ঢাকা, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনের জন্যই কালীপূজা

২০২৩ নভেম্বর ১১ ২৩:২৩:০৩
দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনের জন্যই কালীপূজা

গোপাল নাথ বাবুল


জগতে বিভিন্নভাবে ঈশ্বরের চেতনা ব্যাপ্ত। কল্পনার রঙ্গে রাঙ্গা হয়ে তাঁর মূর্তি থেকে প্রতিমায় প্রকাশ মনের আকাশেই বিচিত্র রূপ লাভ করে। সর্বত্রই ঐশ্বরিক মহিমার বিস্তার। প্রাচীন আর্য যুগ থেকেই বাংলাসহ ভারতীয় উপমহাদেশে শক্তির উপাসনা প্রচলিত। সেই যুগে মানুষ প্রাকৃতিক শক্তির পক্ষে ঠিকমত ব্যাখ্যা করতে পারত না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে তারা তখন নিতান্তই অসহায় ছিল। যেহেতু তারা সেই সমস্ত অলৌকিক ও দুর্জয় শক্তিকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করতেন। প্রকৃতিকে শস্য-শ্যামলা মাতৃরূপে তথা মাতৃশক্তি রূপে কল্পনা করা হত। শ্রী শ্রী চন্ডীকে পরাশক্তি রূপে কল্পনা করা হত। বীজ থেকে যেমন অংকুর বের হয়ে জীবের বিকাশ ঘটে, ঠিক তেমনি সেসব সৃজনশীল তাঁরই সৃষ্টিশক্তি।

এমনই এক শক্তির দেবী হলেন মা কালী। তাঁর অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু বাঙালিদের কাছে এ দেবী বিশেষভাবে পূজিত হন। তন্ত্র মতে প্রধান দশ দেবীর মধ্যে তিনি অন্যতম পূজিত দেবী। আমরা সাধারণত দেবী কালীর যে রূপের দর্শন পায় তা হল, তিনি চতুর্ভুজা অর্থাৎ তাঁর চারটি হাতযুক্ত মূর্তি দেখতে পাই। এক হাতে আছে খড়গ, আরেক হাতে আছে অসুরমুন্ড, অসুরদের কাটা হাত দিয়ে কোমরবন্ধ এবং অন্য হাত দু‘টি দিয়ে তিনি বর ও অভয় দান করেন। গলায় নরমুন্ডের মালা, প্রতিকৃতি ঘন কালো বর্ণের এবং জীভ মুখ থেকে বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে। এছাড়াও তিনি এলোকেশী। মায়ের পায়ের নিচে দেবাদিদেব মহাদেব শুয়ে আছেন। আর জিভ বের করে দাঁড়িয়ে আছেন মহাদেবের বুকের ওপর পা তুলে। এরূপে সর্বত্র পূজিত হয়ে আসছেন মা কালী। এরূপেই দেবী মহামায়া অবতীর্ণ হয়ে তিনি দেবতাদের বরাভয় প্রদান করেন এবং অসুর নিধনে তাঁর রুদ্ররূপ ধারণ করেন। এ পূজাকে দ্বীপান্বিতা কালী পূজা বা শ্যামাপুজাও বলে থাকেন। শাস্ত্রমতে, যে কাল সর্বজনকে গ্রাস করে আর সেই কালকে যিনি গ্রাস করেন তিনিই কালী।

কালীপূজা প্রধানত আসাম, বাংলা, বিহার, ঝাড়খন্ড এবং উড়িষ্যায় পালিত হয়। দুর্ঘটনায় মুক্তি কামনা থেকে মঙ্গলাকাক্সক্ষীর মনস্কামনা সব ক্ষেত্রেই মা কালীর ভয়ঙ্করী মূর্তিই নৈবেদ্যে আরাধ্য দেবী রূপে পূজিত হয়। তাঁর কত বিকট্-উৎকট নাম। সেই নামের বহুরূপী ও বহুমুখী বিস্তারেই দেবীর সর্বজনীন আবেদন প্রকট মনে হয়। যেমন, দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, গুহ্যকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গ্রহকালী, চামুন্ডা, ছিন্নমস্তা, কালকালী, কামকলাকালী, চন্ডীকালী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বাংলার বিভিন্ন মন্দিরে আনন্দময়ী, ভবতারিণী, ব্রহ্মময়ী, করুণাময়ী, ঢাকেশ্বরী, চট্টেশ্বরী, যশোরেশ্বরী ইত্যাদি নামেও মা কালীর পূজা করতে দেখা যায়।

দেবী কালী একই সঙ্গে সবার কাছে আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং ত্রাতা থেকে বিধাতা হয়ে ওঠাই শুধু নয়, বিশ্বাসের বরাভয় হয়ে ওঠার মধ্যেই দেবীর শক্তিদায়িনী প্রতিমা মনের জোর বাড়িয়ে চলে। মা সারদামণির কথায়ও তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাঁর মতে, মা কালী সতেরও মা, অসতেরও মা। সমাজের সর্বস্তরে মা কালীর আরাধনার মধ্যেই দেবীর প্রতি বিশ্বাস ও ভালবাসার অমোঘ প্রকাশ অন্যত্র লক্ষ্য করা যায় না। শক্তিসাধনা বা তান্ত্রিকতা সমাজমানসে বিস্তার লাভ না করলেও মা কালীর রক্ষাকত্রী মাতৃরূপা প্রকৃতি বিশ্বাসের পরাকাষ্ঠায় অন্ধকার থেকে আলোকদিশারী হয়ে ওঠেছে। সেখানে যে কোনো প্রকার অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য মায়ের সংহার মূর্তি ভক্তমানসে জেগে ওঠে। দীনহীন অসহায় মানুষের মুখে ‘জয় মা কালী’র আলো ছড়িয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে দুর্যোগতাড়িত জীবনে দেবীর বীভৎস ভয়ঙ্করী রূপের মধ্যেই অসহায় মানুষের মুক্তির স্বপ্ন জেগে ওঠে মাঙ্গলিক চেতনায় আলোর পরশ ছড়িয়ে পড়ে।

কালী দশমহাবিদ্যার প্রথম রূপ। তাঁর গায়ের রং কালো। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে ষড়রিপু। এরা হলেন কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য। ষড়রিপু আমাদের খারাপ পথে নিয়ে যায়। যেহেতু মা কালী আদ্যাশক্তির দেবী অর্থাৎ শক্তি এবং সাহস অর্জন করার জন্য এ দেবীর পুজা করা হয়। কালীপুজার মাধ্যমে আমরা আমাদের ভেতরে থাকা এ ষড়রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। মনের মধ্যে সকল অন্ধকার দূর করে সমাজের অন্ধকার দূর করতে সচেষ্ট হতে পারি।

তাই শক্তির আরাধনা অবশ্যই করতে হবে প্রত্যেককে। একমাত্র শক্তিমান মানুষই পারেন সকল বিপদ থেকে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে এবং যে কোনো বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। তাই সমাজের সকল খারাপ বা অসৎ এবং অসামাজিক কাজকর্ম দূর করার জন্য শক্তির আরাধনা স্বরূপ সকলেই দেবী কালীর পূজা ভক্তি সহকারে এবং শ্রদ্ধা সহকারে করে থাকেন। এককথায় কালী মহাবিদ্যা এক প্রমুখ দর্শন যা এক গভীর ভাবাবেগের জন্ম দিতে সক্ষম।

অতএব মা কালী অথবা দশমহাবিদ্যা দেখতে যতটা ভয়ানক তিনি মোটেই কিন্তু ভয়ানক নন। সন্তান ভুল করলে মা রাগী চোখে তাকান, তিনি চান সন্তান শুধরে যাক। দশমহাবিদ্যার প্রথম মহাবিদ্যা দেবী কালীও সেজন্য ভয়ানক রূপধারী। দেবী সন্তানদায়িনী, সন্তাপহরণকারী, রিপুবিনাশী, সবশেষে তিনি মা। তাঁর ভয়ঙ্কর রূপের মধ্যেও সেই প্রেমময় এবং যতœশীল মাকে দেখা যায়। তিনি তাঁর ভক্তদের চারপাশে থাকা নেতিবাচক শক্তিগুলোকে ধ্বংস করেন। তিনি তাঁর ভক্তদের মধ্য থেকে সমস্ত অশুভ, অশুচিতা, নেতিবাচকতা এবং অন্ধকার দূর করেন। দেবী কালীর উপাসনা করার মাধ্যমে একজন ভক্ত চিরকালের আশীর্বাদ লাভ করেন এবং তিনি তাঁর ভক্তদের সকল ধরণের মন্দ কাজ থেকে মুক্ত করেন। এক কথায় বলতে গেলে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের জন্যই কালীপূজা করা হয়।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।