ঢাকা, রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

আন্তর্জাতিক জুলুমের এক মহাকাব্য

২০২৬ জানুয়ারি ০৪ ১৭:২১:২৯
আন্তর্জাতিক জুলুমের এক মহাকাব্য

মীর আব্দুল আলীম


গোল্ডেন জেইল ও আধিপত্যের রাজনীতি একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে যে কয়টি শব্দ সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে ‘সার্বভৌমত্ব’ এবং ‘গণতন্ত্র’ অন্যতম। কিন্তু এই শব্দগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক বীভৎস সত্য—সম্পদ লুণ্ঠনের আকাঙ্ক্ষা। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা আজ সেই আকাঙ্ক্ষারই এক জীবন্ত বলী। যখন কোনো দেশের মাটির নিচে থাকা সম্পদ সেই দেশের মানুষের আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে সেই দেশের ওপর কোনো পরাশক্তির শকুনি দৃষ্টি পড়েছে। ভেনেজুয়েলার খনিজ সম্পদ তথা তেল ও সোনা দখল করতে আমেরিকার যে অস্থিরতা এবং দেশটির বৈধ সরকারকে উৎখাত করার যে মরিয়া প্রচেষ্টা, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী কলঙ্ক। এটি কেবল রাজনৈতিক সংঘাত নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক জুলুম।

ভেনেজুয়েলা কোনো সাধারণ দেশ নয়। এটি বিশ্বের মানচিত্রে এমন একটি দেশ যা তেলের সমুদ্রের ওপর ভাসছে। ওপেকের (ঙচঊঈ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুত সবচেয়ে বেশি ভেনেজুয়েলায়—প্রায় ৩ লক্ষ কোটি ব্যারেলেরও বেশি। এছাড়াও দেশটির আমাজন সংলগ্ন অঞ্চলে রয়েছে বিশাল সোনার খনি, হীরা এবং বিরল খনিজ পদার্থ। আমেরিকার মতো ভোগবাদী রাষ্ট্রের জন্য এই বিপুল জ্বালানি ভাণ্ডার সবসময়ই ছিল পরম আরাধ্য। বিংশ শতাব্দীতেও আমেরিকা বিভিন্ন দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সম্পদ দখল করেছে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে তারা এক কঠিন বাঁধার সম্মুখীন হয়েছে। উগো চাভেস যখন ক্ষমতায় এসে ঘোষণা করলেন যে, “ভেনেজুয়েলার তেল আগে ভেনেজুয়েলার মানুষের কাজে লাগবে,” তখনই আমেরিকার সাথে দেশটির শত্রুতার বীজ বপন করা হয়। এই জাতীয়তাবাদী চেতনাকে দমানোর জন্যই আজ আমেরিকা দেশটির প্রেসিডেন্টকে বন্দি বা ক্ষমতাচ্যুত করার হীন চক্রান্তে লিপ্ত।

আমেরিকার এই আগ্রাসনের মূল শিকড় লুকিয়ে আছে ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’-এ। এই নীতি অনুযায়ী, আমেরিকা পুরো লাতিন আমেরিকাকে নিজেদের ‘প্রভাববলয়’ বা সহজ ভাষায় ‘পেছনের উঠান’ বলে মনে করে। ভেনেজুয়েলা যখন থেকে আমেরিকার বশ্যতা স্বীকার করতে অস্বীকার করল এবং কিউবা, চীন ও রাশিয়ার সাথে মৈত্রী গড়ে তুলল, তখন থেকেই ওয়াশিংটন দেশটির ওপর চড়াও হয়েছে। আমেরিকা চায় না তার দোরগোড়ায় এমন কোনো দেশ শক্তিশালী হয়ে উঠুক যারা মার্কিন ডলার বা মার্কিন করপোরেট স্বার্থকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবে। তাই তারা কখনও সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায়, কখনও বা বিরোধীদের অর্থ দিয়ে দেশে গৃহযুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করে। এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির আত্মমর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।

ভেনেজুয়েলার বর্তমান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য পশ্চিমা মিডিয়া সবসময়ই মাদুরো সরকারকে দায়ী করে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো আমেরিকার ভয়াবহ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। একে বলা যায় ‘আধুনিক অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’। আমেরিকা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-র (চউঠঝঅ) ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যার ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করতে পারছে না। এর চেয়েও বড় জুলুম হলো, লন্ডনের ব্যাংক বা আমেরিকার ব্যাংকে রাখা ভেনেজুয়েলার কয়েক বিলিয়ন ডলারের সোনা ও নগদ অর্থ ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে। একটি সার্বভৌম দেশের সম্পদ অন্য একটি দেশ কোন অধিকারে আটকে রাখে? এর ফলে দেশটিতে খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। আমেরিকা মূলত ভেনেজুয়েলার মানুষকে অভুক্ত রেখে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে চায়। এই পদ্ধতি কেবল অমানবিক নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। এটি একটি জাতিকে তিলে তিলে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র।

আমেরিকা যখন হুয়ান গুয়াইদোকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তখন তা ছিল বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসের অন্যতম বড় রসিকতা। একজন ব্যক্তি যিনি নির্বাচনে অংশ নেননি, তাকে কেবল মার্কিন স্বার্থ রক্ষার গ্যারান্টি দেওয়ার কারণে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে দেওয়া হলো। এটি কি গণতন্ত্র? না, এটি হলো ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের পুরোনো মার্কিন ফর্মুলা। নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার হুমকি দেওয়া বা তার মাথার দাম ঘোষণা করা—এগুলো কোনো সভ্য দেশের কাজ হতে পারে না। আমেরিকা আসলে এমন একজন প্রেসিডেন্ট চায় যে ভেনেজুয়েলার তেলের খনিগুলো এক্সন মবিল বা শেভরনের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেবে। মাদুরোর অপরাধ তিনি সেই চাবিকাঠি ছাড়তে রাজি নন।

আমেরিকার এই একপাক্ষিক জুলুমের বিরুদ্ধে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন ও রাশিয়া। রাশিয়ার জন্য ভেনেজুয়েলা কেবল একটি অর্থনৈতিক অংশীদার নয়, বরং আমেরিকার প্রভাববলয়ের ভেতরে একটি শক্তিশালী সামরিক মিত্র। রাশিয়া ভেনেজুয়েলাকে উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে, যাতে আমেরিকা সরাসরি আক্রমণ করার সাহস না পায়। অন্যদিকে, চীন ভেনেজুয়েলায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। তারা ভেনেজুয়েলার তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে এবং নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটির অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করছে। চীন ও রাশিয়ার এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, পৃথিবী আর এককেন্দ্রিক নেই। ওয়াশিংটন চাইলেই এখন আর কোনো স্বাধীন দেশের সরকারকে নিমেষেই উপড়ে ফেলতে পারে না। এই দুই শক্তির সমর্থন ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব রক্ষার শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমেরিকা তার সামরিক শক্তি ছাড়াও আর একটি বড় শক্তি ব্যবহার করে—তা হলো তার বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য। কোকা-কোলা থেকে শুরু করে টেক জায়ান্টগুলো সারা বিশ্বের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। যখন কোনো দেশ এই ধরনের আন্তর্জাতিক জুলুম চালায়, তখন সেই দেশের পণ্য ও সেবা বর্জন করা একটি নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। আমেরিকান দ্রব্য বর্জন করা মানে হলো তাদের যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর আঘাত হানা। ডলারের একক আধিপত্য কমানোর জন্য ব্রিকস (ইজওঈঝ) দেশগুলোর মতো ভেনেজুয়েলাও বিকল্প মুদ্রার কথা ভাবছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ মানুষের উচিত এই প্রতিবাদে শামিল হওয়া। আমরা যদি সাম্রাজ্যবাদীদের পণ্য কিনে তাদের কোষাগার সমৃদ্ধ করি, তবে সেই টাকা দিয়েই তারা আবার ভেনেজুয়েলা বা ফিলিস্তিনের মতো দেশে আগ্রাসন চালাবে।

ভেনেজুয়েলার এই সংগ্রাম কেবল তাদের নিজস্ব লড়াই নয়। এটি বিশ্বের প্রতিটি খনিজ সমৃদ্ধ দেশের জন্য একটি শিক্ষা। আজ যা ভেনেজুয়েলার সাথে ঘটছে, কাল তা ইরান, লিবিয়া বা এমনকি এশিয়ার যেকোনো দেশের সাথে ঘটতে পারে। আমেরিকা তার জ্বালানি ক্ষুধা মেটাতে যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারে। এজন্য গ্লোবাল সাউথ বা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ভেনেজুয়েলা দেখিয়েছে যে, চরম দারিদ্র্য ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কীভাবে একটি জাতি মাথা নত না করে টিকে থাকতে পারে। তাদের এই লড়াই নব্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক মহাকাব্যিক প্রতিরোধ।

জাতিসংঘ আজ ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। আমেরিকার ভেটো পাওয়ার এবং আর্থিক প্রভাবের কারণে সংস্থাটি ভেনেজুয়েলার ওপর হওয়া এই অবিচারের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। মানবাধিকারের প্রবক্তা দাবি করা দেশগুলো যখন ভেনেজুয়েলার ওপর অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করে, তখন তাদের দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বিচারিক ব্যবস্থাকে আজ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে ওয়াশিংটন। একটি দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য সে দেশের প্রেসিডেন্টকে বন্দি করার এই ঘৃণিত আকাঙ্ক্ষা যদি বিশ্ববাসী আজ মুখ বুজে সহ্য করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।

জয় হবে মানুষেরই ভেনেজুয়েলা আজ বিশ্ব বিবেকের কাছে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। তেলের জন্য রক্তপাত আর কতকাল চলবে? সাম্রাজ্যবাদের এই বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো বৈশ্বিক সংহতি। চীন ও রাশিয়ার সমর্থন এবং বিশ্বের সচেতন মানুষের প্রতিবাদী অবস্থানই পারে আমেরিকার এই জুলুম রুখে দিতে। ভেনেজুয়েলার মানুষ তাদের সম্পদের মালিকানা রক্ষা করবেই। আমেরিকার এই ঘৃণিত ষড়যন্ত্র ধূলিসাৎ করে দিয়ে লাতিন আমেরিকার এই মুক্তিকামী দেশ আবার জেগে উঠবে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, শোষক যত শক্তিশালীই হোক, শেষ পর্যন্ত শোষিতের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের কাছে তাকে হার মানতেই হয়। আমেরিকান দ্রব্য বর্জন এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে আমাদের ঘৃণা প্রকাশের এখনই সময়।।

লেখক: সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।