প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
সন্তোষ গুপ্ত: অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর ও নির্ভীক কলমযোদ্ধা
২০২৬ জানুয়ারি ১০ ১৭:৩৬:০০
মানিক লাল ঘোষ
বরেণ্য সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত— এক জীবনশিল্পীর নাম। বর্তমান প্রজন্মের অনেক সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষের কাছে নামটি হয়তো কিছুটা ধোঁয়াশায় ঢাকা, কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। মাতৃভূমির এই কৃতী সন্তান সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা 'স্বাধীনতা পদক' (মরণোত্তর) এবং 'একুশে পদক'-এ ভূষিত হয়েছেন। এ ছাড়াও তিনি শেরেবাংলা পদক, বঙ্গবন্ধু পদক, মাওলানা তর্কবাগীশ পদক এবং জহুর হোসেন স্মৃতি পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন।
১৯২৫ সালের ৯ জানুয়ারি ঝালকাঠির কীর্তিপাশা ইউনিয়নের রুনসী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সন্তোষ গুপ্ত। বরেণ্য ব্যক্তিদের কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আটকে রাখা যায় না, তাঁরা দেশ ও জাতির সম্পদ। তবুও একই জেলার সন্তান হিসেবে তাঁর প্রতি আমাদের গর্বের মাত্রাটা একটু বেশি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে দেশান্তর হচ্ছিলেন, তখন তিনি কলকাতা থেকে নাড়ির টানে ফিরে এসেছিলেন প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে। মাতৃভূমির প্রতি এমন অবিচল টান আজকের প্রজন্মের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সন্তোষ গুপ্ত একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, সমালোচক এবং তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ভাষ্যকার। শিল্পকলা, রাজনীতি ও সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ১৮টি মৌলিক গ্রন্থ এবং অসংখ্য সম্পাদিত গ্রন্থ রয়েছে।
তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক
গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি 'দৈনিক আজাদ' পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য বিভাগে কর্মরত থেকে স্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সংবাদ-এ পদচারণা: স্বাধীনতার পর তিনি 'দৈনিক সংবাদ'-এ বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানে সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
১৯৭৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ‘অনিরুদ্ধের কলাম’। সহস্রাধিক কলাম ও অসংখ্য সম্পাদকীয়র মাধ্যমে তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রের অসঙ্গতিগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। বামপন্থী রাজনীতি থেকে আসা এই মানুষটি রাজনৈতিক আদর্শের কারণে একাধিকবার জেল খেটেছেন, হারিয়েছেন চাকরিও—তবুও আপস করেননি সত্যের সাথে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং ৩ নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর যখন দেশ এক ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত, তখন সন্তোষ গুপ্ত তাঁর লেখনীর মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে অবিচল অবস্থান নেন। তৎকালীন বাম রাজনীতির সংকীর্ণতা তাঁকে ব্যথিত করলেও তিনি তাঁর যৌবনের বিশ্বাস ও চেতনা থেকে বিচ্যুত হননি।
"তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িকতা ও অসত্যের বিরুদ্ধে আমৃত্যু এক আপসহীন কলমযোদ্ধা।"
২০০৪ সালের ৬ আগস্ট মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে এই মহাপ্রাণ সাংবাদিক পরলোকগমন করেন। কর্মজীবনে তিনি সততা, দায়িত্ববোধ আর দক্ষতার যে মানদণ্ড স্থাপন করে গেছেন, তা আমাদের জন্য ধ্রুবতারার মতো। তাঁর দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা আমাদের আগামীর পথ দেখাক। বরেণ্য এই গুণী ব্যক্তিত্বের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি।
