প্রচ্ছদ » কৃষি » বিস্তারিত
লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আবাদ
শীত উপেক্ষা করে নড়াইলে বোরো ধান চাষে ব্যস্ত কৃষকরা
২০২৬ জানুয়ারি ১৩ ১৮:১০:১৪
রূপক মুখার্জি, নড়াইল : নড়াইল জেলার মাঠঘাট এখন যেন একটি কর্মযজ্ঞ। কনকনে শীত, কুয়াশা আর হিমেল হাওয়াকে তোয়াক্কা না করে কৃষকরা বোরো ধান আবাদে পুরোপুরি ব্যস্ত। ভোরের শিশির ভেজা জমিতে কেউ লাঙল দিচ্ছেন, কেউ সেচ চালু করছেন, আবার কেউ বীজতলা থেকে চারা তুলে রোপণ করছেন মূল জমিতে। চলতি বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আবাদ শুরু হওয়ায় কৃষি অর্থনীতিতে নতুন আশার আলো দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত মৌসুমে ধানের বাজারদর ভালো থাকায় এবার ধানচাষে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর যেখানে প্রায় ৪৮ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল, এবার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ১৭০ হেক্টর। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার ৬৮০ হেক্টর বেশি জমিতে আবাদ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এই বাড়তি আবাদ কৃষকদের আস্থারই প্রতিফলন।
নড়াইল জেলার তিনটি উপজেলার বিলাঞ্চল ঘুরলে দেখা যায়, কৃষকদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। কোথাও জমি তৈরি হচ্ছে, কোথাও সেচ দেয়া হচ্ছে, আবার কোথাও বীজতলার সবুজ চারা সারি সারি করে রোপণ করা হচ্ছে। শীতের কারণে কাজের গতি কিছুটা ধীর হলেও কৃষকরা সময় নষ্ট করতে চান না। কারণ বোরো ধানে সময়মতো রোপণই ভালো ফলনের চাবিকাঠি। আগের বছরগুলোতে সারের কৃত্রিম সংকট, সিন্ডিকেট আর বাড়তি দামের অভিযোগ ছিল নিয়মিত।
কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই চিত্র বদলেছে। কৃষকরা ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সার সরকারি নির্ধারিত দামেই ডিলার পর্যায় থেকে সংগ্রহ করতে পারছেন। ফলে চাষাবাদে একটি বড় দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে।
কৃষকদের ভাষায়, এবার সারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় সার পাওয়ায় জমির কাজ নির্বিঘ্নে এগোচ্ছে। এতে উৎপাদন পরিকল্পনাও ঠিকঠাক রাখা সম্ভব হচ্ছে।
যদিও সারের দিক থেকে স্বস্তি আছে, তবে সেচ ও শ্রমিকের মজুরি কৃষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় সেচ ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি কামলা বা কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি আগের চেয়ে অনেক বেশি। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
সদর উপজেলার কৃষক ইয়াকুব মোল্যা জানান, সার সহজে পেলেও ডিজেল আর শ্রমিকের খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ধান কাটার সময় যদি ন্যায্যমূল্য না পাওয়া যায়, তাহলে লাভ তো দূরের কথা, লোকসানের আশঙ্কাও আছে।
সার ডিলার হাসানুজ্জামান হাসান জানিয়েছেন, সরকারি বরাদ্দ পর্যাপ্ত থাকায় কোনো ধরনের সংকট নেই। বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারদের কাছে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও পটাশ সার পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রয়েছে। কৃষকরা যখনই আসছেন, তাদের চাহিদা অনুযায়ী সার দেয়া হচ্ছে এবং নির্ধারিত দামের বাইরে অতিরিক্ত কোনো টাকা নেয়া হচ্ছে না।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে নড়াইল জেলায় বোরো চাষের চাহিদা পূরণে কয়েক হাজার মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের সার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি ছাড়াও পটাশ সার পর্যাপ্ত মজুত রাখা হয়েছে।
নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান জানান, শুধু বরাদ্দ দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে, যাতে কোনো অনিয়ম বা সংকট তৈরি না হয়। একই সঙ্গে কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও সুষম সার ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সঠিক সময়ে রোপণ, মানসম্মত বীজ ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ এবং নিয়মিত সেচ দিলে ফলন ভালো হবে। আবহাওয়া যদি অনুকূলে থাকে এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তাহলে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব।
সব মিলিয়ে নড়াইলে বোরো ধান চাষের চিত্র এবার বেশ আশাব্যঞ্জক। শীতের কষ্ট, খরচের চাপ আর নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও কৃষকরা মাঠ ছাড়েননি। তাদের এই পরিশ্রম আর সাহসই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভরসা। আবহাওয়া সহায় হলে এবং বাজারে ন্যায্য দাম নিশ্চিত হলে, নড়াইলের এই বোরো মৌসুম কৃষক ও দেশের জন্য সুখবর বয়ে আনবে এমনটাই আশা সবার।
(আরএম/এসপি/জানুয়ারি ১৩, ২০২৬)
