ঢাকা, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: গণতন্ত্র ও উন্নয়নের আন্তঃসম্পর্ক অন্বেষণ

২০২৪ মে ১৪ ১৫:৫১:৪৭
শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: গণতন্ত্র ও উন্নয়নের আন্তঃসম্পর্ক অন্বেষণ

মোহাম্মদ ইলিয়াছ


শেখ হাসিনাকে পেয়ে বাঙালি তার ‘বাঙালিত্ব’ ও ‘বাংলাদেশকে’ ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বাঁধল। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয় ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে। জনস্রোতে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। অনেক ঝুঁকি নিয়েই অবতরণ করেছিল শেখ হাসিনাকে বহনকারী ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ৭০৭ বোয়িং বিমানটি। লাখো লাখো মানুষ রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়েছিল। গগনবিদারী স্লোগানের মধ্যে বেরিয়ে আসেন সাদা রংয়ের ওপর কালো ডোরাকাটা তাঁতের মোটা শাড়ি পরা প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তখন কাঁদছিলেন, প্রকৃতিও একই পথ ধরল। চারদিক অন্ধকার হয়ে বৃষ্টি শুরু হল, সঙ্গে ঝড়। ট্রাক ও মিছিল চলছিল খুব ধীরগতিতে।

৪৪ বছর আগে দেশে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। সেদিন তিনি আপন আলয়ে ফিরতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি। আপনজন চিরতরে হারিয়ে গেছে, সামনে চলার পথ কণ্টকময় হতে পারে, আঁধার নেমে আসতে পারে- তাতে কি! সব ভয়, সংশয়, আশঙ্কা ভুলে- মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে, দেশে এসেছিলেন বঙ্গকন্যা।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর টানা কয়েক বছর জাতি হতাশায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল। জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা যখন ভূলুণ্ঠিত, ভস্মীভূত, তখন সেখান থেকে ফিনিক্স পাখির মত শেখ হাসিনা বাংলার বুকে নব রেনেসাঁর সূত্রপাত করেন। দিনটি ছিল ১৭ মে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ, রবিবার। রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতায় তখন খুনী মোশতাকের সহচর জেনারেল জিয়া। তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর রক্তস্নাত মাতৃভূমিতে ফেরার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।
বর্তমান বাংলাদেশের উন্নয়ন, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির কী হতো তা সহজেই অনুমেয় ও এক গবেষণার বিষয়। পঁচাত্তর পরবর্তী জাতির ক্রান্তিলগ্নে, বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে, স্বজন হারিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে 'একলা চলো নীতির' সূচনা করেছিলেন তা সত্যিই ছিল ইস্পাত কঠিন।

বেদনার তরী বেয়ে দেশে ফেরা শেখ হাসিনা আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এবং নন্দিত রাষ্ট্রনায়ক। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বরপুত্র এবং অভ্যুদ্বয়ের ইতিহাসের মহানায়ক, তেমনি গণতন্ত্রের মানসকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনাও দীর্ঘকাল গণমানুষের মর্মস্পর্শী নেত্রী এবং মহিমান্বিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে কালের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে মহাকালকে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছেন।

শেখ হাসিনার 'সুখ-দুঃখ জগতের বৃহৎ ব্যাপারের সঙ্গে বদ্ধ', কারণ তিনি বঙ্গবন্ধু-কন্যা। অন্যদিকে বিশ্বকবির ভাবনাসূত্রে বলা যায়, শেখ হাসিনাকে কেবল ব্যক্তিবিশেষ বলে নয়, বরং মহাকালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গস্বরূপ দেখতে হলে, দূরে দাঁড়াতে হয়, অতীতের বেলাভূমিতে তাকে স্থাপন করতে হয়, তিনি যে সুবিস্তৃত রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রায় অর্ধশতাব্দীব্যাপী বাতিঘর হয়ে স্বমহিমায় প্রজ্জ্বলিত, সেই সৌকর্যসহ তাকে অবলোকন, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণ করা অপরিহার্য। তিনি মানুষের সামগ্রিক উত্তরণের আকাঙ্খার চিত্রনাট্যের রূপকার। তার মগ্ন চৈতন্য কখনো দুর্মর স্বপ্ন আর সংগ্রামে হয় আন্দোলিত, কখনো নিমজ্জিত হন অতল নৈঃসঙ্গ্য-অর্ণবে, কখনো সিক্ত হন প্রেমসলিলে, আবার কখনো বা সাহসে-দ্রোহে হয়ে ওঠেন রক্তমুখী দুর্বার সৈনিক।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পূর্বে ৫ মে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক পত্রিকায় বক্স আইটেমে তাঁর সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেও তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চের সামরিক শাসন জারির দুইদিন পর স্বাধীনতা দিবসে একমাত্র শেখ হাসিনাই সাভার স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন, বলেছিলেন, “আমি সামরিক শাসন মানি না, মানবো না, বাংলাদেশে সংসদীয় ধারার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবোই করবো।”

শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে বহুল প্রতিক্ষীত সীমান্ত চুক্তি। সমুদ্রসীমা জয়, বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে পদ্মাসেতু নির্মাণ, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং শতবর্ষী ডেল্টা প্ল্যান, তার হিরন্ময় সাফল্যের প্রসাধিত প্রভা। সফলভাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

অমর্ত্য সেন বলেছেন, “শেখ হাসিনার নেতৃত্বই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মূল কারণ।"

গার্ডিয়ান পত্রিকায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন তা বিরল। এমডিজি ও এসডিজি অর্জনে জাতিসংঘ পুরস্কার পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচী (ইউএনইপি) লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে ২০১৫ সালে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার, চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

করোনাকালীন দুর্যোগেও অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, মেট্রোরেল, পায়রা সমুদ্র বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রভৃতি তার সাফল্যের মুকুটকে করেছে আরো সমৃদ্ধ এবং সুষমামন্ডিত।

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হোসে ম্যানুয়েল সন্তোষ শেখ হাসিনাকে 'বিশ্ব মানবতার বিবেক' এবং আরেক নোবেল জয়ী কৈলাস সত্যার্থী তাকে 'বিশ্ব মানবতার আলোকবর্তিকা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তুরস্কের প্রেসিডন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান তাকে অভিহিত করেন বিরল মানবতাবাদী নেতা হিসেবে। সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের বিচার, জাতীয় ৪ নেতা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করার মত ঘটনা প্রবাহ শেখ হাসিনাকে ইতিহাসের মণিকোঠায় গৌরবমন্ডিত আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মানবতার জননী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে; যা মোটেও সহজ কাজ নয়। এসব একমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে সম্ভব হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, এমজিডি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা, কৃষি দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলে পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক বৃদ্ধি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টি ও পরিশ্রমের ফসল। এছাড়া চলমান রয়েছে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকা মেট্রোরেলসহ, দেশের মেগা প্রকল্পগুলো।

আজ তার নেতৃত্বে সামরিক শাসনের স্মৃতি পেছনে ফেলে দেশকে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে, জাতি হিসেবে বাঙালিকে এবং দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে এক ভিন্ন উচ্চতায়।

লেখক : উপপরিচালক (অর্থ ও বাজেট), অবসর সুবিধা বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা।