ঢাকা, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

শুভ জন্মাষ্টমী ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ

২০২৩ সেপ্টেম্বর ০৫ ১৮:৪৯:৫১
শুভ জন্মাষ্টমী ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ

মানিক লাল ঘোষ


জন্মাষ্টমী হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। দুষ্টের দমন ও সৃস্টের রক্ষায় অত্যাচারী রাজা কংসকে দমন করতে মহাবতার শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হয়েছিলেন। সমাজ থেকে অন্যায়-অত্যাচার, নিপীড়ন ও হানাহানি দূর করে মানুষে মানুষে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলাই ছিল শ্রীকৃষ্ণের মূলদর্শন। যেখানেই অন্যায়-অবিচার ধরাধামকে গ্রাস করেছে, সেখানেই শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হয়েছেন আপন মহিমায়।

সনাতন ধর্মমতে, অধর্ম ও দুর্জনের বিনাশ এবং ধর্মও সুজনের রক্ষায় তিনি যুগে যুগে পৃথিবীতে আগমন করেন। অপশক্তির হাত থেকে শুভশক্তিকে রক্ষার জন্য শ্রীকৃষ্ণ মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসকে হত্যা করে মথুরায় শান্তি স্থাপন করেন। কৃষ্ণের প্রেমিক রূপের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর বৃন্দাবন লীলায়, যা বৈষ্ণব সাহিত্যের মূল প্রেরণা।

জন্মাষ্টমী পরমাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেই শুভ আবির্ভাব তিথি। বিশ্বব্যাপি সনাতন ধর্ম বিশ্বাসীদের কাছে এই তিথির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।

প্রভুত্ববাদ আর অন্যের ওপর খবরদারি করার অপচেষ্টায় দিন দিন কলুষিত হচ্ছে মানব সমাজ। বিরূপ পরিবেশে কলুষিত হচ্ছে মন, বিকৃত হচ্ছে মানসিকতা। জগতের কলুষিত বন্ধন যখন জীবসত্ত্বাকে বিপথগামী করে তখন পৃথিবী ছেয়ে যায় অনাচার আর পাপকর্মে। ন্যায় আর সত্য তখন ঢাকা পড়ে যায় পাপের ছায়ায়। সাধু-সন্ন্যাসীদের ঐশ্বরিক শক্তিও তখন হার মেনে যায় অপশক্তির কূটচালে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন সময় এসেছে অনেকবার। আর যুগে যুগে এমন প্রতিকূল সময়ে মানবসভ্যতা রক্ষায় স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত শক্তি বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে পৃথিবীতে। ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধ্বংস করেছে অপশক্তিকে। প্রচার করেছে শান্তি, সাম্য ও সুন্দরের জয়গান।

ন্যায়ের পক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে মানুষকে শিক্ষা দেয়ার জন্য কর্ম করেছেন অনেক। দিয়ে গেছেন ভবিষ্যতের সত্য, সুন্দর ও আলোর পথে চলার নির্দেশনা।

সনাতন ধর্মে এ আবির্ভাব প্রক্রিয়া নিয়ে রয়েছে নানান মত। শাস্ত্রমতে যুগে যুগে পথভ্রষ্ট ও বিপদগামী মানুষকে সত্য ও আলোর পথে ফিরিয়ে আনার, অপশক্তিকে ধ্বংস এবং সজ্জনকে রক্ষা করে সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভগবান বিভিন্ন রূপে এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই আবির্ভাবের জন্যই তিনি মহাবতার বলে পরিচিত হন। সনাতন ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত চারটি যুগের মধ্যে সত্য ও ত্রেতা যুগের মতো দ্বাপর যুগেও ভগবান পৃথিবীতে অবতরণ করেন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ লোকশিক্ষার জন্য অর্জুনের মাধ্যমে মূলত মানবসমাজকে শিক্ষা দিয়েছেন। জীব হিসেবে আমরা অণুচেতনার অধিকারী হলেও কলুষিত পরিবেশে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছি। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, ভোগ বিলাস, জাগতিক মোহ, যশ আর খ্যাতি ও অর্থবিত্তের লোভে মায়াচ্ছন্ন হয়ে আমরা ভুলে যাই সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে আমাদের করণীয় বিষয়গুলো।

অন্যায়, অসত্য ও পাপের দ্বারা পরিচালিত ও প্ররোচিত হয়ে জ্ঞান শূন্যতার অহমিকায় ভুগছি আমরা। আত্নঅহংকারে ভুলে যাচ্ছি মহান সৃষ্টিকর্তাকে। পার্থিব সুখে ভুলে যাই মহা অবতার ভগবানের সঙ্গে আমাদের চিন্ময় সম্পর্ককে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের মাধ্যমে পবিত্র শ্রীমদভগবত গীতায় যে জ্ঞান দান করেছেন তাও যদি আমরা গ্রহণ করতে সক্ষম হতাম এবং যথাযথভাবে পালন করতাম তবে কোনো প্রকার অন্যায় ও অসত্য আমাদের ঈশ্বর চেতনাকে স্পর্শ করতে পারতো না।

মহাবতার পরম চেতনার অধিকারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনি:সৃত গীতার জ্ঞান যুগ যুগ ধরে মানবজীবনের পথ চলায় আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এই জ্ঞানের আলোকিত জগতে নেই কোনো শঠতা, অন্যায় আর অসত্যের স্থান। ঠাঁই নেই কোনো অপশক্তির। বরং প্রতিনিয়ত সব রকমের ভীরুতা দূর করে অন্যায়কে প্রতিহত করার শিক্ষা পবিত্র গীতা আমাদেরকে দান করেছে।

পাপাচারে আচ্ছন্ন পরিবেশের বহি:শক্তি ও অন্ত:শত্রুর হাত থেকে জীবসত্ত্বাকে রক্ষা করে ভগবানের আনন্দ বিধানের জন্য করণীয় সম্পর্কে জ্ঞান ও উপদেশ গীতার মাধ্যমেই আমরা পেতে পারি। এই বিশ্বাস সনাতন ধর্মাবলম্বীদের।

ধর্মীয় বিশ্বাসকে গুরুত্ব দিয়ে আবহমানকাল থেকেই সকল ধর্মের সহঅবস্থান এই বাংলাদেশে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই দেশএদেশে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে হিন্দু ধর্মীয় কল্যানট্রাস্টের মাধ্যমে মন্দির সংস্কারসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের কল্যানে নানামুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার।

আমাদের সংবিধানে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি- ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী গণমানুষের সংগঠন আওয়ামী লীগ সরকার দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ ও শিক্ষা বাঙালির হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সোহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। যদিও মাঝে মাঝে কিছু স্বার্থান্বেসী মহল ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হীন ষড়যন্ত্রে থমকে যায় চলার চলার গতি। তারপর আবারও আপ্রাণ চেষ্টা প্রিয় জন্মভূমিতে টিকে থাকার।

তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্ব একটি অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত-সমৃদ্ধদেশ গড়ে তুলি। প্রতিষ্ঠা করি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’।

গত কয়েক বছর ধরে প্রতিকূল অবস্থায় জন্মাষ্টমী উদযাপিত হচ্ছে। নানা বৈশ্বিক সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো বিশ্ববাসী। এই সংকট মোকাবিলায় মহান স্রষ্টাই শেষ ভরসা। বিশ্বের বিপদগামী মানুষকে আলোর পথে, সততার পথে ফিরিয়ে আনা ও বিশ্বব্যাপি বিরাজমান অশান্তি নিরসনে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হোক এই পৃথিবী। আলোকিত হোক মানবসমাজ।

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, করোনা সংকট ডেঙ্গুর প্রকপ বৃদ্ধি, বন্যাসহ সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাক মানবকূল - ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মতিথিতে এমন প্রত্যাশা সকলের।

লেখক : সহ সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি।