ঢাকা, শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

সঠিক ও মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান ব্যতীত দেশের উন্নয় পরিকল্পনা ফলপ্রসু করা সম্ভব নয়

২০২৫ ফেব্রুয়ারি ২৬ ১৭:৪৬:২১
সঠিক ও মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান ব্যতীত দেশের উন্নয় পরিকল্পনা ফলপ্রসু করা সম্ভব নয়

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


পঞ্চম বারের মত দেশে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস ২০২৫ পালিত হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। প্রতিবছর ২৭ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে জাতীয়ভাবে পরিসংখ্যান দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২০ সালের ৮ জুন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে পরিসংখ্যান আইন পাস করা হয়। এ আইনের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে আমূল পরিবর্তন আসে। এ দিবসটির স্মরণেই প্রতিবছর জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।আর একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে পরিকল্পিত অর্থনীতি প্রণয়ন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অপরিসীম।দিন দিন বাড়ছে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব। বিশেষ করে পরিকল্পিত অর্থনীতির জন্য সঠিক পরিসংখ্যান অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি প্রবল থাকায় সঠিক তথ্য প্রাপ্তিতে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস।

১৯৭৪ সালের ২৬ আগস্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন চারটি পরিসংখ্যান সংস্থাকে এক করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রতিষ্ঠা হয়। পরিসংখ্যানের গুরুত্ব সব সময়ই ছিল। কিন্তু এখন আরও অনেক বেড়েছে। কারণ দেশের অর্থনীতির পালস বুঝতে হলে পরিসংখ্যানের বিকল্প নেই। তাছাড়া জাতির উন্নয়ন আর অগ্রগতি যা-ই বলেন, সবকিছুর সঙ্গেই পরিসংখ্যান জড়িত। মানুষের সুষম উন্নয়নের জন্যও পরিকল্পনার প্রয়োজন। এখন বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যানের দিক বিবেচনা করেই উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়।

> বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৩ সালে দেশে মোট জনসংখ্যা ছিল ১৭ কোটি ২৯ লাখের কিছু বেশি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৪৭ লাখে। অতীতে বাংলাদেশে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির গতি ক্রমেই শ্লথ হতে দেখা গেলেও পরিস্থিতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে। ওই সময় থেকে বাংলাদেশে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে।

* ধর্মভিত্তিক জনগোষ্ঠী: গত এক দশকে দেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী বেড়ে। ২০১১ সালে ছিলো ৯০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, আর ২০২২ এসে ৯১ দশমিক ০৮ শতাংশ। তবে এসময় হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমেছে। ২০১১ সালে ছিলো ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ২০২২ সালে তা এসে দাঁড়িয়ে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

* এছাড়া বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ।

* খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশে। আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা আগে ছিল শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ। এখন তা কমে হয়েছে শূন্য দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে যতো জনের বাস ২০১১ সালে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৯৭৬ জন বসবাস করলেও ২০২২ সালে এসে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বসবাস করেন এক হাজার ১১৯ জন।

* বিবাহিত/অবিবাহিত নারী-পুুুরুষের সংখ্যা: দেশে অবিবাহিত পুরুষ আছেন ৩৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে নারীর সংখ্যা ২২ দশমিক ০৪ শতাংশ। বর্তমানে বিবাহিত পুরুষের সংখ্যা ৬২ দশমিক ৭৬ শতাংশ আর নারী ৬৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।

* স্বাক্ষরতা: গত এক দশকে দেশে স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে। ২০১১ সালে ছিলো ৫১ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। সাক্ষরতার দিক থেকে এগিয়েছে পুরুষ, গড়ে তা ৭৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। অপরদিকে নারীর সংখ্যা ৭২ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

*শিক্ষা ব্যবস্থা : সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী সংখ্যা কমলেও বেড়েছে কারিগরি শিক্ষায়। ২০১১ সালে গড়ে ৯৩ দশমিক ৭১ শতাংশ সাধারণ শিক্ষা নিলেও ২০২২ সালে এসেছে ৯৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। কারিগরিতে এ হার ২০১১ সালে শূন্য দশমিক ৭১ শতাংশ আর ২০২২ সালে শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ, শিক্ষা কর্মসংস্থান এমনকি ট্রেনিংয়েও নেই দেশে এমন জনসংখ্যা ৩৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। যেখানে নারী আছেন ৫২ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

* কৃষি: কৃষিতে নিয়োজিত ১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ, সেবা খাতে নিয়োজিত ৪৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ, কৃষিতে ৩৭ দশমিক ৯১ শতাংশ, কাজ করে না ২৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, কাজ খুঁজছে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ, কাজে নিয়োজিত ৩৭ দশমিক ২১ শতাংশ, গৃহস্থালী কাজে ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ, নিজের বাড়ি আছে ৮০ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

* গৃহ: নিজের বাড়ি আছে ৮০ দশমিক ৭৯ শতাংশ, ভাড়া বাসায় ১৪ দশমিক ৩২ শতাংশ।

* বিদ্যুৎ: দেশে ৯৯ দশমিক ২৪ শতাংশ পরিবারে বিদ্যুৎ সুবিধা আছে।

* প্রবাসী আয়: দেশে প্রবাসী আয় আসে ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ পল্লীতে এবং ৭ দশমিক ৫১ শতাংশ শহরে।

* মোবাইল, ইন্টারনেট : দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ, আর ইন্টারনেট ব্যবহার করেন ৩৭ শতাংশ মানুষ।

২০১১ সালের জনশুমারিতে গড় জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৩৭। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৯ জন। ২০১১ সালের শেষ জনশুমারিতে যা ছিল ৯৭৬ জন। স্বাক্ষরতার হার বেড়ে হয়েছে ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগের শুমারিতে ছিল ৫১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বে মুঠোফোন ব্যবহারকারী এখন ৫৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৩০ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

দেশে এখন মোট খানার সংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ। আগের শুমারিতে ছিল ৩ কোটি ২১ লাখ। মানে খানার সংখ্যা বাড়ছে। খানার আকার এখন চার সদস্যের। আগে যা ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যায় দেখা গেছে, মুসলমান ৯১ শতাংশ। সনাতন ধর্মাবলম্বী ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে হিন্দু ছিল ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিল শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। আগের শুমারিতে ছিল শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ। আর জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের অধীন পপুলেশন ডিভিশনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির গতি ছিল নিম্নমুখী। কিন্তু এর পর থেকে তা আবারো বাড়তে শুরু করেছে। ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা ২০২১ সালের মধ্যে দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু পরের বছরই তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে।

২০২৩ সালে তা আরো বেড়ে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হয়েছে। ২০২৪ সালে এর প্রাক্কলিত হার ১ দশমিক ২২ শতাংশ। আর বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুই শুমারির মধ্যকার সময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির গড় বার্ষিক হার ছিল ১ দশমিক ১২ শতাংশ। সে অনুযায়ী, বর্তমানে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দুই শুমারির মধ্যকার সময়ের গড় হারকেও ছাড়িয়ে গেছে।দেশে এখন পুরুষের চেয়ে নারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। ২০২৩ সাল শেষে দেশে নারীর সংখ্যা ছিল পুরুষের তুলনায় ৩২ লাখ ২০ হাজার বেশি। বর্তমানে এ ব্যবধান ৪০ লাখের কাছাকাছি বলে অনুমান করা হচ্ছে।

দেশে এখন পুরুষের চেয়ে নারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। ২০২৩ সাল শেষে দেশে নারীর সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার। আর পুরুষের সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার। সে অনুযায়ী ২০২৩ সাল শেষে দেশে নারীর সংখ্যা ছিল পুরুষের তুলনায় ৩২ লাখ ২০ হাজার বেশি। বর্তমানে নারী ও পুরুষের সংখ্যা কত সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ না হলেও বিভিন্ন গাণিতিক মডেল পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ব্যবধান আরো বেড়েছে। অনুমান করা হচ্ছে এ ব্যবধান ৪০ লাখের কাছাকাছি।

কর্মক্ষেত্রে সমান দক্ষতা ও মেধার পরিচয় রেখে চলেছেন বাংলাদেশের নারী ও পুরুষরা। যদিও বাংলাদেশে অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা যায়নি এখনো
আর পরিসংখ্যানের ইংরেজি 'Statistics' শব্দটি খুব সম্ভবত ল্যাটিন শব্দ statisticum collegium, ইতালীয় শব্দ statista বা জার্মান শব্দ statistik হতে উৎপত্তি হয়েছে। 'Statuss' এবং 'Statistik' শব্দের অর্থ রাষ্ট্র আর 'Statista' শব্দের অর্থ রাষ্ট্রের কার্যাবলী। এ থেকে বুঝা যায় যে রাষ্ট্রের কাজ পরিচালনা থেকেই পরিসংখ্যানের উৎপত্তি হয়েছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন তথ্য যেমন - লোকসংখ্যা, রাজ্যবসের পরিমাণ, জন্মমৃত্যু প্রভৃতি হিসাবের জন্য এটি ব্যবহৃত হত।

বাংলায় ইংরেজি 'Statistics' শব্দের প্রধানত দুইটি পরিভাষা রয়েছে। ভারতে পরিসংখ্যানের জনক বলে খ্যাত প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ ইংরেজি 'Statistics' এর বাংলা করেন ‘রাশিবিজ্ঞান’। অন্যদিকে বাংলাদেশে পরিসংখ্যানের জনক কাজী মোতাহার হোসেন ইংরেজি 'Statistics' এর পরিভাষা হিসেবে বাংলায় ‘পরিসংখ্যান’ নামে একটি নতুন শব্দ সৃষ্টি করেন। ২০১০ সালে প্রকাশিত তালিকায় আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান সংস্থা ‘পরিসংখ্যান’ শব্দটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

পরিসংখ্যানের বৈশিষ্ট্য

* পরিসংখ্যানে সংখ্যাসূচক প্রকাশ আবশ্যক।

* পরিসংখ্যানে হচ্ছে তথ্যের সমষ্টি।

* পরিসংখ্যানের অনুসন্ধান কোন একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের সাথে সম্পর্কিত হতে হবে।

* পরিসংখ্যান তথ্য বহুবিধ কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয়।

* পরিসংখ্যান তথ্য সু-শৃঙ্খলভাবে সংগ্রহ করতে হবে।

* পরিসংখ্যান তুলনাযোগ্য ও সমজাতীয় হতে হবে।

* পরিসংখ্যান প্রাক্কলনে যুক্তি-সঙ্গত ও পরিমাণে সঠিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

পরিসংখ্যানের গুরুত্ব

প্রাচীণ কালে পরিসংখ্যানের ব্যবহার কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় কার্যাদি পরিচালনার মধ্যে সীমিত থাকলেও বর্তমানে এর ব্যবহার মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিস্তৃত। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি পরিসংখ্যানের বিভিন্ন কলা- কৌশলকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহারের দ্বার উন্মোচন করেছে। পরিসংখ্যান আধুনিক মানব সভ্যতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিরুপ ভূমিকা পালন করছে, তা নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ

* মানব কল্যাণে পরিসংখ্যান

* প্রাতিষ্ঠানিক নীতি নির্ধারণে

* পূর্বাভাস প্রদানে

* জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ ও মূল্যায়নে

* রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্রে

* সামাজিক গবেষণায়

* ব্যবসা-বাণিজ্যে

* অর্থনৈতিক গবেষণায়

* রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়নে

* বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় বিভিন্ন চলকের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক নির্ণয়

* অতীত জ্ঞান অভিজ্ঞতা সংরক্ষণে।

* রাষ্ট্রের কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে।

আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। তাদের উচিত হবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক ও নেতিবাচক অর্জনগুলো নির্মোহভাবে জাতির সামনে তুলে ধরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো উপরের মহলের দ্বারা নির্দেশিত হয়ে পরিসংখ্যান কমিয়ে বা বাড়িয়ে দেখিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আগামী দিনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করবে, এটাই প্রত্যাশিত। এজন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এখানে দক্ষ লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। তারা যাতে কারও দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সঠিক তথ্য-পরিসংখ্যান জাতির সামনে তুলে ধরতে পারে, তেমন অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা সঠিক তথ্য পেতে চাই, তা যেমনই হোক না কেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কখনোই সঠিক পরিকল্পনা প্রণীত হতে পারে না। আর সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা না গেলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব নয়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হয়। ফলে এসব ইস্যুতে যে পরিসংখ্যান প্রণীত হয়, একে শতভাগ সঠিক বলে মনে করা যায় না। যেমন, কালোটাকার পরিমাণ, মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে কত টাকা মূলধারার অর্থনীতিতে প্রবিষ্ট করানো হচ্ছে অথবা আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমির পরিমাণ কত-এসব বিষয়ে সঠিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ যারা অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, তারা কখনোই কারও কাছে তাদের অর্থের পরিমাণ এবং আয়ের সূত্রগুলো প্রকাশ করে না। এসব অর্থের হিসাব সংরক্ষণের মতো কোনো কর্তৃপক্ষও নেই। কাজেই কেউই এসব ইস্যুতে একেবারে সঠিক পরিসংখ্যান প্রদান করতে পারবে না। তবে বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে কিছুটা অনুমান করা যায় সমস্যার গভীরতা কতটা।

একটি দেশ থেকে প্রতিবছর কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে এর সঠিক তথ্য আমরা সরাসরি পাই না। তবে নানা সোর্স থেকে কিছুটা হলেও অনুমান করা যেতে পারে মাত্র। অর্থ পাচার, মানি লন্ডারিং বা কালো টাকা যেহেতু অনৈতিক কাজ, তাই মানুষ চেষ্টা করে কীভাবে এগুলো গোপন রাখা যায়। কারও কাছে যেন প্রকাশ না পায়। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হচ্ছে বলে কোনো কোনো সংস্থা থেকে বলা হচ্ছে। পণ্য আমদানিকালে ওভার ইনভয়েসিং এবং পণ্য রপ্তানিকালে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। এর সঠিক পরিমাণ কেউই বলতে পারবে না। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য যাচাই করে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে প্রতিবছর কী পরিমাণ অর্থ আমদানি ব্যয়ের আড়ালে পাচার হচ্ছে এবং কী পরিমাণ অর্থ রপ্তানির আড়ালে বিদেশে যাচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। পাচারকৃত এ অর্থের পরিমাণ বেশি-কম হতে পারে। তবে এর মাধ্যমে আমরা সমস্যার গভীরতা অনুমান করতে পারি। বিশ্বব্যাংকের সাবেক এক প্রেসিডেন্ট বলেছেন, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী যে মানি লন্ডারিং হয়, তার পরিমাণ বিশ্ব জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশ, টাকার অংকে যার পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ লাখ কোটি মার্কিন ডলার। এ পরিসংখ্যান শতভাগ নিশ্চিত, এটা বলা যাবে না। তবে এর মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের ভয়াবহতা অনুমান করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশে পরিসংখ্যানের গুরুত্বের সহায়ক স্বরূপ ২৭ ফেব্রুয়ারিসমগ্র বাংলাদেশে একযোগে "পরিসংখ্যান ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্মার্ট বাংলাদেশ গঠন" শ্লোগানকে সামনে রেখে ৫ম বারের মত পালিত হচ্ছে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস। “পরিসংখ্যান আইন-২০১৩” এর বদৌলতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপর অর্পিত অফিসিয়াল পরিসংখ্যান প্রণয়নের দায়িত্ব আরো বেশি গুরুত্ব পায়। সঠিক পরিসংখ্যান একটি দেশের উন্নয়ন ও পরিকল্পনাকে ত্বরান্বিত করে। সঠিক ও মান সম্পন্ন পরিসংখ্যান ব্যতীত দেশের উন্নয়নকল্পে গৃহীত পরিকল্পনা ফলপ্রসু করা সম্ভব নয়। বিবিএস প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ০৬ (ছয়) টি জনশুমারি, ০৪ (চার) টি কৃষিশুমারি, ০৩ (তিন) টি অর্থনৈতিক শুমারি, ০১ (এক) টি তাঁতশুমারি ও বিভিন্ন জরিপকার্যক্রম সম্পাদন করে আসছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের ১ম ডিজিটাল শুমারি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২২ খ্রিস্টাব্দে অত্যন্ত সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছে। “জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২” এর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় “Computer Assisted Personal Interviewing (CAPI)” পদ্ধতিতে, যার মাধ্যমে সঠিক, সময়োচিত ও বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান প্রদানে বিবিএস আরো একধাপ এগিয়ে গিয়েছে। ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের দ্বারা মাঠ পর্যায় হতে সংগ্রহীত গুনগত পরিসংখ্যান খুবই অল্প সময়ের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রধান ভূমিকা রাখতে প্রদান করা হয়েছে। সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি)-২০১৫ অর্জনে বিবিএস ইতোমধ্যে তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

তারই ধারাবাহিকতায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ অর্জনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ (এসআইডি) সরকারকে এসডিজি’র ২৩২ টি সূচকের মধ্যে ১৫৬টি সূচক এর তথ্য সরবারহ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সঠিক, সময়োচিত ও বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান প্রদানে ইতোপূর্বে কাজ শুরু করে দিয়েছে এর সাথে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি। ভবিষ্যতে বিবিএস মানসম্মত নিখুঁত পরিসংখ্যান প্রণয়ন করে উন্নয়নে ও অগ্রগতিতে অধিকতর ভূমিকা রাখবে। তাই জাতীয় পরিসংখ্যান দিবসে বাংলাদেশের উচিত আগামীর দেশ গঠন ও দেশের অর্থনীতি বাস্তবায়নে পরিসংখ্যানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণে জোর দেওয়ার অঙ্গীকার করা।

লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।