ্চির। এর কোনটা লম্বা, কোনটা ছোট, কোনটা সোজা নরম লিকলিকে । শুধু নলা বড়শি আর কইয়ে বড়শির সিপ এক একটা আস্ত তল্লা বাঁশ।

মনি কাকার আরেক ধরণের বড়শি আছে। নাম ছোঁয়া বড়শি। প্রায় দুইশর মত । একফুট লম্বা মোটা পাটকাঠির মাঝে হাত দুয়েক লম্বা বড়শির সুতা বাধা । বর্ষাকালে যখন সারা মাঠ জলে ডুবে যায় তখন ছোঁয়া বড়শি দিয়ে মাছ ধরে মনি কাকা ।

মনি কাকার প্রিয় আধার কেঁচো। এটিই সবচেয়ে বেশী টেকসই আধার। এছাড়া মনি কাকা মাঝে মাঝে বল্লার টোপ, লাইলছের টোপ, আটার গুলি, ছোট মাছ, কিম্বা শামুকের ঘিতুও ব্যবহার করে ।

ইট পাজার ঘাট । আষাঢ়ে বৃষ্টির পর মরা গাঙ্গের এই ঘাটে মাছ পাওয়া যায় বেশী । বৃষ্টির পর হালট দিয়ে জল গড়িয়ে নামে এই ঘাটে। আর মাছেরা এসে ভীর করে উজান স্রোতের মুখে।

মনি কাকার সাথে আজ মাছ ধরার সাথী বিস্ময়। বিস্ময় এসেছে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে। মনি কাকার সাথে মাছ ধরতে আসতে পেরে সে বেজায় খুশি। "কিডস বুক অফ ফিসিং" এবং "Gone for fishing" নামে মাছ খেলার উপর বই দুটি পড়েছিল সে। বই দুটো পড়ার পর থেকে তার মাছ খেলার খুব ইচ্ছা। কিন্তু কোন সুযোগ হয়নি। আজই সে প্রথম কোন মাছ খেলায় অংশ নিচ্ছে ।

জলে পাঁচটি বরশি। চারটে বড়শির ছিপ মনি কাকার হাতের কাছে। একটা ছিপ দিয়েছে বিস্ময়কে। বুঝিয়ে দিয়েছে যখন টোনে টিপ দিবে তখন বড়শির ছিপ ধরবে। তারপর যখন টোন জলের নিচে তলিয়ে যাবে তখন টান দেবে।
জলের উপর ঝির ঝির বৃষ্টি। বাতাসে হালকা ঢেউ। দুজনে চুপ করে বসে আছে। দুজনের মাথায় তাল পাতার মাথাল। মাথালের উপর গুড়ি বৃষ্টির পুর পুর শব্দ। আর চারটি চোখ বরশির টোনে । কোনটা কখন টিপ দেয়।
কিছুক্ষন পর বিস্ময়ের বড়শি টোন নেচে উঠে।

নিঃশব্দ ভেঙ্গে মনি কাকা ডাকে

- বিস্ময়!
- হ্যাঁ, খেয়াল করেছি। বিস্ময় উত্তর দেয়।
- ছিপ ধরো।
-ধরেছি। কিন্তু টিপ দেয়া তো বন্ধ হয়ে গেল!
- হ্যাঁ, আবার দিবে।

আবার দুজনে চুপ চাপ। দুরে হালকা মেঘের গর্জন। না, টিপ আর দিচ্ছে না।

- বড়শিটা তোল তো! নীরবতা ভেঙ্গে মনি কাকা বলে।
- কেন মনি কাকা?
-দেখিতো আধারের কি অবস্থা ।

বিস্ময় বড়শি টেনে তোলে। মাছে আধার অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে। মনি কাকা নতুন করে আধার গেঁথে দেয়।
বিস্ময় বড়শিটা আবার ফেলে।

ফেলার সাথে সাথেই টোন নেচে উঠে আর সাথে সাথেই নিচের দিকে তলিয়ে যেতে থাকে । মনি কাকা বলে উঠে "টান দাও!"

বিস্ময় ছিপ ধরে টান দেয়। জলের ভিতর থেকে একটা মাছ উঠে আসে বরশির মাথায় । বিস্ময়ের মহা আনন্দ। আজইসে প্রথম মাছ ধরলো।

মনি কাকা মাছটি সাবধানে বড়শি থেকে খুলে রেখে দেয় হাড়িতে। তারপর বড়শিতে নতুন করে আধার গেঁথে দেয়। বিস্ময় আবার ছিপ ফেলে ।

জলে ভরা টেপা মাছের মত হাড়ির পেটটা মোটা। ভিতর লাফাতে থাকে মাছটি। বাইরে থেকে শোনা যায় খলাত খলাত শব্দ। বিস্ময়ের শরীরে তখন বয়ে চলেছে প্রথম মাছ ধরার শিহরণ। সে বারে বারে হাড়ির ঢাকনা সরিয়ে মাছটি দেখতে থাকে।

কিছুক্ষণ নিঃশব্দের পর হঠাৎ বিস্ময় মনি কাকাকে ডেকে বলে

- আচ্ছা মনি কাকা মাছটাতো খুব ছোট তাই না
- হ্যাঁ, মনি কাকা উত্তর দেয়।
- নিশ্চয় ওর মা বাবা আছে তাই না।
- যদি কারও বড়শি বা জালে ধরা না পরে তাহলে আছে।
- যদি থাকে নিশ্চয় ওর মা ওকে খুঁজছে! ওর মা নিশ্চয় কান্নাকাটি করছে !

মনি কাকা নিরব তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ের দিকে । তারপর উত্তর দেয় "তাতো জানিনা।"

-কেন জাননা ? আমি হারিয়ে গেল আমার মা বুঝি কান্না করবে না?
- হ্যাঁ করবে।
- তাহলে ওর মা নিশ্চয় কান্নাকাটি করছে । মাছটির নিশ্চয় মায়ের জন্য মন খারাপ তাইনা।
-হতে পারে।
- তাহলে মাছটি জলে ছেড়ে দেই। ও তার মার কাছে চলে যাক।

মনি কাকা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ের মুখের দিকে । তারপর বলে "ছেড়ে দাও"।

বিস্ময়ের চোখে খুশির ঝিলিক বলে যায়। হাড়ির ভিতর থেকে আলতো করে মাছটাকে তুলে আনে তারপর ছেড়ে দেয় জলের ভিতর। মাছটা ছলাত করে জল ছিটিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

দুজনে আবারও চুপচাপ। চারটি চোখ বড়শির টোনগুলোর দিকে। কখন আবার টিপ দিবে। জলের উপর পড়ছে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। সাথে হালকা মেঘের গর্জন।

দুরের একটা টোনে টিপ দেয় । ছিপের গোড়া মনি কাকার হাতের কাছে। বিস্ময় অস্ফুট স্বরে ডাকে "মনি কাকা"।
- হ্যাঁ দেখেছি! মনি কাকা উত্তর দেয়।

বিস্ময় বুঝে ফেলেছে কখন ছিপ ধরে টান দিতে হবে। মনি কাকাও ছিপ ধরে আছে। টোনের মাথা জলের তলে ডুবতেই বিস্ময়ের অস্ফুট চিৎকার! টান!

মনিকাকাও ছিপ ধরে দেয় হ্যাচকা টান। মাছে আটকে যায় বড়শিতে। মনি কাকা সাবধানে মাছটিকে তুলে নিয়ে আসে জলের উপরে। তারপর বরশি থেকে খুলে রেখে দেয় হাড়িতে ।

বিস্ময়ের চোখ বড়শির টোনের দিকে। শুনসান নীরবতা। শুধু হাড়ির ভিতরে খলাত খলাত শব্দ। বিস্ময় অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞাসা করে

- মনিকাকা, এটা কি মাছ?
-টাকি
-কত বড় হয়!
- এর চেয়ে খুব বেশী বড় হয় না। দেখনা পেটের দিকে হলুদ হয়ে গেছে।
- তাহলে তো ওর ছোট চোট বাচ্চা থাকার কথা।।
- থাকতেই পারে
- আচ্ছা যদি ওকে আমরা ধরে নিয়ে যায় , তাহলে ওর বাচ্চারা মায়ের জন্য কাঁদবে! তাই না।?
- মনিকাকা বিস্ময়ের চোখে বিস্ময়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।

বিস্ময় মনি কাকার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে "মাছটা ছেড়ে দেই। ও বাচ্চাদের কাছে ফিরে যাক ।

মনি কাকা বিস্ময়কে বুকে টেনে নেয়, কপালে একটা চুমু খেয়ে বলে, দাও ছেড়ে দাও।

বিস্ময় হাড়িটা উপুর করে। গড় গড় করে জল গড়িয়ে পরে। জলের সাথে বেরিয়ে আসে মাছটা। তারপর লাফাতে লাফাতে নেমে যায় জলে। বিস্ময় অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে মাছটার ছাড়া পাবার আনন্দ।

মনি কাকা আর বিস্ময় সবগুলো বড়শি গুটিয়ে ফেলে। রওনা দেয় বাড়ির দিকে! তখনও ইলেশেগুড়ি বৃষ্টি নামছে। দুরে জেগে তখন উঠেছে জোড়া রংধনু। সূর্য ডোবার তখনও অনেক দেরি ছিল।