ঢাকা, শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

কাঁকড়া আহরণে সুন্দরবনে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি

২০২৬ জানুয়ারি ০২ ১৬:২৪:২০
কাঁকড়া আহরণে সুন্দরবনে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা :সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও কাঁকড়ার প্রজনন নিশ্চিত করতে দুই মাসের জন্য কাঁকড়া আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। পহেলা জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরার ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই জেলেদের কাঁকড়া ধরার পাস (অনুমতিপত্র) বন্ধ রাখা হয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব দুই বিভাগে এ নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। সুন্দরবনের জলভাগে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি ও ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া আছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এ দুই মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম হওয়ায় ৫৯ দিনের জন্য জেলেদের সুন্দরবনে প্রবেশ করে কাঁকড়া ধরার অনুমতি বন্ধ রাখে বন বিভাগ।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর এই সময়টিতে সুন্দরবনের কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম শুরু হয়। এ সময় নির্বিচারে কাঁকড়া আহরণ অব্যাহত থাকলে কাঁকড়ার স্বাভাবিক বংশবিস্তার ব্যাহত হয়, যা ভবিষ্যতে এ সম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বনজ সম্পদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে কাঁকড়া ধরা, সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। এ সময় আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে বন আইন অনুযায়ী জরিমানা ও কারাদণ্ডসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কাঁকড়া ব্যবসায়ী মমিনুর ইসলামের দাবি, শ্যামনগর থেকে গড়ে প্রতিদিন অন্তত ৫০ লাখ টাকার কাঁকড়া ঢাকায় পাঠানো হয়। আর বিদেশে রপ্তানি করা কাঁকড়ার অনেকটাই সুন্দরবন থেকে ধরা হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি, এ দুই মাসে রপ্তানি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ফলে এর সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার মানুষ এ সময় বেকার হয়ে পড়েন।

পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতায় বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী ও কোবাদক ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন ২ হাজার ৯০০টি নৌকার সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতিপত্র আছে। এর মধ্যে কাঁকড়া ধরার নৌকার সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতিপত্র আছে ১ হাজার ৬০০টি।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগরে নিবন্ধিত জেলে আছেন প্রায় ২৮ হাজার। যার অর্ধেকেরও বেশি কাঁকড়া ধরার জেলে।

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার ইসমাইল হোসেন, সাইফুল ইসলামসহ জেলে ও কাঁকড়া আহরণকারীরা জানান, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তারা অবগত আছেন এবং বন বিভাগের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন। তবে নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তাদের জীবিকায় সাময়িক সংকট দেখা দিতে পারে বলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও কাঁকড়ার প্রাকৃতিক উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাঁকড়া আহরণ বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বনবিভাগের টহল জোরদার করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে টহল জোরদার করা হবে।

পরিবেশবাদীলেখক, গবেষক পীযুষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, সুন্দরবনের কাঁকড়া শুধু অর্থনৈতিক সম্পদই নয়, এটি বনাঞ্চলের খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কাঁকড়ার উৎপাদন বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে জেলেদেরই লাভ হবে।

(আরকে/এএস/জানুয়ারি ০২, ২০২৬)