প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
১১৫তম মহাপ্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি
বাঙালির অনুপ্রেরণা শহীদ ক্ষুদিরাম
২০২৩ আগস্ট ১০ ০০:১৬:০১গোপাল নাথ বাবুল
ছোটবেলা থেকে ছিলেন ভীষণ ডানপিটে, অসীম সাহসি ও লড়াকু স্বভাবের। হার মানা শব্দটা কী তা তিনি জানতেন না। লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী হলেও কিশোরোচিত দুরন্তপনা ও দুঃসাহসিক কার্যকলাপের প্রতি ঝোঁক ছিল বেশি। ছিলেন স্বপ্নের ফেরীওয়ালা। তাইতো স্বপ্ন দেখতেন, এমন এক সমাজের, যেখানে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, থাকবে না দাসত্বের শৃঙ্খল ও আতঙ্ক, অত্যাচার-নিপীড়নের ভয়---। স্বদেশকে মুক্ত করার এমনই এক স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অত্যাচারী বৃটিশ সরকারের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে নিঃস্বার্থে আত্মবলিদান দিয়েছিলেন শহীদ ক্ষুদিরাম বসু। ক্ষুদিরাম বসুর জীবন দান দেশজুড়ে স্বাধীনতা লাভের আন্দোলনকে তীব্র করে তুলেছিল এবং ভারতবাসির মধ্যে দেশপ্রেমের অনুভূতি গড়ে উঠেছিল। কেননা, স্বদেশের জন্য হাসিমুখে কিভাবে জীবন দান করতে হয়, ভারতবাসিকে তা শিখিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম বসু। সুতরাং ক্ষুদিরাম বসু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অমর এক নাম। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম বিপ্লবী ছিলেন তিনি। অথচ আমাদের অবহেলার কারণে বর্তমান প্রজন্ম জানেই না শহীদ ক্ষুদিরাম কে ছিলেন বা তিনি কেন এখনো বাঙালির অনুপ্রেরণা ?
দেশের জন্য আত্মবলিদানের অগ্নিকুন্ডে যখন হাজার হাজার তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখন বাংলা দেখেছে ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন বয়সের তরতাজা প্রাণের এক নির্ভিক রূপ ক্ষুদিরাম বসুকে আর ভারতমাতা দেখেছে স্বাধীনতার লড়াইয়ে নিজের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে এক যুবকের আত্মবলিদান। এমন বীর বিপ্লবীর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন বিদ্রোহের চেতনায় লিখেছিলেন সর্ব্বেশ্বর। তবে তো তিনি দেশের সর্বকনিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে হাসতে হাসতে ফাঁসির রশিকে বরণ করে নিয়েছিলেন ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট। সেই মহান বিপ্লবী শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর প্রয়াণ দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
যখন আরো দীর্ঘ সময় শাসন করার ইংরেজদের আশাকে নিরাশায় পরিণত করে সারা ভারতের গ্রামে-গঞ্জে পর্যন্ত বিপ্লবীদের স্বাধীনতা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লো, তখন বর্তমান ভারতের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশপুর থানার মৌবনী (হাবিবপুর) গ্রামের ত্রৈলোক্যনাথ বসু ও লক্ষ্ণীপ্রিয়া দেবীর কোল আলো করে ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর জন্ম নেন এ বীর সন্তান।
ত্রৈলোক্যনাথ-লক্ষ্মীপ্রিয়া দম্পতির তিন কন্যা সন্তানের জন্মের পর দু’পুত্র সন্তানের মৃত্যু হয়। তাই এ দম্পতি তৎকালীন সমাজের বিশ্বাস মতে, তিন মুঠো চালের (চালের ক্ষুদ) বিনিময়ে বড় মেয়ের হাতে তুলে দেন বলে নাম রাখা হয় ক্ষুদিরাম।
১৮৯৫ সালে মাত্র ৬ বছর বয়সে মা-বাবাকে হারালে বড়বোন অপরূপা রায়ের কাছে আদর-¯েœহে লালিত-পালিত হতে থাকেন ক্ষুদিরাম। গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার পর তমলুকের ‘হ্যামিল্টন’ স্কুলে লেখাপড়া করেন। এরপর ১৯০৪ সালে তাঁর বড়বোনের স্বামী অমৃতলাল রায় তাঁকে মেদিনীপুর শহরের ‘কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করে দেন। অল্প বয়সে তিনি কলকাতার বারীন্দ্র কুমার ঘোষের মতো বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন এবং মাত্র ১৫ বছর বয়সে নিজেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ব্রতী করে তোলেন। গুপ্ত সমিতির দৌলতে ক্ষুদিরাম লাঠি চালানো, তলোয়ার চালানো, কুস্তি করা, ঘোড়ায় চড়া থেকে শুরু করে বন্দুক চালনা পর্যন্ত সবকিছুতেই পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং দেশের কাজে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেন। প্রফুল্ল চাকীকে সঙ্গী করে তিনি অত্যাচারী বৃটিশ শাসককে হত্যা করে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে তৈরি হন।
তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ইংল্যান্ডের কাপড় পোড়ানো, লবণ বোঝাই বৃটিশ জাহাজ ডুবানোর কাজে, ১৯০৬ সালের মার্চে মেদিনীপুরের এক কৃষিমেলা ও শিল্পমেলায় বৃটিশ বিরোধী পুস্তিকা বিতরণ, ১৯০৭ সালে হাটগাছায় ডাকের থলি লুট, একই বছরের ৬ ডিসেম্বর নারায়ণগড়ের রেল স্টেশনের কাছে বাংলার ছোট লাটের বিশেষ রেলগাড়িতে বোমা হামলা, ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল রাত সাড়ে আটটায় বিহারের মুজাফ্ফরপুরের ইউরোপীয়ান ক্লাবে উল্লাসরত পুলিশ অফিসারদের উপর বোমা হামলাসহ বিভিন্ন আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
১৯০৬ সালে একবার পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন কিন্তু পরবর্তী মাসে অনুরূপ একটি দুঃসাহসিক কর্মের জন্য গ্রেফতার হন। এবার কম বয়সের কারণে আদালত তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তাঁর জামাইবাবু অমৃতলাল রায়ের সরকারি চাকুরিতে অসুবিধার সৃষ্টি হলে তাঁকে আশ্রয় দেন মেদিনীপুরের উকিল আব্দুল ওয়াজেদের বোন।
দেশ যখন স্বাধীনতা আন্দোলনে ক্রমেই জ্বলে উঠছে এমন সময় সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সংস্পর্শে আসেন ক্ষুদিরাম। ফলে কিশোর ক্ষুদিরামের মনে জ্বলতে থাকে স্বাধীনতা কামনার মশাল। অপরদিকে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশি আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের কঠোর সাজা এবং দমননীতির কারণেই কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ড বাঙালিদের অত্যন্ত ঘৃণার পাত্রে পরিণত হন। তাই বিপ্লবীদল যুগান্তর ১৯০৮ সালে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আর এ দায়িত্ব পড়ে প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসুর উপর।
দায়িত্ব পেয়ে তাঁরা কিংসফোর্ড আছে মনে করে রাতের বেলা একটি গাড়িতে বোমা ছুঁড়ে মারেন। বোমা হামলার পর বুঝতে পারেন তাদের প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। ওই গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না, ছিলেন কেনেডীর স্ত্রী ও কন্যা। তাঁরা বোমা হামলায় নিহত হন। অপির্ত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে তাঁরা পালাতে গিয়ে পরের দিন গ্রেফতার হবেন বুঝতে পেরে প্রফুল্ল চাকী নিজের কাছে থাকা রিভলবারের গুলিতে আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরাম বৃটিশ পুলিশদের সাথে মরণপণ যুদ্ধ করে গ্রেফতার হন। ক্ষুদিরাম বোমা হামলার সকল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ফলে বিচারক কর্নডফের রায়ে তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়।
১৫ ফুট উঁচু ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। ফাঁসি হওয়ার আগের দিন ১০ আগস্ট ক্ষুদিরাম বসু তাঁর আইনজীবী সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীকে বলেছিলেন, ‘রাজপুত নারীরা যেমন নির্ভয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়া জওহর ব্রত পালন করিত, আমিও তেমন নির্ভয়ে দেশের জন্য প্রাণ দিব। আগামীকাল ফাঁসির আগে চতুর্ভুজার প্রসাদ খাইয়া বধ্যভূমিতে যাইতে চাই।’
ফাঁসি দেয়ার আগে ফাঁসির আসামিদের শেষ ইচ্ছা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। ক্ষুদিরামের কাছেও জানতে চেয়েছিলেন তাঁর জীবনের শেষ ইচ্ছে সম্পর্কে। জবাবে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, ‘আমি বোমা বানাতে জানি। বৃটিশদের অনুমতি পেলে আমি আমার বোমা বানানোর বিদ্যা ভারতবাসিকে শিখিয়ে যেতে চাই।’ কি অসীম সাহস থাকলে মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়েও দেশের কথা ভাবা যায়! মানুষের মুক্তির কথা চিন্তা করা যায়! তার জ্বলন্ত উদাহরণ মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু।
অবশেষে ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট বিপ্লবী ক্ষুদিরাম দৃঢ় পদক্ষেপে প্রফুল্লচিত্তে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান ও হাসতে হাসতে ফাঁসির রশি গলায় নিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেন এবং বৃটিশ সরকারের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছিয়ে দেন, তাদের দিন শেষ। ভারতীয়রা তাদের আর সহ্য করতে রাজী নয়।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।
