ঢাকা, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

‘বেঁচে আছি দোস্ত’ ‘জিন্দা হু ইয়ার’   

২০২৩ সেপ্টেম্বর ০৪ ১৭:২০:৫৫
‘বেঁচে আছি দোস্ত’ ‘জিন্দা হু ইয়ার’   

শিতাংশু গুহ


‘জিন্দা হু ইয়ার’- যার বাংলা ‘বেঁচে আছি দোস্ত’। ‘রিলেটেবল’ (প্রকাশক: কলকাতা প্রেসবুকস) বই-র শেষ অঙ্কে লেখক পৃথ্বা গুহ চ্যাটার্জী গানের এ উক্তি স্মরণ করেছেন। বইটি পড়লাম, পড়ে প্রথমেই মনে হলো: বেঁচে তো সবাই থাকে, হাতিও বাঁচে, চামচিকাও বাঁচে! বাঁচতে হয় হাতির মত। শেষ পর্যায়ে লেখক আরো বলেছেন, উজাড় করে ভালবাসি, উচ্চস্বরে কাঁদি, সাহসী, সুন্দর, বিনয়ী, শক্ত এবং বাস্তববাদী হই। সবই সত্য, যাহা সত্য তাহাই সুন্দর। লেখক যা বলেননি তা হচ্ছে, আসুন, আমরা একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে সংগ্রামী হই, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এই বঙ্গে (পশ্চিমবঙ্গ) ভালভাবে বেঁচেবর্তে থাকতে পারে।

দোষ লেখকের বাবার, কারণ তিনি কন্যাকে পূর্ববঙ্গ থেকে পালিয়ে আসার গল্প শোনাননি। জীবন সংগ্রামে তিনি পরাজিত সৈনিকের মত মৃত্যুবরণ করেছেন। কন্যা বলেছেন, ‘বাবা স্কুলের গ্রেডে একশ’তে একশ’ পেলেও, জীবনের গ্রেড ছিলো ‘শূন্য’। লেখক সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ‘সংসার’-এ বৈষম্য দেখেছেন, কিন্তু এরচেয়েও বড় যে ‘রাজনৈতিক’ কারণ, তাঁর পিতার দেশত্যাগ, তা দেখেননি। লেখকের বাবা, একজন উদ্বাস্তু, জীবনে এরচেয়ে বেশি আর কি করতে পারতেন? বইয়ে লেখকের বাবার জীবন সংগ্রামের কাহিনী আছে, পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আসার কথা নেই?

নচিকেতার একটি ছবি আমার স্মৃতি’র দৃশ্যপটে জাজ্বল্যমান, তিনি তার বাবার ফেলে আসা বাড়ীর উঠানে পা-ছেড়ে, গা-এলিয়ে, কিঞ্চিৎ মাথায় হাত দিয়ে, বিষণ্ণ-বিহ্বলভাবে বসে আছেন। বঙ্গে এ রকম হাজারো গল্প আছে। বইটি লেখকের জীবন সংগ্রামের কাহিনী, যা আর দশটা রিফিউজি পরিবারের চেয়ে ভিন্নতর কিছু নয়। শেষ অধ্যায়ে লেখক নিজেই বলেছেন, ‘পালিয়ে বেড়ানো কোন সমাধান নয়’। এও বলেছেন, ‘মানুষ বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে বের করে’। কেউ পালিয়ে বাঁচে, কেউ সংগ্রাম করে বাঁচে। ডাক্তারের মুখ দিয়ে একথাটা বলানো ভালো হয়েছে যে, ‘রানিং ইজ গুড ফর হেল্থ’, কিন্তু ‘রান এওয়ে’ ভাল নয়!

লেখক তাঁর একমাত্র সন্তানকে সুশিক্ষিত, অর্থনৈতিক স্বনির্ভর করার সঙ্কল্প ব্যক্ত করেছেন, যাতে তাকে ‘মেয়েবেলায়’ মায়ের মত অবহেলিত হতে না হয়। চমৎকার কথা। লেখক তাঁর বাবা’র মৃত্য’র পর কঠিন ঘটনাবলী বর্ণনা করেছেন, ছোট্ট একটি মেয়ের ‘বাবা নেই’ এ বর্ণনা চমৎকার। বাবা-হারা সন্তানের দু:খকষ্ট তো সার্বজনীন, লেখকের জন্যে এটি ব্যতিক্রমী যখন তিনি বলেন, বাবার মৃত্যু’র পর জেনেছি, ‘টাকাই সব’; আবার মায়ের মৃত্য’র পর বুঝেছি, ‘টাকা সবকিছু রক্ষা করতে পারেনা’। বাবার মৃত্যু’র পর বাবার দিকের আত্মীয়ের আচরণ সুখকর ছিলোনা? করোনাকালে মায়ের মৃত্যু’র পর শেষকৃত্যে মায়ের দিকের কেউ না-আসাটা দু:খজনক হলেও অস্বাভাবিক নয়!

লেখক কোথাও কোথাও আবেগঘন হয়েছেন। যেমন বন্ধুকে বর্ণনা দিতে গিয়ে, ‘লাইফ লং ইডিয়ট ফ্রেন্ড’ বলা চাট্টিখানি কথা নয়, এবং প্রকৃত বন্ধুকেই তা বলা যায়। ক্ষ্যাপা-খ্যাঁপু’ শব্দটি ইংরেজীতে এসেছে। লেখক নিজেকে ‘পলায়নপর’ বলতে রাজি নন, বাবার বাড়ী ছাড়ার দু:খজনক ঘটনা বারবার এসেছে। কারণ, ওটা ছিলো ‘টার্নিং পয়েন্ট’। পিসি’র লেখকের মা-কে নির্যাতনের কাহিনী এসেছে, বলা হয়েছে এটি নিত্যদিনের ঘটনা। লেখক বলেছেন, ‘আমি নিজেকে ভালবাসি, কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক নই’। কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে কাকু’র ফ্ল্যাটে নয় বছর থাকার কথা এসেছে। পুরানো বাড়ীর প্রসঙ্গ এসেছে যেখানে দাদু-দিদা থাকতেন, যেখান থেকে ওঁরা মা-মেয়ে বিতাড়িত হয়েছিলো।

‘রিলেটেবল’ বই পড়ে জানলাম, লেখক ফুচকা বা গোলগাপ্পা খেয়ে জীবনের নুতন অধ্যায় শুরু করেছেন। এতে ফুচকার মর্যাদা বেড়েছে, কারণ লেখক ফুচকার সাথে জীবনের তুলনা করেছেন। লেখকের জীবনে মায়ের প্রভাব বোঝা যায়, যখন উপলব্ধি থেকে লেখক বলেন, ‘মা কখনো মরেনা’। বইটি অনেকটা জীবনী’র মত? জীবনীতে সমসাময়িক ঘটনাবলী আসে, ব্যক্তি আসেন, এ বইয়ে এসেছে, এসেছে ঠাম্মার কথা, দাদু-দিদা, ছোটকাকু, জেঠাদের কথা, বিলাসপুরের মামা, বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক, সবার কথা এসেছে। লেখক সবার নাম লিখলেও বাবা-মা, কাকা, জেঠা, দাদু-দিদা, বা এমনকি স্বামীপুত্রের নাম হয়তো ইচ্ছে করেই দেননি। ঠাম্মার সাথে ভাব স্পষ্ট। ছোটকাকু যে সর্বদা পাশে ছিলো তা স্পষ্ট, পিসি যে তাঁর মা-কে জ্বালাতো তা এসেছে। লেখক বাস্তবিক অর্থেই লিখেছেন, পালিয়ে যাওয়া নয়, বাস্তবতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়া, মানিয়ে নিতে হয়। শ্বাশুড়ী বৌয়ের ‘গায়ের রং’-এর জন্যে মেনে না নেয়ার কথাও আছে।

লেখক বলেছেন, ‘আমি কাউকে ‘ঘৃণা’ করিনা’, ভাল কথা। বইয়ে লেখক নিজেকে জানতে চেষ্টা করেছেন। নিজেকে ফিরে পেতে ছেলের ভেতর মা-কে দেখা মন্দ নয়। ঐ যে, মানুষ একটা উপায় খুঁজে নেয়? সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে সংগ্রাম করা, সেটা নিজের এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে।.পরবর্তী প্রজন্মের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকটি’র সাথে রাজনৈতিক দিকটি লক্ষ্য রাখতে হয় বটে! জীবনের এদিকটি কঠিন বাস্তবতা। সারভাইবেল অফ দি ফিটেষ্ট। অর্থনৈতিক সংগ্রামের সাথে জীবন সংগ্রাম জড়িত, জীবন বাঁচলে তো অর্থনীতি। আর্থিক সাফল্য, ভাল চাকুরী কি জীবনে সব? লেখক সঠিকভাবে প্রশ্ন করেছেন, এ ফেইক ওয়ার্ল্ডে কে নির্ধারণ করছে সাফল্য বা ব্যর্থতা? যেই করুক, এই ‘ফেইক’ বিশ্বেই তো মানুষের বসবাস। এবং এই বিশ্বে সবকিছু রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, পুত্রের ভবিষ্যতের সাথেও রাজনীতি জড়িত। রাজনীতিটাও বুঝতে হবে বৈকি।

‘রিলেটেবল’ লেখকের প্রথম বই। নুতন লেখক হিসাবে এতে ‘আহামরি’ বাহাদুরী থাকবে তা আশা করিনি। এটি পূর্ববাংলা থেকে বিতাড়িত পশ্চিমবাংলার একটি উদ্বাস্তু পরিবারের সংগ্রামী কাহিনী, যদিও লেখক রাজনৈতিক দিকটি স্পর্শ করেননি, বা তিনি তা জানেন না। লেখক নুতন প্রজন্মের, প্রতিটি উদ্ধাস্তু পরিবারের মত লেখকের পিতামাতা ওকে জানায়নি, কেন তাঁকে দেশান্তরী হতে হয়েছিলো! শুধু লেখক পৃথ্বা গুহ চ্যাটার্জী নন, কলকাতার বাঘাবাঘা লেখকরা পর্যন্ত একথা বলেন না? এর কারণ শুধু দেশভাগ নয়, আরো কিছু আছে? সেই অব্যক্ত সত্য নুতন প্রজন্ম জানুক, লেখক আরো লিখুন, সেই আশা থাকলো।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।