ঢাকা, শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা

২০২৩ নভেম্বর ১৩ ১৮:৪২:২০
ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা

গোপাল নাথ বাবুল


বাঙালি হিন্দু সমাজ সংস্কৃতির কাঠামোর মধ্যে এমন কিছু আচার-অনুষ্ঠান আছে, যা পারিবারিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে। ভাইদের মঙ্গল কামনায় বোনেরা এমনই এক অনুষ্ঠান করে, যার নাম ‘ভাইফোঁটা’। প্রতিবছর দীপাবলি কালীপূজার পরের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এ অনুষ্ঠান হয়, যা ভাতৃদ্বিতীয়া নামে পরিচিত।

এদিন ভাই-বোনদের খুঁনসুটি থেমে যায়। কারণ, দিনটি ভাইয়ের জন্য বোনের দীর্ঘায়ু কামনার দিন। ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানটি খুবই সরল। পূজা-অর্চনার প্রয়োজন হয়না। মূলত ভাইফোঁটা দু’দিন পালন করা হয়। ‘প্রতিপদে দিয়া ফোঁটা রাখিলাম নিয়ম / দ্বিতীয়াতে দিয়া ফোঁটা করাইব ভোজন’ ছড়াটি বলে শুক্ল প্রতিপদে অনুষ্ঠান শুরু করে বোন।

মূল অনুষ্ঠান উপলক্ষে বোন প্রস্তুতি পর্ব শুরু করে কয়েকদিন আগে থেকে। নিজের হাতে ভাইয়ের পছন্দের বিভিন্ন পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম মিষ্টি খাবার তৈরি করে। ঘর-দুয়ার পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে বিভিন্ন নকশা এঁকে আকর্ষণীয় করে তোলে। অনুষ্ঠানের দিন ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন এবং বোন ওইদিন ভাই বা দাদাকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায় এবং চালের গুড়ো দিয়ে আঁকা আল্পনায় পূর্বদিকে অথবা উত্তরদিকে মুখ করে বসিয়ে ভাইকে বোন ফোঁটা দেয়। কাঁসা বা পিতলের থালায় ধান-দুর্বা এবং আমপাতায় রাখা কাজল ও চন্দন সাজিয়ে রাখা হয় ভাইয়ের সামনে। সামনে থাকে ঘিয়ের প্রদীপের পবিত্র আলো, শঙ্খ আর মিষ্টিমুখ করানোর জন্য থাকে ভাইয়ের পছন্দের বিভিন্ন মিষ্টি খাবার। এরপর বোন বামহাতের কনুই আঙ্গুল দিয়ে ভাইয়ের কপালে এঁকে দেয় চন্দন ও কাজলের ফোঁটা। এ সময় বোন ছড়া কাটে, ‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা / যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা / যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা / আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা / যমুনার হাতে ফোঁটা খেয়ে যম হল অমর / আমার হাতে ফোঁটা পেয়ে আমার ভাই হোক অমর।’

এছাড়াও বোনের পক্ষ থেকে ভাইয়ের জন্য এবং ভাইয়ের পক্ষ থেকে বোনের জন্য থাকে বিভিন্ন উপহার। এভাবে ভাই-বোনের অটুট বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করে ভাইফোঁটা পার্বন। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে ভাইফোঁটা পার্বনটি ভাইদুজ, ভাববীজ, ভাতৃদ্বিতীয়া, যম দ্বিতীয়া, ভাইটিকাসহ বিভিন্ন নামে পালিত হয়। কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা উপলক্ষে রয়েছে তিনটি পৌরাণিক কাহিনী।

১। অনেকদিন যাবৎ দেখা না হওয়ায় যমের খুব মনে পড়ত বোনকে। কিন্তু বিশাল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যম বোনের সঙ্গে দেখা করতে পারছিলেন না। শেষে একদিন যম পৃথিবীতে এসে সোজা বোনের বাড়িতে গিয়ে ওঠলেন। হঠাৎ যমুনা ভাইকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। সেদিন ছিল কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি। দীপাবলি উপলক্ষে ঘর-দুয়ার ছিল পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও সাজানো-গোছানো। এ উৎসবমুখর পরিবেশে ভাইকে পেয়ে যতœ করে পিঁড়িতে বসিয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে কপালে চন্দন ও ঘিয়ের টিপ পরিয়ে দিয়ে, আপ্যায়ন করে পরমেশ্বরের কাছে ভাইয়ের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা জানালেন। ভাইয়ের প্রতি এমন অপরিসীম ভালোবাসায় যম বোনকে তিনটি বর দিতে চাইলে যমুনা প্রথম বরে চান, প্রতিবছর যম বোনের বাড়িতে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে ভোজন করতে আসবেন। দ্বিতীয় বরে চান, এ তিথিতে যে বোন নিজের ভাইকে কপালে ফোঁটা দিয়ে ভোজন করাবে, তার কখনও যমের ভয় থাকবে না এবং তৃতীয় বর চান,যে ব্যক্তি যমুনার জলে ¯œান করবে, তিনি যেন সমস্ত নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভ করেন।

যমুনার চাওয়া সে তিনটি বরই মঞ্জুর করেছিলেন যম। তবে তিনি এটাও বলেন, যে ভাই নিজের বোনকে তিরস্কার করবে ও অপমান করবে, তাকে বেঁধে যমালয়ে নিয়ে যাবেন। তবে সে ভাই যদি যমুনার জলে স্নান করে সূর্যকে অর্ঘ প্রদান করে, তাহলে তার অপরাধ ক্ষমা করে স্বর্গলোক প্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে। অনেকে বলেন, এরপর থেকেই পৃথিবীতে প্রচলিত হয় ভাইফোঁটা।

২। নরকাসুরকে বধ করে হস্তিনাপুরের পাশ দিয়ে দ্বারকায় ফেরার পথে হঠাৎ সুভদ্রার কথা শ্রীকৃষ্ণের মনে পড়তেই চলে গেলেন বোনের রাজপ্রাসাদে। বহুদিন পর ভাইকে পেয়ে সুভদ্রা আনন্দে আত্মহারা। ভাইকে সমাদর করে বসিয়ে নানা রকম ভাইয়ের পছন্দের খাবারের পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণের কপালে এঁকে দিলেন অমঙ্গল বিনাশকারী ফোঁটা। সেদিন ছিল কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি। এরপর থেকে ভাইবোনের মধুর সম্পর্কের পার্বন ভাইফোঁটা পারিবারিক উৎসবে রূপ নেয় বলে অনেকে মনে করেন।

৩। আরেক পৌরাণিক কাহিনীতে বলা হয়েছে, একসময় বালির হাতে পাতালে বন্দি ছিলেন বিষ্ণু। সেই কারণে চরম বিপদের মুখে পড়লেন স্বর্গের দেবতারা। কোনওভাবেই যখন বিষ্ণুকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না, ঠিক সেই সময় সবাই দেবী লক্ষ্মীর ওপর ভরসা করলেন। তাতে দেবী লক্ষ্মী নারায়ণকে উদ্ধার করার জন্য বালিকে ভাই পাতিয়ে তাঁকে ভাইফোঁটা দেন। সেই দিনটি ছিল কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথি। ফোঁটা পেয়ে বালি দেবী লক্ষ্মীকে উপহার দিতে চাইলে লক্ষ্মী তখন বিষ্ণুর মুক্তি চান। তাতেই বালি উপহার হিসেবে বিষ্ণুকে মুক্তি দেন।

৪। সর্বানন্দ সুরী নামক এক আচার্য পন্ডিতের ‘দীপ উৎসব কল্পনা’ নামক তালপাতার পুঁথি থেকে জানা যায়, চতুর্থ শতাব্দীতে জৈন ধর্মের অন্যতম প্রচারক মহাবীর বর্ধমানের মহাপ্রয়াণের পর তাঁর অন্যতম সঙ্গী রাজা নন্দী বর্ধন মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। এমনকি খাওয়া-দাওয়াও বন্ধ করে দেন। এমন অবস্থায় তাঁর প্রিয় বোন অনুসূয়া নন্দী বর্ধনকে নিয়ে চলে যান নিজের বাড়িতে। সেদিন ছিল কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি। এরপর সমাদর করে রাজার কপালে চন্দনের ফোঁটা এঁকে দিয়ে ভাইকে বলেন, ‘দাদা, রাজ্যের প্রজারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এ অনশন তোমাকে মানায় না দাদা। হে দাদা, তোমার কপালে এঁকে দিলাম রাজতিলক। এবার ক্ষুধা নিরসনের জন্য খাদ্য গ্রহণ কর এবং সাদর আপ্যায়িত হও। সর্ববিদ মঙ্গলের জন্য তুমি জেগে ওঠ এবং ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুক। আমি তোমার দীর্ঘায়ু কামনা করি। এখন থেকে প্রতিবছর তোমাকে এদিনে রাজতিলক পরিয়ে অভিষিক্ত করা হবে। এটাই আমার ব্রত।’ বোনের মুখের এমন কথা শুনে রাজা নন্দী বর্ধন অনশন ভেঙ্গে উদ্ভাষিত হয়েছিলেন ভাতৃদ্বিতীয়ার দিনে। সেদিন থেকে ভাইফোঁটা পার্বন চালু হয়েছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।

সুতরাং ভাই-বোন শব্দ দু’টি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আপনজনের পবিত্র উপস্থিতি মনে উৎসারিত হয়, হৃদয় পুলকিত হয়, যা পরিবারকে আনন্দময় করে তোলে। তাই যে নামেই হোক না কেন, ভাই-বোনের পারস্পারিক স্নেহ ভালবাসার স্পন্দন মানে হৃদয়ের বীণার সুর। ভাই-বোনের একে-অপরের প্রতি বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে ভাইফোঁটার এমন আয়োজনের গুরুত্ব অপরিসীম, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।