ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা চাই প্রতিদিন 

২০২৪ মে ১২ ১৮:৩৭:৫১
মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা চাই প্রতিদিন 

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


একটি শিশু জন্মের আগে থেকেই মায়ের সান্নিধ্যে অভ্যস্ত হতে থাকে একটু একটু করে। মায়ের ভেতর বেড়ে ওঠার সময়টা থেকেই সন্তানের যে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় মায়ের সঙ্গে, জন্মের পর সেটা ধীরে ধীরে কেবল বাড়তেই থাকে। মা আমাদের অস্তিত্বের এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হন। আজ সেই মায়েদের জন্যই বিশেষ একটি দিন, আজ মা দিবস। বিশ্বজুড়ে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার দিবসটি পালিত হয়।

আব্রাহাম লিংকনের একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে- ‘যার মা আছে সে কখনই গরীব নয়।’ অর্থাৎ কেবল মায়ের আশ্রয় থাকলেই বন্ধুর পথের নানা বিপদ পাড়ি দেওয়া যায় সহজেই। মা থাকা মানে সবচেয়ে বড় ভরসা ও ভালোবাসার জায়গাটি অক্ষুণ্ণ থাকা। আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মায়ের কাছেই। সামর্থের সবটুকু দিয়ে হলেও মা দেখতে চান সন্তানের হাসিমাখা মুখ। যিনি মা হারিয়েছেন, তিনি যেন নিজের একটি অংশকেই হারিয়ে ফেলেছেন। যদিও মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা চাই প্রতিটি দিনই, তবুও একটি বিশেষ দিন যেন আমাদের মায়ের জন্য আবেগ প্রকাশের কথা আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেয়। মা দিবস আমাদের আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয় সন্তান হিসেবে মায়ের প্রতি দায়িত্ব ও সম্মানের কথা। এদিন একটু বিশেষ কিছু করে মাকে খুশি করতে দোষ নেই।

মা দিবসের তাৎপর্যের মূলে তিনটি বিষয়- ১. সব মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ২. সব মাতৃত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ৩. সমাজে মায়েদের প্রভাবের প্রতিফলন।

যেভাবে এল ‘মা দিবস’

তবু বছরের একটি দিনকে শুধু মায়ের জন্য তুলে রাখার কথা প্রথম ভাবেন মার্কিন সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড। তবে সেটাই আধুনিক মা দিবসের সূচনা নয়। আধুনিক মা দিবসের ধারণার প্রবর্তক অ্যান জার্ভিস। তিনি ছিলেন একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। যুদ্ধবিধ্বস্ত আমেরিকায় নারীদের স্বাস্থ্যরক্ষার গুরুত্ব নিয়ে তিনি কাজ করছিলেন। তার কাজের মূল বিষয়ই ছিল পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষার প্রচার ও সচেতনতা বৃদ্ধি।

এর আগে বিভিন্ন দিনের কথা জানা যায়, যেখানে মা দিবসের ধারণা রোপণ করা হয়েছিল। প্রাচীন গ্রিসে মা দিবসের আয়োজন হতো ঘরে ঘরে। প্রতি বসন্তকালে একটি দিন দেবতাদের মা ‘রিয়া’, যিনি ক্রোনাসের সহধর্মিণী তার উদ্দেশ্যে উদ্‌যাপন করা হতো। মা দিবস তখনো এত ব্যাপ্তি লাভ না করলেও এই ধারণাটির গোড়াপত্তন ঘটে।

আবার কথিত আছে, আজ থেকে ১৫০ বছর আগের সপ্তাহের রোববারের সকালটা অ্যান জার্ভিসের জন্য একদম অন্যরকম ছিল। নিজের প্রতিষ্ঠিত সানডে স্কুলে বাচ্চাদের দিতেন বাইবেল পাঠ। এই পাঠদানকালে বাচ্চাদের জন্য তার মায়া সৃষ্টি হয়। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার নিজের মায়ের ছবি খুঁজে ফিরতেন। ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় মায়ের মুখচ্ছবিকে লালন করতে চাইলেন তিনি। এই বোধ থেকেই ১৯০৫ সালে মাকে ভালোবাসা ও সম্মান জানাতে প্রবর্তন করেন মাদার্স ডে বা মা দিবসের।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর স্বীকৃতি ও প্রসার ঘটে ১৯১৪ সালে। কিন্তু এর প্রসার ঘটে আরও পরে। এর আগে আধুনিক মা দিবস পালনের কথা জানা যায়। মা দিবস উদ্‌যাপনের সূত্রপাত ঘটায় মার্কিন সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্টস।

প্রতি বছর মে মাসের চতুর্থ রবিবারকে মাদারিং সানডে হিসাবে পালন করা হতো ব্রিটেনে। এটা ছিল সতেরো শতকের কথা। মায়ের সঙ্গে সময় দেওয়া ও মায়ের জন্য উপহার কেনা ছিল দিনটির কর্মসূচিতে। এরপর আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়াতে প্রথম মা দিবস পালন করা হয় ১৮৫৮ সালে। জুনের ২ তারিখকে তারা বেছে নিয়েছিল মা দিবস হিসেবে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন সর্বপ্রথম মা দিবসকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন।

১৯১৪ সালের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেসে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে ‘মা’ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে এই দিনে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হচ্ছে মা দিবস। অ্যান জার্ভিস দিনটির সরকারি অনুমোদন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের চেষ্টা চালাতে থাকেন; কিন্তু সফল হতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর তার মেয়ে অ্যান জার্ভিস মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের কাজে হাত দেন। তিনি চেষ্টা করতে লাগলেন একটি বিশেষ দিন ঠিক করে ‘মা দিবস’টি উদ্‌যাপন করার জন্য। সে লক্ষ্যেই ১৯০৮ সালের ১০ মে তিনি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফিটন শহরের সেই চার্চে, যেখানে তার মা অ্যান জার্ভিস রোববার পড়াতেন সেখানে প্রথমবারের মতো দিনটি উদ্‌যাপন করলেন। এরপর থেকেই আস্তে আস্তে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিস্তৃত হতে থাকে চারপাশে এবং এক সময় ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে।

১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আনা জারভিসের মা মারা গেলে তার মাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে আনা জারভিস প্রথম মা দিবস পালন করেন। ১৯২০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় সব দেশে মা দিবসের প্রচলন শুরু হয়।

পরিশেষে বলতে চাই, মায়ের জন্য আলাদা কোনদিন হয় না। বছরের প্রতিটি দিনই আমাদের কাছে মাতৃ দিবস। মা মানেই নারী চেরা টান। অমোঘ ভালোবাসায় ঘেরা স্বার্থহীন এক ভালোবাসা। তারাই বুঝতে পারেন যাদের মা নেই। তাদের কাছে এই ভরা পৃথিবী যেন শূন্যহীন। জীবনে সবকিছু থেকেও তাদের কাছে যেন কিছু থাকে না।প্রতি সন্তানের কাছে মা যে কি তা সত্যিই ভাষায় বর্ণনা করা খুব কঠিন। সুখ, দুঃখ, আবেগ, অনুভূতি যে মানুষটি এক নিমিষেই বুঝে যান তিনি মা। শত কষ্টের মাঝেও যার বুকে মাথা রেখে কাদা যায় এবং সব সমস্যার সমাধান যে এক নিমেষে করতে পারেন তিনি মা।যে মানুষটি ২৪ ঘন্টা অক্লান্ত পরিশ্রম করে সংসারের জন্য নিঃস্বার্থভাবে নিজের জীবনকে বিলীন করে দেন, সকলের পাশে হাসিমুখে দাঁড়ান সেই মানুষটির নাম মা। প্রতিবছর সকলে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার পালন করেন মাতৃদিবস।

যে মানুষটি এক বছর তার সন্তানকে পেটে রেখে তিল তিল করে বড় করে তোলেন, সেই মানুষটির জন্য নির্দিষ্ট কোনদিনের দরকার হয় না। তার জন্য ৩৬৫ দিনই যথেষ্ট নয়। তবুও সকলে পালন করেন মাতৃ দিবস। প্রতিবছর আনন্দের সঙ্গে সন্তানরা পালন করে থাকেন মাতৃ দিবস।

লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।