ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

প্রচ্ছদ » ফিচার » বিস্তারিত

অযত্নে অবহেলায় জরাজীর্ণ হাজীগঞ্জ দূর্গ

২০২১ আগস্ট ২৪ ১৩:৫৬:৫৬
অযত্নে অবহেলায় জরাজীর্ণ হাজীগঞ্জ দূর্গ


মোঃ শান্ত, (নারায়ণগঞ্জ সদর) : ঢাকার নিকটবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা নারায়ণগঞ্জ। যার অবস্থান শীতলক্ষ্যাকে নদী কেন্দ্র করে। ঈসা খানের শাসন আমলে ঢাকা শহরকে রক্ষা করার জন্য তৎকালীন পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যেই ট্রায়াঙ্গল অব ওয়াটার ফোর্ট বা ত্রিভূজ জল দুর্গ নির্মাণ করা হয়। ২০০ বাই ২৫০ ফুটের এই দূর্গটি বাংলার মোঘল স্থাপতের নিদর্শন বহন করে।

মোঘল আমলে যার নাম ছিলো খিজিরপুর জলদুর্গ। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য ধারণ করছে এই হাজীগঞ্জ দুর্গ। যা এখন দুর্গটি প্রায় জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

এই দুর্গটির নির্মান কাল সময় নিয়ে রয়েছে অনেক মতবাদ। কোন লিখিত প্রমাণ না থাকায়, অনুমান করা হয় ১৫৮০সালে এই দুর্গটি নির্মিত হয়েছিল। লেখক মুন্সি রহমান আলী তার এক গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায় যে মীর জুমলা (১৬৬০-১৬৬০) খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে দুর্গটি নির্মাণ করেন। আহম্মাদ হাসান দানি তার মুসলিম আর্কিটিকশ্চার ইন বেঙ্গল গ্রন্থে লিখেছেন, ইসলাম খান (১৬১০) খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করার পর দুর্গটি নির্মাণ করেন।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, হাজীগঞ্জ দুর্গকে বহুবার সংস্করণ করা হয়েছে। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত 'লিস্ট অব অ্যাটুনসিয়েন্ট মনুমেন্ট ইন বেঙ্গল' বইয়ের লেখা অনুসারে সেই সময় এটি প্রায় ধ্বংস অবস্থায় ছিল। ১৯৫০ সালে প্রন্ততত্ত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে আসা হয়।

বর্তমানে ঐতিয্যবহনকারী দুর্গটি প্রায় জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এখানে এক সময় অনেক পর্যটক ভ্রমন আসতো। কিন্তু এই দূর্গটি এখন মাদকসেবন কারী ও ছিনতাইকারীদের দখল রয়েছে। প্রতিনিয়তই ছিনতাইকারীদের কবলে পরে সর্বস্ব হাড়াছে জনসাধারণের। যার কারণে এই দূর্গটিতে পর্যটক আসা একেবারেই কমে গেছে। কিন্তু দেখা যায় দুর্গটির কয়েকশ মিটার দুরেই রয়েছে হাজীগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ি। প্রশাসনের দায় এড়ানো ভাব থাকার কারনে সৃষ্টি হচ্ছে নানা অপকর্মের।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চভুজাকৃতি দুর্গটির উত্তর দিকে রয়েছে প্রবেশ পথ। দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ দিকের এক কোণে রয়েছে ইটের তৈরি একটি সুউচ্চ চৌকাস্তম্ভ । ধারণা করা হয় এই চৌকাস্তম্ভ থেকেই নদী পথে জলদস্যুদের উপর নজরদারি রাখা হতো। এছাড়াও পঞ্চভুজাকৃতির বেষ্টন প্রাচীরের দেয়ালে দেয়ালে বন্দুক বসানোর জন্য রয়েছে চৌকোট। চার কোণে রয়েছে কামান বসানোর জন্য চারটি বুরুজ।

হাজীগঞ্জ দূর্গে ঘুরতে আসা পর্যটকরা জানান, পরিত্যক্ত অবস্থায় পরিচর্যাহীন খুবই নোংরা ও অসামাজিক কার্যকলাপের স্থান হয়ে উঠেছে এই ঐতিহাসিক দুর্গটি। প্রশাসনিক কোন হস্তক্ষেপ না থাকার কারনে এখানে প্রায়সময় সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে মানব কল্যাণ পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ মান্নান ভূইয়া বলেন, দুর্গটিকে রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের একটি সংক্রিয় কমিটি গঠন করা উচিত এবং সেচ্ছাসেবক দ্বারা এ দুর্গটিকে রক্ষণাবেক্ষণ করা কথাও জানান। পাশাপাশি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এই প্রতিনিধি।

হাজীগঞ্জ জলদুর্গের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল আমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা আঞ্চলিক পরিচালক রাখী রায় জানান, দুর্গটিতে পর্যটকদের জন্য প্রবেশ উন্মুক্ত রয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ টিম প্রতিনিয়ত দুর্গটি পরিদর্শন করছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম (পিপিএম বার) বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জেলা পুলিশের নিয়মিত যে টহল সেটি অব্যাহত থাকবে। এবং মাদকের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ছাড় দেয়া হবে না।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দুর্গটির রক্ষণাবেক্ষণ করে। তারা যদি দুর্গটির সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য তাদের সাথে কাজ করার অনুমতি দেয় তাহলে আমরা প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করব।

(এমএস/এএস/আগস্ট ২৪, ২০২১)