ঢাকা, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

বড় ময়দানে সেনাবাহিনী বেস্টিত কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণের প্রতিবাদে উত্তপ্ত দিনাজপুর

২০২৬ জানুয়ারি ০৬ ১৯:৪৭:৪১
বড় ময়দানে সেনাবাহিনী বেস্টিত কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণের প্রতিবাদে উত্তপ্ত দিনাজপুর

শাহ্‌ আলম শাহী, দিনাজপুর : দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে সেনাবাহিনী বেস্টিত কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণের ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে দিনাজপুরের ক্রীড়া অঙ্গন। কাঁটা তারের বেড়া অপসারণ করে বড় ময়দান উম্মুক্ত ক্রীড়া অঙ্গন করার দাবিতে খেলোয়াড়, সংগঠক ও ক্রীড়াবিদদের আন্দোলনে উত্তপ্ত এখন দিনাজপুর।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াবিদরা আন্দোলনে মাঠে নামে। দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনের সড়ক অবরোধের মাধ্যমে শহরের সঙ্গে বাণিজ্যিক এলাকা পুলহাটের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। সড়কের দু'ধারে আটক পড়ে অসংখ্য যানবাহন। মাথায় কাফনের সাদা কাপড় বেধে ব্যানার,ফ্যাস্টুন প্লেকার্ড নিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও বিভিন্ন শ্লোগান দেয় আন্দোলনকারিরা।

এ সময় ক্রীড়া সংগঠক ও দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম নবী দুলাল, দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র ও সাবেক ক্রিকেটার এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি’র কাউন্সিলর রেহাতুল ইসলাম খোকা, ক্রীড়া সংগঠক সৈয়দ আজাদুর রহমান বিপু,আরিফসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন।

বক্তরা দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে সেনাবাহিনী বেস্টিত কাঁটা তারের বেড়া অপসারণ করে বড় ময়দান উম্মুক্ত ক্রীড়া অঙ্গন করা না হলে লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণা দেন।
বক্তারা বলেন, 'দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান শুধু দিনাজপুরের নয়, দেশের ঐতিহ্য, খ্যাতি ও সম্মান বহন করে আসছে। এই মাঠে খেলা শিখে ও অনুশীলন করে আজ দেশের ক্রীড়া অঙ্গনে বড় বড় তারকা খেলোয়াড় অনেকেই। যারা দেশের সম্মান ও অর্জন বয়ে এনে বিশ্বে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানের ঈদগাহ্‌ মাঠ শুধু দেশের নয়, উপমহাদেশে সবচেয়ে বড় ঈদগাহ ময়দান। যে ঈদের জামাতে অংশ নেয় লাখো লাখো মুসল্লী। এ মাঠে সমাবেশ ও জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন, দেশ-বিদেশের অনেক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্র প্রধান, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও গুণিজন। এ মাঠে হয়েছে অনেক সুখ্যাত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনেক বড় বড় তারকা অংশ নিয়েছেন এসব অনুষ্ঠানে। আজ এই মাঠ কাঁটা তারের বেড়ায় বেষ্টিত। এর মাধ্যমে শুধু প্রতিবন্ধকতা নয়,দিনাজপুরের ক্রীড়া, শিল্প-সাংস্কৃতি, রাজনীতি ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা তা কখনো মেনে নিতে পারিনা। মেনে নিবোনা। অবিলম্বে কাঁটা তারের বেড়া অপসারণ করে বড় ময়দান উম্মুক্ত ক্রীড়া অঙ্গন করা না হলে লাগাতার আন্দোলন চলবে। দিনাজপুর অচল হয়ে যাবে। এজন্য প্রশাসনকে দায়-দায়িত্ব নিতে হবে।'

দুপুর একটা থেকে খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াবিদরা দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনের সড়ক অবরোধের মাধ্যমে শহরের সঙ্গে বাণিজ্যিক এলাকা পুলহাটের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। সড়কের দু'ধারে আটক পড়ে অসংখ্য যানবাহন। মাথায় কাফনের সাদা কাপড় বেধে ব্যানার,ফ্যাস্টুন প্লেকার্ড নিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও বিভিন্ন শ্লোগান দেয় আন্দোলনকারিরা। বিকেল সাড়ে ৩ টা পর্যন্ত আড়াই ঘন্টাব্যাপি চলে আন্দোলন।

আন্দোলন চলাকালিন সময় জেলা প্রশাসক আশ্বাস দেয়,বিষয়টি বিবেচনা করার। ফলে আগামীকাল বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুর ২ টা পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে সেনাবাহিনী বেস্টিত কাঁটা তারের বেড়া সরিয়ে নেয়া না হলে দুপুর ২ টা থেকে আবারো লাগাতার আন্দোলনে নামা হবে জানায় আন্দোলনকারিরা।

প্রসঙ্গত: দিনাজপুর গোরে-এ-শহীদ বড় ময়দান আঞ্চলিকভাবে দিনাজপুর বড় মাঠ নামে পরিচিত। এর আয়তন ৭৮ একর। এটি দিনাজপুরের প্রাণনাথপুর ও খামার ঝাড়বাড়ী মৌজায় অবস্থিত। দিনাজপুর গোরে-এ-শহীদ ময়দানের পূর্ব পার্শ্বে দিনাজপুর শহরের জিরো পয়েন্ট অবস্থিত। ইংরেজ আমলে এ মাঠে ঘৌড় দৌড় অনুষ্ঠিত হত এবং পাকিস্তান আমলে নর নারায়ণ শীল্ড ফুটবল প্রতিযোগিতা হত। ১৯৬২ সালে এ মাঠে হেলিকপ্টার আবতরণের জন্য হেলিপোর্ট নির্মিত হয়।

দিনাজপুর শহরের মধ্যভাগে অবস্থিত এ ময়দানে আগেও ছোট পরিসরে ঈদের নামাজ আদায় করা হতো। কিন্তু ২০১৭ সালে এখানে সংস্কারকাজ, বিশাল ইমারত স্থাপনা নির্মাণসহ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। এর পর থেকে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রতিবছর দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, জয়পুরহাটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করতে আসেন এই মাঠে।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে ছোট পরিসরে এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। ২০১৫ সালে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ঈদগাহ মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হয়। এর পর থেকে ঈদের জামাতে লোকসমাগম বেড়েছে কয়েক গুণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জেলায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে মিনারটি।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গোর-এ-শহীদ ময়দানে স্থাপিত ঈদগাহের মিনারটি তৈরি করা হয়েছে মোগল স্থাপত্যরীতিতে। এর অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে ছিল দিনাজপুর জেলা প্রশাসন। নির্মাণকাজে ব্যয় হয়েছিল চার কোটি টাকা। সবুজ ঘাসে মোড়ানো মাঠের আয়তন ২২ একর। মিম্বারের উচ্চতা ৫৫ ফুট। ৫২ গম্বুজবিশিষ্ট ঈদগাহ মিনারের দুই প্রান্তে দুটি মিনারের উচ্চতা ৬০ ফুট। মাঝের দুটির উচ্চতা ৫০ ফুট ও টাইলস করা মিম্বারের উচ্চতা ৪৭ ফুট। প্রতিটি গম্বুজে রয়েছে বৈদ্যুতিক বাতি। মসজিদে নববি, কুয়েত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের স্থাপত্যশৈলীর আদলে তৈরি করা হয়েছে মিনারগুলো।

ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ মাঠের নাম নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। জেলার কয়েকটি ইতিহাসগ্রন্থ থেকে জানা যায়, এ মাঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উত্তর ফ্রন্টের সমাবেশ হয়েছিল। পরে মাঠটি সেনাবাহিনীর নামে রেকর্ডভুক্ত হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পারস্য থেকে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে এসে মৃত্যুবরণ করেন শাহ আমিরউদ্দিন ঘুরি (রহ.)। পরে সময়ে মাঠসংলগ্ন স্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। আমিরউদ্দিন ঘুরি ঘোড়ায় চড়ে দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন। সে জন্য এ মাঠের নামকরণ করা হয়েছে গোর-এ-শহীদ।

গোর-এ-শহীদ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় আরেকটি জনশ্রুতি হলো, সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহের আমলে ইসলাম প্রচার নিয়ে ৪০ জন সুফি সঙ্গে ওই সময়ের এক হিন্দু রাজার যুদ্ধ হয়েছিল। সুফিদের একজন প্রাণ হারান। সেখানেই তাঁকে কবর দেওয়া হয়। ফারসিতে আরবি শব্দ কবর বলা হচ্ছে গোর। ওই সময়কার মুসলিম শাসকের ভাষা ফারসি হওয়ায় মাঠটি পরিচিতি পায় গোর-এ-শহীদ ময়দান হিসেবে।

দিনাজপুর বড় ময়দান (গোড়-এ-শহীদ) দেশের খেলোয়াড় তৈরির একটি ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র। বিশেষত ফুটবল ও ক্রিকেটের জন্য, যেখানে স্থানীয় প্রতিভারা বিকশিত হয়; যেমন – যেমন জাতীয় ক্রিকেটার অধিনায়ক লিটন কুমার দাস,ধীমান দাস,জাতীয় দলের ফুটবলার মজিবুর রহমান জনি ও অনূর্ধ্ব-১৭ দলের ফাহিম এবং বিকেএসপি দিনাজপুর থেকে উঠে আসা বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটার আকবর আলী এর মতো তারকারা এখান থেকে উঠে এসেছেন, যা এই মাঠকে ‘খেলোয়াড় গড়ার কারিগর’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। যুব বিশ্বকাপে খেলোয়াড় আকবর আলী, হাসান মুরাদ, পারভেজ হাসান ইমন, প্রান্তিক নওরোজ নাবিল, শাহিন আলম, আশরাফুল ইসলাম সিয়াম, শামীম হোসেন পাটোয়ারী ও তানজিব হাসান সাকিবরাও এ মাঠে তৈরি।

মজিবুর রহমান জনি: দিনাজপুর থেকে জাতীয় দলের হয়ে শীর্ষ পর্যায়ে খেলা একজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার। মো: আব্দুল রিয়াদ ফাহিম অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ পেয়েছেন। জাতীয় নারী ফুটবলার সাগরিকা তন্বী, তনিমা,জয়ন্তী, কাকলীরা তৈরি এ মাঠেই।

(এসএস/এসপি/জানুয়ারি ০৬, ২০২৬)