ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রচ্ছদ » শিল্প-সাহিত্য » বিস্তারিত

কাজী নজরুল ইসলাম’র তিনটি কবিতা

২০২০ জুন ২২ ১৭:৪৬:২৬
কাজী নজরুল ইসলাম’র তিনটি কবিতা







শুধুই কি তুচ্ছ অনুজীব ?

বহুকালের চেনা সব পথঘাট
অচেনা হয়ে যাচ্ছে
চিরচেনা শহরটাও কেমন জানি
অপরিচিত মনে হচ্ছে।

প্রিয় সব মানুষ গুলোর চেহারাও
ঝাপসা হয়ে আসছে
অনেক দিন দেখা নেই অনেকেরই সাথে
মানুষের মত করে ইচ্ছেরাও সমানে মরে যাচ্ছে।

কেমন যেন এক নিরাশা শুধু পাখা ঝাপটায়
বুকের গহীনে,
দুমরে মুচরে ব্যবচ্ছেদ করে দিচ্ছে সব
বদলে যাচ্ছে মানবরীতি, বদলাচ্ছে প্রকৃতির গতি।
অদেখা না ছোঁয়া অতিক্ষুদ্র
এক অনুজীবই কি একা পারে এতটি?

কী এক কঠিন লুকোচুরিইনা চলছে জগৎময়
যা জানলাম প্রভাতে, বদলে গেল তা সন্ধ্যে-রাতে
কী অসহায় বিজ্ঞান, কতটা নতজানু প্রযুক্তি
কোন ক্ষমতাই নেই ক্ষুদ্রানু প্রতিরোধে
দিনে দিনে প্রবল ধাক্কা লাগছে জ্ঞানে-বোধে।

কারো বিরুদ্ধে কারুরই কোন হুমকি নেই,
সীমান্তে প্রহরা নেই, ঝাঁকে ঝাঁকে সাঁজোয়া যান নেই
কোথাও কোন পরমানু বোমার বিস্ফোরণ নেই।
রকেট ড্রোন ক্ষেপনাস্ত্র কামান নৌবিহারের তাড়না নেই
বিশ্ব মোড়লদের মধ্যস্থতার আয়োজনও নেই।

রাত জাগা নাবিকের জাহাজ থেকে
ভেসে আসা সাইরেনের শব্দ নেই,
মারনাস্ত্রের ট্রিগারে আঙ্গুল রাখা যোদ্ধার সতর্কতা নেই,
সাড়িসাড়ি বাঙ্কার নেই
দলে দলে শরনার্থীর আশ্রয় শিবিরও নেই।

তবুও চলছে যুদ্ধ, দুনিয়াজুড়ে এক মহাযুদ্ধ
মরছে মানুষ লাখে লাখ,
এক পরাশক্তি অপরের সাথে লিপ্ত নেই এ যুদ্ধে
তবুও নির্ঘুম আজ গোটা পৃথিবী-সভ্যতা
শুধুই কি তুচ্ছ অনুজীবের ক্ষমতার এত প্রবলতা?

অনুবিক্ষন যন্ত্রে দেখা এক ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কীট
কাঁপিয়ে তুলেছে সকল অস্তিত্বের ভীত।

এ কোন অনুজীবের একার কিছু নয়
মাথার উপরে আছে যে এক মহাশক্তি দিব্যি
ভাবনার শিকড়ে জল ঢেলে তব
বিশ্বাস করার সময় এখনি।

ডুবে যাই এলোমেলো ভাবনায়


স্বপ্ন পাহাড়ে এলিয়ে দেই ক্লান্ত জীবন
সম্বিৎ ফিরলে পরে দেখি বিচিত্র ভূবন!
গ্রহন লেগেছে চাঁদে, গ্রাস চলছে সূর্য্যতে
আমি বিশ্বাস হারিয়েছি অশ্ব-নভো-বায়ুমন্ডল
সব কিছুতে।

আমার ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যায়
এক অস্পৃশ্য জীবন সংহারীর থাবায়,
ভীত বিহ্বল সভ্যতা, বিপন্ন মমতা-মানবতা
চারদিক ছেঁয়ে আছে এক অন্ধকার শুন্যতায়।

কত জিজ্ঞাসাইনা জাগে মনে --
আর কি আসবেনা ফিরে সাত রঙা রংধনু
আর কি দেখা হবেনা শীতের শিশির ভেঁজা
সোনাঝড়া রোদেলা সকাল
আর কি ডাকবেনা ডাহুক দূর বাগানের ঝোঁপে
আর কি ঘুম ভাঙ্গবেনা শালিক ঘুঘু কোকিল
হরিকল হলদে পাখির কিচিরমিচির কলরবে?

আর কি শুনতে পাবনা
বহতা কীর্তিনাশার নিরবধি কল কল
ছলাৎ ছলাৎ সুমধুর ধ্বনি
আর কি ভাসবেনা বাতাসে রাখালের বাঁশির
হৃদয় হরা মায়াবি সুর
আর কি বাঁজবেনা কোন পল্লী বালার রিনিঝিনি
কিনকিনে কাঁচের চুড়ি
আর কি বসবেনা বৈশাখের স্মৃতিময় রঙিন মেলা
গাঁয়ের ওই বটতলাতে
আর কি টানবেনা মাঝি পাল তোলা নায়ে
মাস্তুলে বাধা সুঁতোয় ধরা দাড়
আর কি আসবেনা বসন্ত মর্মর পাতা ঝরা
¯িœগ্ধ কোমল সমিরণে
আর কি তুলবেনা সুর বাউলের এক তারায়
আর কি মাতবেনা পল্লীবাসি নবান্নের ধান কাটায়
আর কি উকি দিবেনা প্রত্যাশার নবীন সুর্য পূবাকাশে
আর কি উঠবেনা রূপালী চাঁদ শরতের
কোন জ্যোৎ¯œা ভেঁজা রাতে?

তবে কি বেড়েই চলবে অনিশ্চয়তার হাহুতাশ
তবে কি সইতেই হবে শুধু জ্বালাধরা তপ্তশ্বাস
তবে বি দেখতেই হবে কাল বোশেখীর
পূঞ্জিভূত ঘনকালো মেঘ
তবে কি মেনে নিতেই হবে আষাঢ়ে পদ্মার
সর্বস্ব বিদীর্ণ রাক্ষুসে ঢেউ?

আমি হারিয়ে যেতে চাইনা কল্পনার মোহমায়ায়
আমি ডুবে যেতে চাইনা আর এলোমেলো ভাবনায়।
হাতধরো, টেনেতুলো, এসো বন্ধু সব হতাশা ভুলি
জীবন সংহারী ওই অদেখা শত্রুকে নিরন্তর মোকাবেলা করি।

এসো এগিয়ে চলি উদ্ভাসিত আলোর মিছিলে
এসো অঙ্গিকার করি, আগামীর তরে নতুন এক পৃথিবী গড়ি।
এসো সোনালী সম্ভারে নিজেকে সাজাই অনিন্দ্য করি
এসো স্নিগ্ধ শুবাসিত স্বপ্নের শ্যামলীমা আপন ভূবনে চলি।
এসো বীরের মতই বাঁচতে শিখি, ঘরে থেকে সব নিয়ম মানি
এসো স্পন্দিত হৃদয়ে আপনারেই আপন করি দুর্ভাবনারে ছাড়ি।

সে চলে যেতে আসেনি

সে বার বার ঘুরে ফিরে আসে
ভিন্ন নামে ভিন্ন ভিন্ন বেশে
পল্লী থেকে শহরে দেশ থেকে মহাদেশে।
একদা সে ফিরে যায় নিজের বীরত্বগাথা নিয়ে
সবল পৃথিবীটাকে নেতিয়ে দিয়ে
সুশোভামন্ডিত সভ্যতাকে কাঁদিয়ে।

সে আবার এসেছে ভয়ংকর নাগিনীর রূপে
রাক্ষসী ফণা তুলে বিষাক্ত ছোবলে ছোবলে।

দেখে-শুনে-বুঝে মনে হচ্ছে
এবার সে চলে যেতে আসেনি।
তাকে নিয়ে হিসেব কষে লাভ নেই কোন
ওকে জড়িয়ে গবেষনা যতই করি
সমাধান খুঁজে পাবার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

আমি হলফ করে বলছি
পরমেশ্বর পরাক্রমের দিব্যি খেয়ে বলছি,
ওকে ফেরানো খুব সহজ হবেনা মোটেও।

বহুকাল পরে, বহু গ্রহ ঘুরে
সে এসেছে আবার না চাওয়া এক
কুটুম হয়ে মানুষেরই দ্বারে।

ওর কাঁধে কোন ঝোলাটোলা কিচ্ছু নেই
ওর হাত নেই, পা নেই
সে অশরীরি অদম্য এক অতিথি।

ওর পছন্দের নির্দিষ্ট কোনম্যানু নেই
ও সব খাবে -
তোমাকে খাবে আমাকে খাবে
টিকেট বিহীন শহর গ্রাম লোকালয়ে যাবে।

সে বাস খাবে ট্রাম খাবে
লঞ্চ ট্রেন ফুটপাথ খাবে
অলি-গলি রাজপথ খাবে।
মসজিদ মন্দির গীর্জা প্যাগোডা
যা আছে তার সব খানেই যাবে।
মার্কেট মল স্টেশনে যাবে
বিদ্যা নিকেতন হাসপাতালও খাবে।

কল কারখানা শিল্প খাবে
ব্যাংক বীমা এনজিও খাবে
টাকা রুপিয়া ডলার খাবে
ইউরো দিনার রিংগিতও খাবে।

আদালত সেরেস্তা খাসকামরা খাবে
কৃষি ভূমি মাছের ঘের, পশুর খামার খাবে
মানুষের যকৃৎ হৃদপিন্ড ফুসফুস খাবে।
দেশ থেকে মহাদেশে যাবে
তাবদ দুনিয়া চিবিয়ে খাবে।

সে এক দীঘল তালিকা নিয়ে এসেছে
উচ্চ আদালতের পরোয়ানা নিয়ে চলছে
বডি ওয়ারেন্ট হাতে নিয়েই মাঠে নেমেছে।

বৃদ্ধ যুবা বুদ্ধিজীবী কাউকেই সে চিনছেনা।
নেতা ধরছে কর্মী ধরছে
এমপি মন্ত্রী আমলা মারছে
সব বাহিনীর লোকই ধরছে।
উকিল মোহরার হাকিম ধরছে
ক্ষেত মজুর আর কামার চাইছে।

বাস ট্রাকের শ্রমিক ধরছে
নারী ধরছে পুরুষ ধরছে।
মেম্বার চেয়ারম্যান সচিব ধরছে
ঈমাম ক্বারী পুরোহিতও খুঁজছে।

সে কামান গোলায় ভয় করেনা
জাদু টোনা ঝার ফুঁকে তার মান ভাঙেনা
ঔষধ ভ্যাকসিন টিকা কিটের ধার ধারেনা।

সে সম্মুখ সাড়ির যোদ্ধা ধরছে
ডাক্তার নার্স বিশেষজ্ঞ মারছে।
শিক্ষক মারছে ছাত্র মারছে
সম্ভাবনাময় মেধা কাড়ছে।

মহাশক্তির পয়গাম হাতে
তীব্র ক্ষুধায় জ্বলে পুড়ে
ত্রস্ত কঠিন ক্ষ্যাপা যমদূত হয়ে
সে নিজের মতই এগিয়ে চলেছে।

ধেয়ে চলা সুন্দর এই পৃথিবীটা
ডলে পিষে লন্ডভন্ড স্তব্ধ করে
সভ্যতা-সম্ভাবনা-সমৃদ্ধিহীন তিমির এক
আদিম গহ্বরে ফেলে
অতঃপর সে ক্ষান্ত হলে হতেও পারে।

তবে, দেখে শুনে বুঝে মনে হচ্ছে
সে একেবারে চলে যেতে আসেনি।


কাজী নজরুল ইসলাম
গণমাধ্যম কর্মী
আঙ্গারিয়া, শরীয়তপুর