ঢাকা, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রচ্ছদ » ফিচার » বিস্তারিত

ভুলে যাওয়া দেশপ্রেমিক বিজ্ঞানী ডঃ মেঘনাদ সাহা 

২০২৩ অক্টোবর ০৭ ১৬:৫১:১০
ভুলে যাওয়া দেশপ্রেমিক বিজ্ঞানী ডঃ মেঘনাদ সাহা 

ইন্দ্রজিৎ কুমার সাহা, কালিয়াকৈর : মেঘনাদ সাহা বিশ্ব খ্যাত এক পদার্থ বিজ্ঞানী জন্ম ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর ঝর বৃষ্টি ময় এক গভীর রাতে, গাজীপুর জেলাধীন কালিয়াকৈর থানার অর্ন্তগত সেওড়াতলী গ্রামে। পিতা জগন্নাথ সাহা মাতা ভূবশ্বেরী দেবী। মেঘনাদ সাহা গ্রামের পাঠশালার পাঠ চুকিয়ে শিমুলিয়া স্কুলে ভর্তি হন। ১৯০৫ সালে কলোজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় বাম্পফিল ফুলারের আগমনের প্রতিবাদে খালি পায়ে স্কুলে আসায় তাকে স্কুল থেকে বহিস্কার করা হয়। এমতাবস্থায় বৈশ্য সাহা সমাজের সহযোগিতায় কে.এল. জুবিলী স্কুলে বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ পান এবং এন্ট্রাস পরীক্ষায় ১ম শ্রেনীতে উত্তির্ণ হন। ১৯০৯ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে আই. এস. সি পরিক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯১১ সালে গনিতে অনার্স নিয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজ এবং ১৯১৫ সালে কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে এম.এস.সি তে প্রথম শ্রেনীতে দ্বিতীয় হন।

গবেষণা: মেঘনাদ সাহার প্রথম গবেষণা ছিল “অন মাস্কতারলস স্ট্রেসেস” ১৯১৭ সালে। ১৯১৮ সালে আলোর চাপ বিষয়ে সাহা তার ডি এস সি থিসিস তৈরী করেন পরের বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.এস.সি ডিগ্রী লাভ করেন, তবে সাহা যে গবেষনার জন্য বিশ্ব খ্যাতি লাভ করেন তা হল উচ্চ তাপমাত্রায় আনয়ন তত্ব ও নক্ষত্রের আবহ মন্ডলে তার প্রয়োগ তাপীয় আনয়ন তত্ব। THEORY OF THERMALIONIZATION.তাপ গতি বিদ্যার সঙ্গে তখনকার দিনে সবে আবি®কৃত কোয়ান্টাম তত্বের সংযোগ ঘটিয়ে অধ্যাপক সাহা ১৯২০ সালে এমন এক সূত্র আবিষ্কার করেন যা থেকে বিভিন্ন উষ্নতায় ও চাপে কোন পদার্থে আয়নের মাত্রা কত হবে তা সহজেই গননা করা যায়। এই সমীকরন “সাহা সমীকরন” নামে বিজ্ঞানী মহলে অধিক পরিচিত। তাপিয় আনয়ন তত্ব ও তার প্রয়োগের বিষয়ে অবদানের জন্য সাহাকেFello of the Royal scoity হিসাবে নির্বাচিত করে সন্মান জানানো হয়।

নানা ভূমিকায় মেঘনাদ সাহা: বিজ্ঞান চর্চা ও বিজ্ঞানের প্রসার ছারা তিনি ভারতে যে কয়টি পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়েছেন তার মধ্যে প্রধান হল জাতীয় গবেষনাগার প্রতিষ্ঠা ,নদী পরিকল্পনা,পন্জিকা সংস্কার, বিজ্ঞান একাডেমী প্রতিষ্ঠা, ভারতীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতা পূর্ব অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম রুপকার নিউক্লিয়ার এনার্জির প্রসার এবং শিক্ষাকমিশন ও ইউনির্ভাসিটি গ্রান্ট কমিশনের পরিকল্পপনার অংশিদার।

বিবাহ: ১৯১৮ সালে মুন্সিগন্জের রিকার বাজার নিবাসী শ্রীমতি রাধারানী রায় এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

তার প্রতিষ্ঠীত কিছু প্রতিষ্ঠান: ১৯৩১ সালে তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশে একাডেমী অব সায়েন্স প্রতিষ্ঠা করেন এছারা সাহা ইনস্টিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্র, ১৯৪০ সালে সেওড়াতলী গ্রামে তার মায়ের নামে একটি গালর্স স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত এই স্কুল টি ।১৯৩৪ সালে তিনি ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন।

রবীন্দ্রনাথ ও নেতাজীর সাথে সম্পর্ক: অধ্যাপক সাহা শুধু একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীই ছিলেননা তৎকালীন সময়ে তিনি ভারতের জাতীয় বিজ্ঞান ভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পথিকৃত।১৯৩৮ এর মাঝামাঝি সময়ে থেকেই কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর অধ্যাপক সাহার বিজ্ঞান মূখি ধ্যান ধারনার প্রতি অনূরূক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৩৮ এর ১৩ই নভেম্বর কবি গুরু অধ্যাপক সাহাকে শান্তি নিকেতনে আমন্ত্রন জানান ঐদিনই শান্তি নিকেতনের সিংহ সদনে আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় কবি নিজেই তাকে অভ্যর্থনা জানান।

নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর জীবনের অনেক বিষয় মেঘনাদের অজানা নয়। নেতাজীর মেজদা শরৎ চন্দ্র বসু সাহার সহপাঠী ছিলেন আর নেতাজী তিন বছরের অনুজ।তবে উত্তর বঙ্গে বন্যা দূর্গতদের সেবা করতে গিয়ে উভয়ের পূর্ব পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা বারে। ১৯৩৮ সালে সাহা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ আ্যাসোসিয়েসনের অধিবেশনের সভাপতি করার আহবান জানান।

বিজ্ঞানীদের চোখে মেঘনাদ: মেঘনাদ সাহা সমকালীন ভারতীয় বিজ্ঞানীদের কাছে অসংবাদিত নেতা ছিলেন। ১৯৩৫ সালে অধ্যাপক সাহার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সর্বপল¬ী রাধাকৃষ্ণান ,জীবরাজ মেহেতা জি.পি দুবে তার দীর্ঘ জীবন কামনা করেন। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ.এইচ কম্পটন সাহাকে তাপ গতি বিদ্যায় অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য অভিনন্দিত করেন। হাভার্ড কলেজে মান মন্দির হার্লো সেপলি বলেন যে, “হাভার্ড মানমন্দির অধ্যাপক সাহার নিকট বহুলাংশে রৃনি।”

রাজনীতিতে মেঘনাদ: ডঃ সাহা বুঝেছিলেন সরকার প্রতিশ্র“তি ভুলে যায় তাই তিনি ১৯৫২ সালে নির্দলীয় পার্থী হিসাবে ভারতীয় লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন।

মৃত্যু লোকসভায় তিনি ক্ষমতাসীন দলের সূক্ষ্ণ সমালোচনা করতে থাকেন এতে স্বার্থান্বেষি মহল তার প্রতি ক্ষুব্ধ হন এছারা প্রধানমন্ত্রি নেহেরু সাহাকে কলকাতায় ফেরত যেতে বলেন এতে তিনি প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হন তাছারা গবেষণা ও রাজনীতিতে সময় দেয়ার ফলে তার শরীর ভেঙ্গে পরে। এমতাবস্থায় পার্লামেন্ট ভবনে যাওয়ার পথে তিনি মাথা ঘুরে পরে যান। দিল্লীর উইলিংডন হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষনা করা হয়। সেদিন ছিল ১৯৫৬ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী সারাবিশ্বে শোক বানী ছরিয়ে পরল। ঐতিহাসিক যদুনাথ রায় এক শোক বার্তায় বলেছিলেন, হ্রদ ক্রিয়া অচল হয়ে নয় তিনি চলে গেছেন ভগ্ন হ্রদয়ে। দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে যে, বংশে এমন সন্তান জন্ম হোক যাতে কূল পবিত্র হয় ও জননী কৃতার্থী হন। মেঘনাদ সেই প্রত্যাশার বেশী পূরন করেছেন তিনি মুখ উজ্বল করেছেন দেশ মাতৃকার। অথচ আমরা এই মহান বিজ্ঞানীর স্মৃতি রক্ষার্থে কোন উদ্যোগই গ্রহন করিনি। এটা জাতী হিসাবে আমাদের দৈন্যতার আরেকটি উদাহরন।

(আইএস/এসপি/অক্টোবর ০৭, ২০২৩)