ঢাকা, রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

রেলপথ মন্ত্রী, কালো বিড়াল এবং সাদা ইঁদুর

২০২২ মে ০৮ ২৩:৩৫:৪৭
রেলপথ মন্ত্রী, কালো বিড়াল এবং সাদা ইঁদুর

রহিম আব্দুর রহিম


গত দুই দিন সামাজিক যোগাযোগ, পত্র-পত্রিকা, বেসরকারি টিভি চ্যানেল এবং অনলাইন পোটালে একটি সংবাদ বেশ চাউর হয়েছে। যাকে ‘টক অব দা ওয়ার্ল্ড’ হিসাবে উল্লেখ করলে ভুল হবেনা। গত ৬ এপ্রিল খুলনা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে ঈশ্বরদি রেলওয়ে জংশন স্টেশন থেকে তিন যাত্রী উঠেছিলেন। যাদের টিকিট ছিলো না। এরা আবার দখল করেছে রেলওয়ের কেবিন। যাচ্ছিলেন ঢাকা। তারা নাকি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর রেলপথ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন এমপির স্ত্রীর ফুপাতো ভাই। ওই তিন যাত্রীকে কর্তব্যরত টিটিই শফিকুল ইসলাম, তাঁর রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা থেকে অপরাধী যাত্রীদের ১০৫০/- টাকা ভাড়া আদায় করেন, টিটিই শফিকুলকে সেলুট। এই যাত্রীরা ঢাকা পৌঁছে রেলের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অসদাচারনের অভিযোগ করেন। আর যায় কই? বিনাটিকিটে ট্রেন ভ্রমনকারীর অভিযোগে বরখাস্ত হন, দেশপ্রেমিক টিটিই শফিকুল ইসলাম। এই নিয়ে তুলকালাম। তবে মন্ত্রী এই ব্যাপারে বলেছেন পাবনার ঈশ্বরদী রেল জংশন থেকে বিনাটিকিটে ভ্রমনকরা যাত্রীরা তার আত্মীয় নন। অন্য দিকে ওই যাত্রীর মা অর্থাৎ রেলপথ মন্ত্রীর স্ত্রীর ফুপাতো বোন সাংবদিকদের বলেছেন, বিনাটিকিটে রেল ভ্রমনকারী তার সন্তান। তিনি রেলমন্ত্রীর স্ত্রীকে বিষয়টি জানানোর পর যা হবার তাই হয়েছে বলে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ। একজন মন্ত্রীর স্ত্রীর জানা থাকা দরকার, দেশ জনগণের, জনগণের সম্পদ রেল। আর এই রেলকে রক্ষা করার জন্যই মন্ত্রী। একজন মন্ত্রী একটি মন্ত্রনালয়ের টিমলিডার যার নেতৃত্বে একটি মন্ত্রনালয়ের কর্মকান্ডের সুফল-কুফল নির্ভর করে। কোন মন্ত্রীর স্ত্রী, আত্মীয় স্বজন, ভাই বোন মন্ত্রী নন। এটা ভুলে গেলে চলবে না।

একই সাথে বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্নীতি আক্রান্ত খাতটি এখন রেলবিভাগকে বলা যায়। আমাদের দেশের প্রথম টার্মে রেলপথ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন প্রয়াত বর্ষিয়ান নেতা সুরঞ্জিত সেন। দুঃখ জনক হলেও সত্য এই মন্ত্রীকেও কালোবিড়ালে পেয়েছিলো বলে অভিযোগ তুলে তাকে কুপোকাত করা হয়েছে। আজ বুঝা যাচ্ছে সেদিনের ওই ঘটনাটিও একটি ষড়যন্ত্র। দ্বিতীয় টার্মে মন্ত্রীত্ব পান কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের মুজিবুল হক। এই মন্ত্রী রেলপথ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন রেলবিভাগকে পরিচ্ছন্ন করতে । কিন্তু পেরে না উঠার কারণ, তাঁর স্ত্রীর অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্য। যা প্রধানমন্ত্রীও জানতে পেরেছিলেন। এরপর রাজনৈতিক অঙ্গনের অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ইমেজের কর্মীবান্ধব নেতা এলাকার সার্বজনীন ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট মোঃ নুরুল ইসলাম সুজন এমপি’র গত নির্বাচনী প্রচারনাকালে তিনি তাঁর স্ত্রীকে হারান। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলেই আজকের রেলপথ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন এমপি।

উনি মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পর রেলখাতের বিভিন্ন দুর্বল সেক্টর গুলোকে সবল এবং দুর্নীতি মুক্ত রেলখাত বির্নিমানে নিরন্তর প্রচেষ্ঠা করে যাচ্ছেন। যে কারণে দেশের সর্বমহলে রেলপথ মন্ত্রনালয়ের বর্তমান মন্ত্রীর যথেষ্ঠ সুনাম রয়েছে। তবে মন্ত্রী নাকি অফিসার নির্ভর বলে মনে করেন রেল বিভাগের ঠিকাদাররা। আবার অফিসাররা মনে করছেন রেলপথ মন্ত্রী ঠিকাদারপন্থী। যে যাই বলুক না কেনো, মন্ত্রীর কড়াকড়ি, দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান যে তাঁকে রেল বিভাগের একটি অংশের সুবিধাবাদীদের মুখোমুখি দাড় করিয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই । রেলপথ মন্ত্রীকে যারা চিনেন, জানেন তারা কখনো বিশ্বাস করতে পারেন না যে, রেলপথ মন্ত্রী বিনাটিকিটে রেল ভ্রমনকারী কোন ব্যক্তিকে সর্মথন দেবেন হোক সে সাধারণ, হোক সে তার কোন আত্মীয়।

তবে তার শুভাকাঙ্খীরা বলছেন রেলমন্ত্রীর স্ত্রী অফিসারদের নাম্বার কিভাবে পেলেন? সবকিছু মিলিয়ে মন্ত্রীকে বিপদে ফেলার জন্য এই নাটক তৈয়ার হয়েছে বলে তারা মনে করেন। তাদের এই যুক্তির সত্যতা মিলাতে তারা বলেন, (ক) রেলপথ মন্ত্রীর স্ত্রীর ফুপাতো ভাইয়ের টিকিটের জন্য রেলমন্ত্রীর স্ত্রী আগেই স্টেশন মাষ্টারকে ফোন করেছিলেন বলে বিনাটিকিটে ভ্রমনকারী একযাত্রীর মা সাংবাদিকদের বলেছেন। স্টেশনমাষ্টার সম্ভবত এই সংবাদটি তার উর্দ্ধতন কোন কর্মর্কতাকে জানিয়েছেন, জানানো এই বিষয়টিকে কাজে লাগানোর জন্য কোন ষড়যন্ত্র হতেও পারে। কারণ ওই স্টেশন মাষ্টার তাকে কেনো টিকিট সংগ্রহ করে দেয়নি। ধরে নিলাম ছিলো না। ওই যাত্রীরা যখন ট্রেনে উঠলেন তাদের কেবিন কে দিলো? তবে কি ট্রেন অরক্ষিত? তারা আরো বলেন, যে কোন যাত্রী যে কোন মূহুর্তে রেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সেবা বিষয়ক অভিযোগ করতেই পারেন, সেক্ষেত্রে সরাসরি মোবাইলের মাধ্যমে কাউকে সাময়িক বরখাস্ত করার অধিকার কেউ রাখে না। এ থেকে প্রমান হয় রেল এখনো আইন প্রয়োগে গড়িমসি করছে যা বিধি সম্মত নয়। যে রেলবিভাগের টিকিট চোরাকারবারীকে র‌্যাব গ্রেফতার করতে পারে সেখানে এই যাত্রীদের আইনের আওতায় না এনে একজন টিটিই কেই বরখাস্ত করা হলো?

যে মন্ত্রী তার ছেলে মেয়ে এবং নিজে লাইনে দাড়িয়ে টিকিট ক্রয় করে রেল ভ্রমন করেন সেখানে তথাকথিত আত্মীরা কেনো বিনাটিকিটে রেল ভ্রমন করবেন। মন্ত্রীর জন্মস্থান পঞ্চগড়ের কোন একগ্রামে। এই অঞ্চলের মানুষরা কোন দিন কখনো রেলে ওঠে ক্ষমতা দেখানো তো দুরের কথা তারা পঞ্চগড়ের মানুষ হিসাবেও পরিচয় দিয়ে মন্ত্রীকে খাঁটো করতে নারাজ। রেলপথ মন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী ভালো করেই জানেন এবং চেনেন। এই ঘটনাটি কাকতালীয় নয়, একেবারেই পরিকল্পিত সেটা হতে পারে বিনাটিকিটে ভ্রমনকারীদের মাধ্যমে অথবা মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ধবংস করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে সুযোগ খুঁজছিলো তাদের মাধ্যমে। আমরা রেলপথ মন্ত্রীর কর্মকান্ডে মুগ্ধ তবে তাঁর আত্মীয়তার পরিচয় দিয়ে বিনাটিকিটে কেউ রেল ভ্রমনে করুক তার পক্ষে মন্ত্রীও নন আমরাও নই। এই ঘটনাটি মন্ত্রীর জন্য একটি আর্শীবাদের হুশিয়ারী, বিশ্বাস তিনি এখন আরো কঠিন এবং কঠোর হস্তে মন্ত্রনালয়ের সকল প্রকার জঞ্জাল পুরোধা কালোবিড়াল ও সাদাইঁদুরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন।

লেখক : শিক্ষক, নাট্যকার, গবেষক ও কথাসাহিত্যিক।