ঢাকা, রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

প্রেমিকার বাড়িতে চোর অপবাদ দিয়ে নির্যাতন, ববি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার    

২০২৬ জানুয়ারি ০৪ ১৯:৪৪:৩৬
প্রেমিকার বাড়িতে চোর অপবাদ দিয়ে নির্যাতন, ববি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার    

তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : ভালোবাসার মানুষকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে 'চোর' অপবাদ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ বৈরাগী।

মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি তার এই চরম সিদ্ধান্তের পেছনে প্রেমিকার পরিবারের নির্যাতন ও সামাজিক অপমানকে দায়ী করে গেছেন। ১ জানুয়ারি শুভ লেখাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন। পরে আত্মহননের পথ বেছে নেন তিনি।

আজ রবিবার সকালের দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলী আশ্রয়ণ কেন্দ্রের নিজ ঘর থেকে ওই শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলী পুলিশ ইনচার্জ পরিদর্শক মোল্লা আফজাল হোসেন ওই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানিয়ে বলেন, আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে আত্মহত্যা করেছে। ১/২ দিন আগে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে । শীতের কারণে মরদেহে পচন ধরেনি। মরদেহ শক্ত হয়ে গেছে।মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য গোপালগঞ্জ আড়াই শ’ বেড জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।ময়না তদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

শুভ বৈরাগী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বৌলতলী গ্রামের প্রয়াত সুখলাল বৈরাগী ও শেফালী বৈরাগী দম্পতির ছেলে। শৈশবেই বাবা-মাকে হারানো শুভ তার বোন -ভগ্নিপতি ও মামাবাড়িতে বেড়ে উঠে । ৩ বছর আগে বৌলতলী আশ্রয়ণ প্রকল্পে শুভ একটি ঘর বরাদ্দ পায়। মাঝে-মধ্যে গ্রামে আসলে তিনি মামা বাড়ি বা আশ্রয়ণ কেন্দ্রের ওই ঘরে থাকত।

শুভ বৈরাগীর ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যায়, কোটালীপাড়া উপজেলার কাফুলাবাড়ি গ্রামের এক তরুণীর সাথে শুভর দীর্ঘ ২ বছরের বেশি সময় ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে ওই তরুণীর জন্মদিন উপলক্ষে তাকে সরাসরি শুভেচ্ছা জানাতে তাদের বাড়িতে যান শুভ। সেখানে তরুণীর পরিবারের সদস্যরা তাকে আটকে ব্যাপক মারধর ও রক্তাক্ত করে।

শুভর অভিযোগ অনুযায়ী, সম্পর্কের কথা স্বীকার করার পরেও তরুণীর জ্যাঠা ও পরিবারের সদস্যরা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক একটি 'মিথ্যা ভিডিও' ধারণ করে। সেখানে তাকে দিয়ে স্বীকার করানো হয় যে, তিনি ওই বাড়িতে 'চুরি' করতে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এই চুরির অপবাদ শুভর এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে শুভ লিখেছেন, "তারা সত্যকে আড়াল করে আমাকে মিথ্যা চোর অপবাদ দিয়ে সকলের কাছে দোষী করেছে। এতে আমার মানসম্মান নষ্ট হয়েছে। আমি কারো সামনে মুখ দেখাতে পারবো না। তারা আমাকে জানে মারার চেয়েও বেশি মেরে ফেলেছে।"

আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় প্রেমিকার পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, টাকা আজ নেই কিন্তু কাল হতে পারতো, কিন্তু এই অপমানের পর বেঁচে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার মৃত্যুর জন্য তিনি প্রেমিকা, তার বাবা, কাকা ও জ্যাঠুকে সরাসরি দায়ী করে গেছেন।
শুভর অকাল প্রয়াণে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহপাঠীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

আশ্রয়ণ কেন্দ্রর প্রতিবেশি অনিল বিশ্বাস জানান, ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর শুভ আমার বাই সাইকেল নিয়ে কাফুলা বাড়ির দিকে যেতে চায়। আমি বলি রাতে সাইকেল চালিয়ে গেল দুর্ঘটনা ঘটতে পারে । সে বলে দুর্ঘটনা ঘটবে না। এই বলে আমার সাইকেল নিয়ে চলে যায়। আমি সকাল ৮ পর্যন্ত দেখি শুভ ফেরেনি। পরে জমিতে কাজ করতে যাই। বিকেল ৪ টার দিকে এসে দেখি শুভ বারান্দায় সাইকেলে তালা দিয়ে রেখেছে। চাবি জানালা দিয়ে আমার ঘরে ছুরে ফেলে রেখেছে। সে এরক মাঝে মাঝে আসত আবার চলে যেত। আমি মনে করেছি, সে বরিশাল চলে গেছে। আজ তার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে । এ মেধাবী শিক্ষার্থীর এ আত্মহত্যার ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।

(টিবি/এসপি/জানুয়ারি ০৪, ২০২৬)