ঢাকা, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

রাজনীতি নেই রাজনীতিকদের হাতে

২০২৩ ডিসেম্বর ০২ ১৭:৪৪:৫৩
রাজনীতি নেই রাজনীতিকদের হাতে

চৌধুরী আবদুল হান্নান


এসে গেছে নির্বাচন, হোক না তা প্রশ্নবিদ্ধ! ক্ষমতায় তো কেউ বসবেই। ভারতের প্রয়াত মানবতাবাদী নেতা মানবেন্দ্র নাথ রায় (১৮৮৭–১৯৫৪ ) তাঁর লেখা “ হু রুল ইন আমেরিকা” (আমেরিকা শাসন করে কারা ?) বইতে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, আমেরিকার প্রকৃত শাসক হোয়াইট হাউস নয়, প্রকৃত শাসক ওয়াল স্ট্রিট। অর্থাৎ ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড় ব্যবসায়ীরা নির্ধারণ করেন কারা হোয়াইট হাউসে বসবেন।

আমাদের দেশে বর্তমানে রাজনীতি আর রাজনীতিকদের দখলে নেই, ব্যবসায়ী বিত্তবানদের দখলে চলে গেছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী এমপি ছিল ৬১ শতাংশ এবং এবারের সংসদের (দ্বাদশ) চিত্র কেমন হবে তা অচিরেই স্পষ্ট হবে।

রাজনীতি তো নীতির রাজা বা রাজার নীতি কিন্ত জনমনে বিশ্বাস রাজনীতিতে কোনো নীতি নেই এবং শেষ কথা বলেও কিছু নেই। তাই তো একই নেতার মুখে সকালে এক কথা, বিকেলে আর এক। জনসেবা করার ঘোষণা দিয়েই একজন রাজনীতি শুরু করেন কিন্ত এমপি হওয়ার পরের গল্প কেবল সম্পদ বৃদ্ধি। কারও অর্থ সম্পদের পাহাড় গড়ার কৃতিত্বও রয়েছে; মাঋে মাঋে পত্রিকায় দেখা যায়। অর্থ থাকলে তার আর অন্য কোনো দিকে তাকাতে হয় না, সব নাগালে চলে আসে।

নির্বাচন প্রার্থীদের এবার অনেক কদর, কারণ প্রধান বিরোধীদল বিএনপিসহ অনেক দল নির্বাচন বয়কট করে হরতাল-অবরোধ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে, একই সাথে নাশকতা চালাচ্ছে। বিরোধীদলগুলো অংশগ্রহণ না করায় এ নির্বাচনকে এক তরফা আয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ৪র্থ দফায় ক্ষমতায় আরোহনের লক্ষ্যে এবারের নির্বচন। সেক্ষেত্রে যে কোনো উপায়ে নির্বাচনেচ্ছু প্রার্থীর সংখ্যা এবং ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধির চেষ্টা করবে সরকার যাতে দেশে বিদেশে এ নির্বাচনকে যথাসম্ভব অংশগ্রহণমূলক হয়েছে মর্মে দেখানো যায়। যত বেশি প্রার্থী অংশগ্রহণ করবেন এবং বাক্সে যত বেশি ভোট পড়বে সরকারের জন্য ততই সুবিধা; নির্বাচন বিরোধীদের একটি উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপার আছে না!

এ নমনীয় অবস্হার সুযোগ নিয়ে ঋণখেলাপিদের ভোটের মাঠে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বহু ঋণ গ্রহীতা আছেন যারা খাতা কলমে ঋণখেলাপি নন, কিন্ত প্রকৃতপক্ষে তাদের এক প্রকার খেলাপি ঋণের দায় রয়েছে, তারা চতুরতার আশ্রয় নিয়ে অন্যের নাম ব্যবহার করে ঋণ নিয়ে (বেনামী ঋণ) নিজের ঋণটা খেলাপিমুক্ত রেখেছেন। এ সকল কারণেই বলা হয় ব্যাংক খাত এখন দুষ্টচক্রের অভয়ারণ্য। এমনকি রেকর্ডভূক্ত ঋণখেলাপিরাও নানা ফন্দিফিকির করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে মরিয়া হবেন, ইতিপূর্বে ঋণখেলাপিদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার নজির রয়েছে।

সে বিবেচনায় আগামী জাতীয় সংসদে সৎ ও ত্যাগী রাজনীতিকদের পরিবর্তে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য পূর্বের চেয়েও বেশি হতে পারে। এমন হলে জাতীয় সংসদেও দুষ্টচক্রের ছায়া পড়বে না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিকরা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছেন, রাজনীতির ময়দানে আগমন ঘটছে অন্য পেশার অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের।

একজন ক্রীড়াঙ্গনের আর একজন চলচ্চিত্র জগতের অপেক্ষাকৃত নবীন বিখ্যাত দুই তারকার নির্বাচনে এগিয়ে আসায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বনামধন্য। চাইলে তারা নিশ্চয়ই ভালো অবদান রাখতে পারেন। কথা আছে না, যে পারে সে সব পারে। আর যার মেধা আছে সে তো পারেই।

অভিজ্ঞতা নেই, তাতে কি ? একবার এমপি হতে পারলে আর পায় কে; তখন কেবল নেতা তোষণ আর চাটুকারীতা এবং তাতেই “চাকরি” পাকা ! এমন আশংকা এ কারণে যে, ওস্তাদ যে পথে করেছে গমন!

আমাদের অভিজ্ঞতায় বলে, যিনি ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তার ঘুষ-দুর্নীতির রেকর্ডও দীর্ঘ। যার যতটুকু ক্ষমতা আছে তার সবটুকুই ব্যয় করেন যে কোনো উপায়ে অর্থ উপার্জনে এবং অধিকতর নিরাপত্তার খোঁজে এক পর্যায়ে যুক্ত হন বিদেশে অর্থ পাচার করে সেকেন্ড হোম বানাতে।

আমাদের ইতিহাসে জ্বলজ্বল করছে বঙ্গবন্ধু তৃণমূল থেকে উঠে এসে কীভাবে জাতীয় নেতা হলেন, জাতির পিতা হলেন, চোখের সামনে অন্যায়-জুলুম দেখলেই তিনি প্রতিকারে নেমে পড়তেন। তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে একদিন দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবেন — এমন প্রাত্যাশা আমাদের।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম, সোনালী ব্যাংক।