ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

শিশু শিক্ষায় ফ্রোয়েবেলের দর্শন

২০২৪ জুন ১১ ১৬:৩৬:৩২
শিশু শিক্ষায় ফ্রোয়েবেলের দর্শন

মারুফ হাসান ভূঞা


শিক্ষাকে মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনে যেকজন শিক্ষাবিদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন, নিজেদের গবেষণা ও দর্শনগত জায়গা থেকে তাদের মধ্যে অন্যতম ফ্রোডারিক ফ্রোয়েবেল। ফ্রোয়েবেল ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, সে স্কুলটিতে পেস্তালৎসির মতাদর্শে শিক্ষা দেওয়া হত। পেস্তালৎসির শিক্ষানীতি ও পদ্ধতি ফ্রোয়েবেলকে আকর্ষিত করে। এবং নতুনভাবে ফ্রোয়েবেলের চিন্তাকে জাগ্রত করে। এবং পরক্ষণে এভারডুনে পেস্তালৎসির নিকট দুই বছর শিক্ষকতা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ফ্রোয়েবেল একপ্রকার পেস্তালৎসির শিক্ষানীতি ও পদ্ধতিতে আকর্ষিত হয়েই শিক্ষার মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষণা শুরু করেন। প্রশিক্ষণ শেষে বার্লিনে প্লেমেনের বিখ্যাত পেস্টালৎসিয়ান স্কুলে শিক্ষক হিসেবেও যোগদান করেন। দীর্ঘ গবেষণার পাশাপাশি ফ্রোয়েবেল বিদ্যালয় স্থাপন করে সে সব গবেষণামুখী শিক্ষা পদ্ধতি অনুযায়ী শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতেন। গবেষণা ও গবেষণা নির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি অনুযায়ী শিক্ষাদানের ব্যবস্থা ফ্রোয়েবেলের শিক্ষা দর্শনকে বাস্তবরূপ দিয়েছে।

শিক্ষাতত্ত্ব: ফ্রোয়েবেলের মতে খেলাধুলা, গান, গল্প ইত্যাদির শিক্ষা দিয়ে শিশুদের দৈহিক ও মানসিক বৃত্তি সমূহের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে। ফ্রেয়েবেলের শিক্ষাতত্ত্বের মূল বিষয় ছিল বস্তুর চিরন্তন ঐক্য। তাঁর মতে মানব জীবনের লক্ষ্য হলো বিশ্বের অন্তর্নিহিত অধ্যাত্মিক একত্ব উপলব্ধি করা। অর্থাৎ ব্যক্তির অন্তরস্থিত আত্মা বা পরমাত্মা কে উপলব্ধি করা। আর এই পরম আত্মপলব্ধিই হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা।আধ্যাত্মিক একত্ব উপলব্ধি কয়েকটি স্তরের মধ্যে দিয়ে বিকাশ লাভ করে। ফ্রোয়েবেল এই প্রক্রিয়াটির নাম দিয়েছেন উন্মেষণ প্রক্রিয়া।

উন্মেষণ প্রক্রিয়া: শিশুর ভবিষ্যৎ যা হত তা তার মধ্যে প্রথম থেকেই নিহিত থাকে। শিশুর ভেতর থেকে বহির্মুখী বিকাশের মাধ্যমে তার পূর্ণ পরিণতিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ শিশুর ভেতরে যা কিছু মুদ্রিত বা অবিকশিত তাই ধীরে ধীরে বের হওয়ার প্রক্রিয়ায় হচ্ছে উন্মেষ। শিশুর পরমাত্মাকে উপলব্ধির জন্য বাহিরের প্রচেষ্টার প্রয়োজন নেই। শিশুর অভ্যন্তরীণ বা সহজাত প্রকৃতি পূর্ব থেকেই তৈরি হয়ে থাকে। সেটিকে জাগ্রত কিংবা সক্রিয় করার জন্য বাহ্যিক প্রচেষ্টা বা উৎসাহেরও প্রয়োজন নেই। কারণ শিশু তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জাগ্রত বা সক্রিয় হয়ে উঠবে।

ফ্রোয়েবেলের শিক্ষা পদ্ধতি : ফ্রোয়েবেল তার শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে আত্ম-সক্রিয়তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে আত্ম-সক্রিয়াতার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে খেলা ও স্বপ্রণোদিত কাজের ভেতর দিয়ে। শিশু যখন খেলা ও স্বপ্রণোদিত কাজের সম্মুখীন হবে তখন তার আত্ম-সক্রিয়াতা স্বাভাবিক ভাবে কাজ করা শুরু করবে। এবং এর মধ্য দিয়ে শিশুর বিকাশ ঘটে। ফ্রোয়েবেল খেলাকে আত্ম-সক্রিয়াতার স্বাভাবিক প্রকাশ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে শিশুর আত্মোপলব্ধি লাভের যে অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টা ব্যক্তির মধ্যে বিশেষত দৃশ্যমান হয়। খেলা হলো তারই বাহ্যিক অভিব্যক্তি। খেলা ব্যক্তির সত্তা বিকাশের পক্ষে অপরিহার্য বিধায় তার শিক্ষামূলক গুরুত্ব অপরিসীম। ফ্রোয়েবেল মনে করেন শুধু শিক্ষার্থীকে পুথিগত শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলা, হাতের কাজ, গান গল্প ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আত্মোপলব্ধি, আত্মোন্নয়ন ও সামাজিকতা অর্জনে সুযোগ দেওয়ায় শিক্ষার লক্ষ। শিক্ষার পরিবেশ হবে সমাজধর্মী। ফ্রোয়েবেলের মতে বহুর মধ্যে একের উপলব্ধি করাই হল শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ। এবং এই উপলব্ধি শিশুর মধ্যে প্রবেশ করে শিশুর সামাজিক চেতনার মধ্য দিয়ে। ফ্রোয়েবেল তাই বিদ্যালয়কে সামাজিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে গণ্য করেন। ফ্রোয়েবেল তিন বছর থেকে শিশুদের শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করার প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ফ্রোয়েবেলের মতে শিশু অবস্থায় শিক্ষা সুস্থভাবে শিশুর ভেতরে অর্জন হয়। উপরের স্তরে শিক্ষাকে কার্যকর করতে হলে শৈশবের শিক্ষাকে সুদৃঢ় করতে হবে।

কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা : ফ্রোয়েবেলের বড় অবদান তার উদ্ভাবিত শিক্ষা পদ্ধতির বাস্তবায়ন। আর সেটি দৃশ্যমান হয়েছে ফ্রোয়েবেলের কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে। তার কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে চলাফেরা, খেৱা, গান, ছবি আঁকা, গল্প বলা ইত্যাদিসহ বহুবিধ কাজ শিশুর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা তৈরির কাজ হিসেবে অন্তর্গত ছিল। অর্থাৎ শিশু কোনো বাহ্যিক চাপ ও উৎসাহ ছাড়া এসবের মধ্যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। ফ্রোয়েবেলের কিন্ডারগার্টেনে তিনরকম উপকরণ ব্যবহৃত হত-১। মাদারপ্লে, ২। নার্সারি গানও ৩। উপহার।

উপহার হল গোলক, কিউব ও সিলিন্ডার। এই আকৃতি গুলো অপরিবর্তনীয় এবং এইগুলো থেকে ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, বর্গক্ষেত্র ইত্যাদি বহু শিক্ষা সরঞ্জাম উদ্ভাবিত হয়। ফ্রোয়েবেলের কিন্ডারগার্টেনে বিশেষ উপকরণ হলো গল্প। গল্প শিশুদের ভাব ও ভাষাকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করে। ফ্রোয়েবেল শিশুদের সৃজন আকাঙ্ক্ষা তৃপ্তির মাধ্যম হিসেবে হাতের কাজের উপরও তিনি প্রচুর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। শিশুর নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন এবং আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি লাভের জন্য প্রকৃতি বীক্ষণকে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার অঙ্গীভূত করেছিলেন। ফ্রোয়েবেলের কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হল ছেলেমেয়েদের মধ্যে সমাজধর্মী সহযোগিতামূলক শিক্ষা প্রদান করার পদ্ধতি। ফ্রোয়েবেল ছেলেমেয়েদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে তাদের মধ্যে একতা আনার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার মতে শিমু একা হলেও সে যে আর দশ জনের মত একটি বৃহৎ সত্তার অংশ এই বিশেষ অর্জনটুকু প্রত্যেক শিশুর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে যৌথ কাজ, সম্বলিত প্রচেষ্টা তৈরি হয়। ফ্রোয়েবেলের কিন্ডারগার্টেন সামাজিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, পরবর্তীতে তা থেকেই বিদ্যালয়কে সমাজের প্রতিচ্ছবি করার আধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পদ্ধতির জন্ম হয়।

শিক্ষার প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা, কিংবা শিশু শিক্ষায় বাহ্যিক প্রভাব ও উৎসাহ ছাড়া মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে, শিশুর স্বাভাবিক আত্মোপলব্ধি বা পরমাত্মাকে উপলব্ধির মধ্য দিয়ে শিক্ষা অর্জনের সুদৃঢ় পদ্ধতির বাস্তবিক রূপ দিয়েছেন ফ্রোয়েবেল। তার মতবাদ ও মতবাদের বাস্তবিক রূপ আধুনিক শিক্ষার উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষত শিক্ষায় শিশুদের খেলা, গান, গল্প ও মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদানের বাস্তবিক রূপ প্রথাগত শিক্ষার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সুতরাং ফ্রোয়েবেলের শিশুর শিক্ষার দর্শন যা উপরের শিক্ষার স্তরের ভিত্তি। সে ভিত্তি শিশু অবস্থায় তৈরি না করলে উপরের স্তরে কার্যকর হবে না। তাই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ফ্রোয়েবেলের শিক্ষাদর্শন অনুসরণ করা প্রয়োজন এতে শিক্ষার উন্নতি, উন্নয়ন সমৃদ্ধ ও অগ্রগামী হবে।

লেখক : লেখক ও কলামিস্ট।