ঢাকা, শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

ঢাকায় এত ডেঙ্গু, কোলকাতায় নেই কেন?

২০২৩ সেপ্টেম্বর ১৭ ১৫:০৫:৫২
ঢাকায় এত ডেঙ্গু, কোলকাতায় নেই কেন?

মীর আব্দুল আলীম


ঢাকায় এতো মশা আর ডেঙ্গু; পাশের কোলকাতায় নাই কেন? গত সপ্তাহে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে ৪দিন থেকেছি, চারটে মশাও দেখেনি কোথাও। ঢাকায় এতো মশা কোথ্থেকে এলো? সমদুরত্বের কক্সবাজার চট্রগ্রামে ডেঙ্গু আর মশায় পূর্ণ কোলকাতা নেই? সঙ্গত কারনেই আমাদের মশা নিধনে ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। কেন মশা নিধন হয় না? এ জবাবা কিন্তু ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের অপরাপর সিটি কর্পোরেশন দিতে ব্যর্থ হবেন। সোজাই বলে ফেলি- এ দেশীয় সিটি কর্পোরেশনগুলোর মেয়র এবং কর্তাবাবুরা কুম্ভকর্ণের ঘুমে আছেন! মশার কামড়ে এতো মানুষ মরছে, সরকার কেন ওদের ঘুম থেকে জাগায় না? যখন লিখছি এ মৌসুমে সেদিন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সরকারি হিসাবে মৃত্যু ৮শ’ ৪ জন। বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক। হয়তো মানুষের ৮ হাজার লাশ হলেই মশা তাড়াতেন তাঁরা?পত্রিকার রিপোর্ট অনুসারে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ৬৯ শতাংশই নাকি ঢাকায়। বাকি ৩১ শতাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঢাকার বাইরে। মৃত্যুর তথ্যেই ঢাকার অবস্থা কতটা ভয়াবহ তা অনুমেয়।

গোড়ায় গলদের কথা বলি- গিঞ্জি শহর কোলকাতায় মশা কম আর ঢাকায় তথা বাংলাদেশে এত বেশি এর অন্যতম কারন হলো- মশা নিধন ঔষধে ভেজাল; আর কেনায় লোপাট। এদিকে মানুষ মরছে আর এর অর্থ পকেটস্থ হয় কর্তাবাবুদের। ভেজাল দিয়ে বাবুরা কোন মতে লোক দেখানো কাজ সারেন বলে মশারাও এতো দাপুটে এদেশে। ঢাকা শহরেই বাস করি। আগে আমাদের এলাকায় মাঝে মধ্যেই কামান দাগানোর শব্দ পেতাম। মশার কামড়ে মানুষ মরছে আর কামান দাগানোর শব্দও এখন পাই না তেমন। মানুষ মরে মরুক; আমাদের কর্পোরেশন গুলোর এতটুকুও ব্যথা নেই তাতে।

পত্রিকায় সংবাদ দেখি; মানুষ মরছে দেখছি। সিটি কর্পোরেশনের কর্তাবাবুদের মাঠে দেখছিনা তেমন। আমাদের সিটি কর্পোরেশন গুলোর মাথা নেই; তাই বেথাও নেই। বলতেই হয় মশককুল রাজধানীতে যেন রামরাজত্ব কায়েম করেছে। এ মশকবাহিনী দুই সিটি করর্পোরেশনের সুনামে হুল ফুটাচ্ছে! যখন লিখছি তখনো মশার দল হুল ফুটাচ্ছে পায়ে, মুখে, গালে। এডিস মশা ডেঙ্গুর বাহক। সৌখিন ফুলের টবে, এসির জমে থাকা পানিতে, এমনকি যেকোনো পাত্রে যদি কয়েকদিনের পানি থাকে সেখানেও চলে এডিস মশার জন্মোৎসব। এ মশার কামড়ে এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনের প্রাণ গেছে। তাই হাইকোর্টকেও তো মাথা ঘামাতে হচ্ছে। এ বছর রাজধানীতে অন্যান্য বছরের তুলনায় মশার উৎপাত বেশিই। অনেকে মনে করেন, সিটি করপোরেশন সচেষ্ট হলে মশার প্রকোপ কমে আসবে ক্রমশ।

প্রশ্ন হলো, মশা নির্মূলে কি করছে দুই সিটি করপোরেশন? ডিসিসি উত্তর ও দক্ষিণে মশা নিধনের জন্য ১ হাজারের ওপর মশকনিধন শ্রমিক কর্মরত আছে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পাঁচ/ছয় জন কর্মী আছে বলে পত্রিকায় জেনেছি, যাদের কাজ শুধু মশার ওষুধ ছিটানো। প্রতি বছর মশা নির্মূলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পায় দুই সিটি করপোরেশন। এত কিছুর পরও রাজধানীতে দিন দিন মশার প্রকোপ বাড়ছে কেন? এই বিপুল জনবল আর বড়ো অঙ্কের অর্থের সঠিক ব্যবহার হলে তো নগরীতে এভাবে মশা থাকার কথা নয়। সমস্যা আছে অনেক। জেনেছি, লোকবল আছে, ওষুধ আছে, তবে সে ওষুধ ঠিকঠাকমতো ছিটায় কি না—তার মনিটরিংয়ে অবহেলা আছে। এত লোক সারা বছর কাজ করলে, এত অর্থ ব্যয় করলে তো নগরীতে মশা জন্মানোর কথা নয়। মূল কথা হলো যেখানে মশারা জন্ম নেয়, সেখানে ওষুধ পড়েই না।

মশা নিধনের জন্য অর্থ জনবলের পাশাপাশি মনিটরিং দরকার। এর পাশাপাশি নগরবাসীর উচিত নগর বসবাসযোগ্য পরিষ্কার-পরি”ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। লক্ষ্য করা গেছে, সুনির্দিষ্ট কিছু অভিজাত এলাকা ছাড়া কোথাও ক্রাশ প্রোগ্রামের বাস্তবায়ন কম, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
কারণ প্রায় দেড় কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত মহানগরীতে নাগরিকদের সব সুযোগ-সুবিধার প্রাপ্তি একই মানদণ্ডে বিচার্য হওয়া উচিত। আমাদের মনে রাখা উচিত বিশাল বিশাল অট্টালিকার বাইরেও এ মহানগরীতে প্রায় চল্লিশ লাখ লোক বস্তিতে বসবাস করে। সামর্থ্যহীন এ লোকগুলোর জীবন-জীবিকার দায়ভার বহন করাই যখন কষ্টসাধ্য, সেক্ষেত্রে মশার উপদ্রব থেকে নিজেকে রক্ষার বিকল্প তাদের
আর কীই বা থাকতে পারে।

ডিসিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লিকুইড ইনসেক্টিসাইড নামক কীটনাশক দিয়ে নগরীতে উড়ন্ত মশা নিধনের বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে তারা। কিন্তু আমরা এখনো তার আলামত দেখছি না। বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। আবদ্ধ ডোবানালা ও ড্রেনগুলোয় মশার বিস্তার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিসিসির আরো জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত। বলার
অপেক্ষা রাখে না, মশা নিধনের ক্ষেত্রে রয়েছে জবাবদিহিতারও অভাব। মশা দমন করতে হলে মশার প্রজনন ক্ষেত্রের দিকে সর্বাগ্রে দৃষ্টি দিতে হবে। গোটা শহর কার্যত ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় হয়ে আছে। রয়েছে মাইলের পর মাইল খোলা নর্দমা। দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৩ হাজার বিঘা ময়লা ফেলার জায়গা রয়েছে। এসব জায়গায় ফেলা ময়লা ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। ময়লা ফেলার স্থানগুলো মশা প্রজননের একেকটা ‘উৎকৃষ্ট’ ক্ষেত্র। খোলা নর্দমাগুলোও যথাসময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না।

মশার বংশ বিস্তারে নর্দমাগুলোর বড়ো রকমের ভূমিকা রয়েছে। শুধু তাই নয়, দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় তিন হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি জলাশয়ই ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পূর্ণ। এগুলোও মশার উৎস হিসেবে কাজ করছে। মশার প্রজনন স্থলসমূহ অবারিত ও উন্মুক্ত রেখে মশা দমন ও নিধনে সফল হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হতে পারে না। জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো. গোলাম ছারোয়ারের মতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মশা নিধনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ আমলে না নেওয়া এবং কীটনাশক প্রয়োগ সীমাবদ্ধতায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, উপর্যুপরি কীটনাশক প্রয়োগ না করায় মশা জন্মানোর জন্য নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। কীটনাশক প্রয়োগে নিয়োজিতদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে মশার আচরণগত পরিবর্তন, বায়োরাসায়নিক পরিবর্তন ও শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন বেশি হয়েছে। গতানুগতিক পদ্ধতিতে কীটনাশক প্রয়োগ প্রভাব ফেলতে পারছে না। এখন মশা নিধনে হলিস্টিক অ্যাপ্রোচের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। এজন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জাতীয় কাউন্সিল গঠন করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। গৃহীত পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে শক্তিশালী মনিটরিং সেল করতে হবে। উন্নত গবেষণাগার তৈরি ও গবেষক নিয়োগ দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে মশা নিধন সম্ভব। মশা কমলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু কমবে।

সার্বিক বিবেচনায় াামরা মনে করি- প্রজনন ও উৎসস্থলেই মশার বংশ ধ্বংস করতে হবে। আবর্জনা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। আবর্জনা ফেলার জায়গাগুলো সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ঐসব জায়গায় মশার জন্মাতে না পারে। মশা নিধনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গাইডলাইন ও রোগী ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গাইডলাইন শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। এ কাজে সরকারের সব দপ্তর ও প্রচুর স্বেচ্ছাসেবককে কাজে লাগাতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে ডেঙ্গু টেস্ট করতে হবে। কিন্তু শহরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় আক্রান্তরা শেষ সময়ে হাসপাতালে যাচ্ছে। ততক্ষণে রোগী শকে চলে যাচ্ছে। এজন্য ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিটা ওয়ার্ডে ডেঙ্গু শনাক্ত সুবিধা রাখা জরুরি। পাশাপাশি স্তরভিত্তিক রোগী ব্যবস্থাপনায় নজর দিতে হবে। খোলা নর্দমাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে এবং নিয়মিত ওষুধ দিতে হবে, যাতে সেখানে মশা জন্মাতে না পারে। একইভাবে জলাশয়গুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, নিয়মিত ওষুধ ছিটিয়ে মশার
লার্ভা মুক্ত করতে হবে। উেস মশা দমন ও নিধন না করে উড়ন্ত মশা দমন ও নিধন কার্যক্রম চালিয়ে ঢাকাকে মশামুক্ত করা যাবে না।

লেখক : মহাসচিব, কলামিস্ট ফোরাম অফ বাংলাদেশ, চেয়ারপার্সন (পরিবেশ), লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল।