প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
ডুবোচর ও নাব্যতা সংকটে ঝুঁকিতে ঢাকা-বরিশাল নৌরুট
২০২৬ জানুয়ারি ০৪ ১৯:৪০:৪২
আঞ্চলিক প্রতিনিধি, বরিশাল : ঘন কুয়াশা, ডুবোচর ও নাব্যতা সংকটে চরম ঝুঁকিতে পরেছে ঢাকা-বরিশাল নৌরুট। এসব বিপজ্জনক নৌপথেই প্রতিদিন যাত্রী ও পণ্যবাহী হাজারো নৌযান চলাচল করছে। শীতে দক্ষিণাঞ্চলের ৩১টি নৌপথের মধ্যে ২২টিতে পানির গভীরতা কমে গেছে। তার ওপর দীর্ঘ এই নৌপথের অসংখ্যস্থানে নেই সংকেতবাতি, ভাসমান বয়া ও মার্কার। ফলে ঘণ কুয়াশায় রাতের বেলা ঝুঁকি নিয়ে নৌযান চালাতে হচ্ছে চালকদের। ফলে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘটছে প্রাণহানি।
সূত্রমতে, চলতি শীত মৌসুমে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে ঘণ কুয়াশায় মেঘনা নদীতে একাধিক লঞ্চের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে গত ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত দুইটার দিকে চাঁদপুরের হাইমচরবর্তী নীলকমল বাংলাবাজার এলাকার মেঘনা নদীতে ঢাকাগামী এমভি জাকির সম্রাট-৩ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চের সাথে বরিশালের ঝালকাঠিগামী অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চের সংঘর্ষ হয়। এতে চারজন নিহত ও ১৫ জন আহত হন।
সূত্রে আরও জানা গেছে, একইরাতে রাজধানীর সদরঘাট থেকে ইমাম হাসান-৫ নামের একটি লঞ্চ প্রায় পাঁচ শতাধিক যাত্রী নিয়ে চাঁদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। রাত আনুমানিক ১২টার দিকে লঞ্চটি মেঘনা নদীর মতলব উত্তর উপজেলার মোহনপুর এলাকায় পৌঁছলে নোঙর করা একটি বালুবাহী বাল্কহেডের সাথে স্বজোরে ধাক্কা লাগে। সংঘর্ষের সময় বিকট শব্দে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে। পরেরদিন মেঘনায় নিমজ্জিত বাল্কহেডের মধ্যথেকে ডুবুরিরা দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন।
সদর ঘাট নৌ-পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন ছোট-বড় ১৪টি নৌযানের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর কয়েকদিন আগে একই নৌপথে ঘণ কুয়াশার কারণে বরিশালগামী যাত্রীবাহি এম. খান-৭ লঞ্চের সাথে ঈগল-৪ লঞ্চের সংঘর্ষ হলে দুটি লঞ্চই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঘণ কুয়াশার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের নদীপথে সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছিলো ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে। ওইদিন ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। ঘণ কুয়াশায় লঞ্চটি তীরে ভেড়াতে না পেরে মাঝনদীতে চালকবিহীন ভাসছিল। এতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৪৭ জনের মৃত্যু ও ৩১ জন নিখোঁজের পাশাপাশি অসংখ্য ব্যক্তি গুরুত্বর আহত হয়েছিলেন।
লঞ্চযাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বরিশাল নৌযাত্রী ঐক্য পরিষদের আহবায়ক দেওয়ান আবদুর রশিদ বলেন, রাত্রিকালীন জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নদীর অববাহিকা, বাঁক, ডুবোচর ও চর এলাকায় বয়া, সংকেতবাতি ও মার্কার থাকার কথা। কিন্তু যুগ যুগ ধরে এ নিয়ে তুঘলকি কান্ড চলছে। নিয়মিত সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ থাকলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।
ঢাকা-বরিশাল নৌপথে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পণ্যবাহী জাহাজ চালকরা জানিয়েছেন-প্রতিবছর শীত মৌসুমে নদরী নাব্যতা সংকটের পাশাপাশি ঘণ কুয়াশা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। রাতে ডুবন্ত বাল্কহেডের কারণে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কুয়াশার মধ্যে ভাসমান বয়া, বিকন বাতি ও মার্কারের অভাব চালকদের বিপাকে পরতে হচ্ছে। যেকারণে নৌযানগুলো চরে আটকা পরে দুর্ঘটনা ঘটছে।
লঞ্চের মাস্টার ও চালকরা জানিয়েছেন-ঢাকা থেকে বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, আমতলী, মেহেন্দীগঞ্জ, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, বোরহানউদ্দিন, চরফ্যাশন, বাউফল, ভান্ডারিয়া, হিজলা, মুলাদীসহ বিভিন্ন নৌপথের অসংখ্যস্থানে ডুবোচর ও নাব্যতা সংকট রয়েছে। যা শীত মৌসুমে আরও তীব্রতর হচ্ছে। তাছাড়া অনেকস্থানে বয়া থাকলেও তাতে সংকেতবাতি জ্বলে না।
তারা আরও জানিয়েছেন, গত ১ নভেম্বর রাতে দুই শতাধিক যাত্রী নিয়ে চাঁদপুর থেকে ছেড়ে আসা বোগদাদিয়া-৭ লঞ্চ মেঘনা নদীর একটি ডুবোচরে আটকা পরে। এর আগে ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার মগড় এলাকায় সুগন্ধা নদীতে এমভি অথৈ-১ লঞ্চ এক সপ্তাহ ধরে ডুবোচরে আটকে ছিল।
ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী এমভি মানামী লঞ্চের পরিদর্শক বেলাল হোসেন বলেন, শীত মৌসুমে পানি কমে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এবার শীত শুরুর আগেই পানি কমে গেছে। আগে নভেম্বর মাসে লঞ্চ ডুবোচরে আটকাতো, এবার অক্টোবরেই আটকাতে শুরু করেছে।
অপরদিকে নদীর নাব্যতা সংকট এবং নদীর বুকে জেগে ওঠা চর ও ডুবোচরের কারণে বরিশালের মীরগঞ্জ-মুলাদী ফেরি চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত চ্যানেল ব্যবহার করতে না পেরে বিকল্প ও দীর্ঘপথ ঘুরে ফেরি চলাচল করায় জ্বালানি খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী নবনীতা বিশ্বাস বলেন, হিজলা এলাকার নাব্যতা সংকট নিরসনে কাজ চলছে। নদীর বিষয়ে হাইড্রোলজি বিভাগের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক (নৌপথ) মো. আব্দুস সালাম বলেন, চাঁদপুর ও বরিশাল বিভাগের প্রয়োজনীয় স্থানে বয়া, মার্কার ও সংকেতবাতি স্থাপনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব সমস্যা খুব দ্রুত সমাধান হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
(টিবি/এসপি/জানুয়ারি ০৪, ২০২৬)
