ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

ফ্যাটি লিভার নিয়ে আতঙ্ক নয় প্রয়োজন সচেতনতা 

২০২৪ জুন ১২ ১৬:৫০:১১
ফ্যাটি লিভার নিয়ে আতঙ্ক নয় প্রয়োজন সচেতনতা 

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


ফ্যাটি লিভার এবং এর প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ১৩ জুন বিশ্বব্যাপী সপ্তমবারের মতো পালন হতে যাচ্ছে Annual Global Fatty Liver Day (যা পূর্বে International NASH Day হিসাবে পরিচিত)। এই বছরের প্রতিপাদ্য “ ACT NOW SCREEN TODAYÓ”বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ১১ কোটির ওপর মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং ২০৩০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩৫ কোটির ওপর। এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ‘লিভার সিরোসিস’ ও ‘লিভার ক্যান্সার’ এর মতো জটিল রোগের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।আর সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ফ্যাটি লিভার জনিত প্রদাহ।ফ্যাটি লিভার 'হেপাটিক স্টেটোসিস' নামেও পরিচিত। যকৃতে চর্বি জমা হলে সেটিকে ফ্যাটি লিভার বলে। লিভারে অল্প পরিমাণ চর্বি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু অতিরিক্ত চর্বি জমে গেলে তা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ও জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ডা. এম এম মাজেদ'র কাছ থেকে চলুন জেনে নেই ফ্যাটি লিভার কেন হয়, এর লক্ষণ এবং কী ধরনের খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে খুব সহজেই এই ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।ফ্যাটি লিভার বর্তমান বিশ্বের একটি বড় সমস্যা। অনেকে অল্প বয়সেই আক্রান্ত হচ্ছেন ফ্যাটি লিভারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ফলে হতে থাকে যকৃতে প্রদাহ, আর ক্রমাগত প্রদাহ থেকে পরবর্তী সময়ে সিরোসিস বা ক্যানসার হওয়াও বিচিত্র নয়। এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস ভাইরাসজনিত লিভার সিরোসিসকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে ফ্যাটি লিভারজনিত সিরোসিস। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে যাচ্ছে ফ্যাটি লিভার। ফ্যাটি লিভার সাধারণত ২ ধরনের হয়ে থাকে। একটি হলো অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার এবং আরেকটি হলো নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার।

অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার সাধারণত যাদের অ্যালকোহল পান করার করার অভ্যাস আছে নিয়মিত, তাদের হয়ে থাকে৷

নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার সাধারণত অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ, অতিরিক্ত চিনি, কার্বোহাইড্রেট, প্রসেসড ফুড, মুখরোচক খাবার বা অতিরিক্ত মসলাদার খাবার গ্রহণের ফলে হয়ে থাকে।

এ ছাড়াও বিভিন্ন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করলেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে। ডায়াবেটিক বা রক্তে কোলেস্টরলের মাত্রা বেশি থাকলেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে৷ আবার একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর অনেকে বংশগত কারণেও ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হতে পারেন।

ফ্যাটি লিভার কি?

ফ্যাটি লিভার লিভারের একটি খুব সাধারণ রোগ। এ রোগের কথা প্রথম শোনা যায় ১৯৬২ সালে। তবে ১৯৮০ সালে অধ্যাপক লুডউইগ প্রথম এ রোগটিকে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেন। ফ্যাটি লিভারের ব্যাপ্তি ব্যাপক। লিভারে সাধারণ চর্বি জমা থেকে শুরু করে ফ্যাটি লিভারের কারণে এসব রোগীদের লিভার সিরোসিস, এমনকি লিভার ক্যান্সারও হতে পারে।

যেসব কারণে ফ্যাটি লিভার হয়

পাশ্চাত্যে ফ্যাটি লিভারের মূল কারণ অ্যালকোহল। তবে আমাদের মতো দেশগুলোতে মেদভুঁড়ি, ডায়াবেটিস, ডিজলিপিডেমিয়া বা রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, হাইপারটেনশন বা অতিরিক্ত রক্তচাপ আর হাইপোথাইরয়েডিজমই ফ্যাটি লিভারের মূল কারণ। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি খুবই বেশি। আমেরিকার এক গবেষণায় দেখা যায়, শতকরা ৩৩ ভাগ ডায়াবেটিস রোগীর ফ্যাটি লিভার রয়েছে। অন্যদিকে শতকরা ৪৯ ভাগ ভারতীয় যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তারা পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারেও আক্রান্ত। হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলোর মধ্যে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস অনেক সময়ই ফ্যাটি লিভার করে থাকে। কর্টিকোস্টেরয়েড, টেমোক্সিফেন ইত্যাদি ওষুধ দীর্ঘদিন সেবনেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে। ফ্যাটি লিভারের আরেকটি বড় কারণ খাদ্যাভ্যাস ও লাইফ স্টাইল।সিডেন্টারি বা আয়েশি জীবন-যাপন আর অতিরিক্ত ফ্যাট বা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খেলে লিভারে চর্বি জমতেই পারে। আমাদের দেশে বর্তমানে জনপ্রিয় ’ফাস্ট-ফুড’ সংস্কৃতি ফ্যাটি লিভারের বাড়তি প্রাদুর্ভাবের সম্ভবত একটি বড় কারণ।

আমাদের দেশের মানুষের নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। বেশিরভাগ মানুষ বুঝতে পারেন না যে লিভারে ফ্যাট জমলে তা গুরুতর আকার নেয়। ফ্যাটি লিভার থেকে প্রথমে হেপাটাইটিস বা লিভারের প্রদাহ হয়। এরপর তা লিভার সিরোসিসের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তবে শুরুতেই ফ্যাটি লিভারের লক্ষণগুলো জানতে পারলে অনেক গুরুতর সমস্যার সমাধান হতে পারে।

ঝুঁকিতে আছেন যারা

● টাইপ টু ডায়াবেটিস আছে যাদের

● মেনোপজ শুরু হয়েছে এমন নারীদের

● স্থূলতা আছে যাদের

● শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা যাদের বেশি

● দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন যারা

ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ

● অনিয়ন্ত্রিত বা অনিয়মিত খাদ্যাভাসের ফলে লিভারের ওপর চাপ পড়ে। ফলে হজমে সমস্যা হয় ও খাবারে অরুচি চলে আসে।

● খাবার সময় বমি বমি ভাব হতে পারে

● অনেক সময় পেট ফুলে যেতে পারে

● পেট ফুলে যাওয়ার সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুলে যেতে পারে

● হঠাৎ করেই ওজন কমে যেতে পারে

● ফ্যাটি লিভারের সমস্যা হলে মাথাব্যথা, ডিপ্রেশন বা মন খারাপ এসবও হতে পারে

যে ধরনের খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতে হবে

● অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারে যারা আক্রান্ত আছেন, তাদের প্রথমেই অ্যালকোহল গ্রহণ করা বন্ধ করতে হবে।

● আপনার যদি দুধ চা খাওয়ার অভ্যাস থাকে বা কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে তৈরি চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকে তাহলে সেই অভ্যাস পরিহার করতে হবে। ঘন দুধের তৈরি খাবার বা ফুলক্রিম মিল্ক খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে হবে।

● ফ্যাটি লিভার দূর করতে খাদ্যতালিকায় অবশ্যই ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে।

●ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার আপনার হজমে সাহায্য করবে, ক্ষুধাটাকে দমিয়ে রাখবে এবং আপনার পেট অনেক বেশি সময় পর্যন্ত ভরা থাকবে৷ তাই খাদ্যতালিকায় অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে।

● বিভিন্ন রঙের শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে। যেমন- বিটরুট, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, শিম, বরবটি, ব্রকলি ইত্যাদি। এছাড়াও আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় শাক পাওয়া যায়। আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন যেকোনো একটি দেশীয় শাক।

● অনেকেই ভেবে থাকেন ফ্যাটি লিভার হলে প্রোটিন গ্রহণ একদমই কমিয়ে দিতে হবে। এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা। আপনাকে অবশ্যই উন্নত মানের প্রোটিন খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। তবে কিছু বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। যেমন - যে মাছটি খাচ্ছেন সেই মাছের একেবারে চর্বির অংশটি বাদ দিয়ে খেতে হবে। অনেকেই মুরগির চামড়া খেতে পছন্দ করেন, তবে ফ্যাটি লিভার হলে অবশ্যই মুরগি চামড়া ছাড়িয়ে খেতে হবে৷ আপনি মাঝেমধ্যে গরুর মাংস খেতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে চর্বির অংশটি বাদ দিয়ে শুধু সলিড ১ বা ২ টুকরো মাংস খেতে পারবেন ১ বেলা।

● আপনার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় একটি সেদ্ধ ডিম রাখতে পারেন। ডেইরি প্রোডাক্টের এর মধ্যে খেতে পারেন টক দই, নন ফ্যাট মিল্ক।

● এছাড়াও দেশীয় মৌসুমী বিভিন্ন ফল আপনার খাদ্যতালিকায় যোগ করতে পারেন।

● খাবার তৈরিতে তেলের ব্যবহার কমাতে হবে। অতিরিক্ত তৈলাক্ত ও মসলাজাতীয় খাবার কম খেতে হবে।

ফ্যাটি লিভার রোগীর জন্য একটি আদর্শ খাদ্যতালিকা

° সকালের নাশতা: এক বাটি ওটস বা দুটি লাল আটার রুটি বা ব্রাউন ব্রেড (পিনাট বাটার দিয়ে খেতে পারেন), এক চামচ চিয়া সিড, যেকোনো একটা ফল, এক কাপ কফি বা গ্রিন টি।

° দুপুরের খাবার: মাঝারি আকারের এক বা দুই পিস মাছ বা মুরগির মাংস দিয়ে এক কাপ লাল চালের ভাত, সবুজ পাতাওয়ালা সবজি সেদ্ধ বা সালাদ (অলিভ অয়েল ড্রেসিং দিয়ে নিতে পারেন), ডাল।

° বিকেলের নাশতা: একটা আপেল অথবা পাঁচ-ছয়টা কাজুবাদাম বা আখরোট।

° রাতের খাবার: বিনস, ব্রকলি, শসা, টমেটো ইত্যাদি দিয়ে এক বাটি সালাদ, এক কাপ টক দই।

রোগ নির্ণয়

ফ্যাটি লিভার রোগ সাধারণত লক্ষণীয় লক্ষণ ছাড়াই প্রকাশ পায়। অতএব, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী অবস্থা সনাক্ত করতে রক্তের কাজ পরিচালনা করতে পারে। রক্তে লিভারের এনজাইমের উচ্চ মাত্রায় কাজ করার ফলে চর্বি জমে লিভারের প্রদাহের পরামর্শ দেয়। ফ্যাটি লিভার নির্ণয়ের জন্য, ডাক্তার নিম্নলিখিত পরীক্ষার অনুরোধ করতে পারেন:

লিভার ইমেজিং: সিটি স্ক্যান, এমআরআই, বা আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান।

লিভার বায়োপসি: লিভারের অসুস্থতার তীব্রতা নির্ধারণের জন্য লিভার থেকে একটি টিস্যু নেওয়া হয়।

হেপাটিক ইলাস্টোগ্রাফি ফাইব্রোস্ক্যান: এই পরীক্ষাটি একটি বিশেষ আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে চর্বির পরিমাণ, লিভারের ক্ষতির পরিমাণ এবং দাগের টিস্যুর পরিমাণ পরিমাপ করে)। যেহেতু এটি অ-আক্রমণকারী, তাই এটি প্রায়ই লিভার বায়োপসির সাথে বিকল্পভাবে ব্যবহৃত হয়।

পরিশেষে বলতে চাই, লিভারে চর্বি জমে ননঅ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এবং অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ হয়, যা লিভারের কার্যকারিতা নষ্ট করে। ক্লান্তি, ক্ষুধা হ্রাস, এবং ওজন হ্রাস এমন কিছু সূচক যা একজন ব্যক্তির অবশ্যই লক্ষ্য রাখা উচিত, কারণ এই অবস্থাগুলিতে সাধারণত ফ্যাটি লিভার রোগের লক্ষণ দেখা যায় না। এফএলডিগুলিকে অবিলম্বে চিকিৎসা করা উচিত, অথবা সেগুলি জন্ডিস, চুলকানি এবং ফুলে যেতে পারে - যা লিভার সিরোসিস এবং ফাইব্রোসিস হতে পারে।

যদিও ফ্যাটি লিভারের রোগ সহজে চিকিৎসা করা যায় না, তবে এটি একটি সুষম খাদ্য খাওয়া, সঠিক ওজন বজায় রাখা, ঘন ঘন ব্যায়াম করা এবং অ্যালকোহল সেবন থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যেতে পারে। এছাড়াও, লিভার সুস্থ আছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত লিভার পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই সঠিক সময়ে এ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক ও রোগী সবারই ব্যাপক সচেতনার প্রয়োজন। কারণ শুরুতে ব্যবস্থা নিলে এ রোগ অধিকাংশ সময়ই নিরাময় সম্ভব।

লেখক : চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।