ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

বিজ্ঞান শিক্ষায় প্রথাগত ধর্ম চর্চা সাংঘর্ষিক

২০২৪ জুন ০২ ১৬:২৮:৫৩
বিজ্ঞান শিক্ষায় প্রথাগত ধর্ম চর্চা সাংঘর্ষিক

মারুফ হাসান ভূঞা


বিজ্ঞান শিক্ষাকে প্রথাগত ধর্মীয় আবরণে আবদ্ধ করে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনকে ধ্বংস করা হচ্ছে। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির মন রক্ষাকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞান শিক্ষার আয়োজনকে প্রথাগত ধর্মীয় চর্চার খণ্ডিত অংশ করা হয়েছে। যার ফলে শিক্ষার্থীর বিজ্ঞান শিক্ষাকে জানছে, বুঝতে পারছে, কিন্তু উপলব্ধি কিংবা অনুভব করতে পারছে না। কারণ উপলব্ধি কিংবা অনুভবের জন্য বিজ্ঞান শিক্ষার যে স্বাধীনতা থাকার কথা ছিল সেটিই তো অনুপস্থিত!

অর্থাৎ বিজ্ঞান শিক্ষাকে উপলব্ধি করে সেটির যুগপৎ চর্চা ও অবিষ্কারের যে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় আয়োজন সেটি খণ্ডিত পরাধীনতায় আবদ্ধ। আর খণ্ডিত পরাধীনতা হচ্ছে প্রথাগত ধর্মচর্চা। প্রথাগত ধর্মচর্চা বিজ্ঞান শিক্ষায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বাধাগ্রস্ত করে। বিজ্ঞানের যে কোনো আবিষ্কার, আবির্ভাবকে সরাসরি ধ্বংস কিংবা বন্ধ করে দিতে পারে প্রথাগত ধর্ম চর্চা।

এই প্রথাগত ধর্ম চর্চা বিজ্ঞান শিক্ষার অংশ হলো কীভাবে? সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কিংবা মৌলবাদী রাজনীতিক শক্তিকে সুযোগ দিতে গিয়ে সেটি সম্ভব হয়েছে। আর এই সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতির চর্চা যারা করে তাঁরা বিশেষত ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা থেকে বিরত থাকে। যার ফলে বিজ্ঞানের প্রয়োজনকে ধর্ম বিরোধী মনে করে।

ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চায় নিয়োজিতরা বিজ্ঞান শিক্ষার বিরোধী নয়। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজন ও গুরুত্বকে তাঁরা বেশ ভালোই অনুভব করেন। স্বীকার করেন। তাহলে কেন একটি অংশ বিজ্ঞানের প্রয়োজনকে ধর্ম বিরোধী মনে করেন? কারণ ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক চর্চা না করায়।

তাঁরা মনে করেন বিজ্ঞান শিক্ষার অগ্রগতির ফলে তাদের টিকে থাকার অবস্থান সংকীর্ণ হয়ে পড়বে কিংবা পুরোপুরি ধ্বংস হবে। তাই তারা প্রথাগত ধর্মের অন্ধ চর্চাকে ভিত্তি করে বিজ্ঞান শিক্ষাকে ধর্মবিরোধী শিক্ষা মনে করেন। বিজ্ঞান শিক্ষা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মবিরোধী, ধর্মীয় কিংবা কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ, নির্দিষ্ট মতাদর্শের শিক্ষা না। বিজ্ঞান শিক্ষা কেবল স্বাধীন শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষার চর্চার মধ্য দিয়ে সঠিক শিক্ষার বিস্তার ঘটে। বিজ্ঞান শিক্ষা আধুনিক জ্ঞানের সঠিক উদ্ভাবন ও সৃষ্টি।

বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটাতে প্রয়োজন প্রথাগত ধর্মীয় চর্চার অংশকে বিজ্ঞান শিক্ষা থেকে বিয়োজিত করা। পরিষ্কার ভাবে স্পষ্ট যে বিজ্ঞান শিক্ষার সাথে প্রথাগত ধর্মীয় চর্চা তে দুরে থাক মূল ধারার ধর্মীয় চর্চাও সাংঘর্ষিক।

আধুনিক শিক্ষা যাদের দর্শন অনুসারে পরিচালিত হচ্ছে সে সকল মহান দার্শনিক রুশো, পেস্তালৎসি কিংবা রবিন্দ্রনাথে শিক্ষার দর্শন অনুসরণ করলেও আমরা দেখতে পাবো শিক্ষায় প্রথাগত ধর্ম চর্চা কিংবা কেবল ধর্ম চর্চা শিক্ষার জন্য প্রবল ক্ষতিকর। অর্থাৎ শিক্ষা তখনই মৃত হয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজের।

আর সেখানে বিজ্ঞান শিক্ষার সাথে প্রথাগত ধর্ম চর্চার যুক্ততা শিক্ষার সম্পূর্ণ স্তরকেই সাম্প্রদায়িক করে গড়ে তুলে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক ভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তির মন রক্ষার্থে প্রথাগত ধর্ম চর্চাকে বিজ্ঞান শিক্ষার অংশ করা হয়েছে।

যার ফলে বিজ্ঞান শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, বিজ্ঞানের প্রসার ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে প্রথাগত চিন্তার প্রসার, সাম্প্রদায়িক মনন। সাম্প্রদায়িক মনন এমন ভাবে সমাজে আক্রমণ করেছে যে ধর্মকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা, বৈষম্য মানুষের প্রতি হিংসাত্মক আচরণসহ একগাদা কৃত্রিম মানসিক যুদ্ধ। যা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করছে। সামাজিক সৌজন্যতামূলক পরিবেশকেও ব্যাপকভাবে ধ্বংস করছে।

বিজ্ঞান শিক্ষার অগ্রগতির সাথে ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চার অবদান নিশ্চয় ছিল। এবং সে ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চার ফলে বিজ্ঞান শিক্ষার আধুনিকায়নও হয়েছে। কিন্তু কালের পরিক্রমা ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা এখন সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় প্রাকৃতিক ভাবেই সেটি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন। পাশাপাশি কৃত্রিম ভাবে আবির্ভূত হওয়া এখনকার ধর্মীয় মূল্যবোধ বিজ্ঞান শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ভাবে অস্বীকার করে।

সুতরাং বিজ্ঞান শিক্ষার সাথে যুক্ত প্রথাগত ধর্ম চর্চাকে সম্পূর্ণ স্বঘোষিত ভাবে বিয়োজিত করতে হবে । অর্থাৎ বিজ্ঞান শিক্ষার স্বাধীন চর্চার যে পরিবেশ সেটিকে কার্যকর রূপ দিতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষাকে প্রথাগত ধর্ম চর্চা থেকে মুক্ত না করলে বিজ্ঞান শিক্ষা ধ্বংস হয়ে পড়বে। বিজ্ঞান শিক্ষার অগ্রগতি, অগ্রসরতাও থমকে যাবে। বিজ্ঞান শিক্ষার অগ্রসরতার প্রধান বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ভঙ্গি হচ্ছে প্রথাগত ধর্মচর্চা ও নিয়মকে প্রতিহত করা।

লেখক : কলামিস্ট, লেখক ও প্রাবন্ধিক।