ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২

প্রচ্ছদ » বিনোদন » বিস্তারিত

এ-তো দেয়াল ভাঙ্গার প্রতিবাদী গান

২০২৬ জানুয়ারি ১৫ ২৩:০৬:২১
এ-তো দেয়াল ভাঙ্গার প্রতিবাদী গান

পীযূষ সিকদার


ঢাকা থিয়েটারের জ্যেষ্ঠ সভ্য কামাল বায়েজীদের কথপোকথনের মধ্যে দিয়ে ঢাকা থিয়েটারের নতুন নবীন নাট্যকর্মীদের যৌথ প্রয়াসে শুরু হয় নাটক। দেয়াল। নাটকটি লিখেছেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। নির্দেশনা দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র অনিক ইসলাম। বয়সে নবীন হলেও তার নির্দেশনার ধার আছে। ধার থাকবে না কেন? তিনি তো নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ডিরেক্ট ছাত্র। আমরা যারা নাট্যকলায় পড়াশোনা করেছি, তারা কোনো কিছু না করলেও তাদের জীবিকা চলে অহর্নিশ। নাট্যবিদরা যেখানেই যায় সেখানেই নাটক হয়ে উঠে! প্রশ্ন আসতেই পারে কিভাবে? এর উত্তর খুঁজুন। উত্তর পেয়ে যাবেন নিশ্চয়।

১৪ জানুয়ারি আচার্য সেলিম আল দীন’র ১৯তম প্রয়াণ দিবস। একদিকে কষ্টের আরেক দিকে আনন্দের। আমরা তো আছি তাঁর হয়ে। কেউ মঞ্চে অভিনয় করে। কেউ টেলিভিশনে। কেউ ছবিতে। আর নাট্যকর্মীরা হাতের করকমলে পেয়ে যান চাঁদ। তাই তো আমরা দুই হাতের তালুতে চাঁদ খুঁজে পাই, দুই পায়ে ভর করে দাঁড়াই। কথা বলি চা খেতে খেতে। পেয়ে যাই উত্তর। উত্তর কি এতো সহজে মেলে! যে মেলায় জানে তো সেই।

স্বাধীনতা পরবর্তী যখন চারিদিকে রাজনৈতিক বাতাস আর ভস্ম অর্থনীতির ধুম্রজালে সারাদেশ হতাশায় নিমজ্জিত তখন ১৯৭৩ সালে ঢাকা থিয়েটরারের জন্ম। একঝাক মেধাবী তরুণ-তরুণী গড়ে তোলেন ঢাকা থিয়েটার। ঢাকা থিয়েটারের সাথে আমার রক্তের যোগ আছে। যে কথা পরে পরে বলা যাবে অথবা ইতিমধ্যে বলেই ফেলেছি হয়তো বা। আর একই কথা বারবার বললে এক ঘেয়েমি লাগে। তাই পাঠককে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারি না।

শহরের মঞ্চে ঢাকা থিয়েটার বাংলাদেশের মৌলিক নাটকের অপ্রতিরোধ্য বৃত্তটি রচনা করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতির মধ্যে ক্রমে তা প্রসারিত করেছে। গ্রামে গ্রামে গড়ে তুলেছে গ্রাম-থিয়েটার। এ দেশের মানুষের জীবন ও তার শিল্পীত রূপটি সমাজ-রূপের মধ্য দিয়ে একদিন যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে একালের শিল্পসাধনা আগামীকালের মধ্যে পাবে পূর্ণতার সাধ।

‘দেয়াল’ ঢাকা থিয়েটার’র ৫৩তম প্রযোজনা নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত-সময়োচিত এবং অপেক্ষাকৃত না জানা। ‘দেয়াল’ নাট্যাচার্যের মহান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নাটক। ‘দেয়াল’ নাটকটি নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের রচনা। এই নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের অতিনিকট ছাত্র অনিক ইসলাম। নির্দেশক হিসেবে অনিক সফল।

তবে আমার ভালো লেগেছে আলোর চলন। আলোর চলনে বুঝে নিতে কষ্ট হয়নি এটি মুক্তিযুদ্ধের নাটক। আলোকে যিনি নাট্যরূপ দিয়েছেন অথবা শিল্পরূপ দিয়েছেন তিনি ওয়াসিম আহমেদ। সেটের কথা না বললেই নয়। এ রকম নিরাভরণ সেট যার হাতে মুক্তি পেয়েছে তাকে সাধুবাদ দিই। আমরা একটু জেনে নিই নির্দেশক অনিক ইসলামের কথা। জেনে নিই তার থিয়েটারের কৌশল বিদ্যা। যদিও নাটক সবসময়ই একেশ্বরী। সবে মিলে এক।

অনিক ইসলামের ভাবনাটা জেনে নিই।

অনিক বলছেন- “আচার্য সেলিম আল দীন স্যারের ছাত্র হিসেবে তাঁর রচিত ‘দেয়াল’ নাটকটি ঢাকা থিয়েটারে নির্দেশনা দেবার সুযোগ পেয়ে আমি গভীর আনন্দ ও গর্ভবোধ করছি। স্যার ছিলেন আমাদের নাট্যজগতের একজন প্রবাদপুরুষ, যার লেখা ও চিন্তা আমাদের নাট্যশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর ছাত্র হওয়া এবং তাঁর কাজ নির্দেশনা করার সুযোগ পাওয়া, আমার জন্য একটি বিশেষ সম্মান এবং আনন্দের বিষয়। ‘দেয়াল’ নাটকটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরে।”

নাটক সবসময়ই জীবনের ব্যাখ্যাতা! সেই আদিকাল হতে নাটক ধর্মের খোলসে বিদ্যমান ছিলো। কৃত্য থেকে নাটক বেরিয়ে আসলো তখন নাটক নিজ পায়ে দাঁড়ালো। কৃত্যের মধ্যে নাটক আছে। মানুষের তাকানোর ভঙ্গিতে নাটক আছে। কথা বলার মধ্যে নাটক আছে। আমরা কথা বলা শুরু করলেই নাটক তার পূর্ণতা পায়। আমরা হঠাৎ হেসে উঠি। কাঁদি। এসবই নাটকের অনুসঙ্গ। নাটক নেই কোথায়। নাটক সবখানে। কী পরিবারে কী পড়শীতে, কী সমাজে। এ সবের মধ্যেই নাটকের বীজ বিদ্যমান। বীজ ছাড়া কিছু হয় না। তাই ভূমিই হয়ে যায় মঞ্চ।

নাটকটি দেখতে দেখতে আলোর যে খেলা। তা আমাকে ভাবিয়েছে! আলো দেখে আমাকে হত্যাকারীদের কথা মনে করিয়ে দেয়। এতো মেনে নেয়া যায় না। আবার মেনে নিতেও কষ্ট হয় না! আমরা শঙ্কর বাঙালি জাতিতে অসৎ। তাই তো একের পর এক খুন হতে থাকে। আমরা মেনে নেই এভাবে। আমাদের পরিবারের কিছু হয়নি! কেনো হয়নি তা ব্যাখ্যা করার মতো পড়াশোনা নেই। প্রকৃতি বন্দনা নেই! শুধু ইটের ওপর ইট সাজাই।

যাই হোক, এ নাটকে বেশির ভাগ অভিনয় শিল্পী নতুন ও নবীন। ‘দেয়াল’ নাটক একটি ধারণাকে কেন্দ্র করে মঞ্চে এ-বাজারের বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়েছে। যে দেয়াল শত্রুপক্ষই রচনা করেছিলো। সেই বুলেটই দেয়ালে বিঁধে গিয়েছিলো শত্রুপক্ষের দালালদের।

এমনই এক বিমূর্ত কাঠামোতে রচিত হয় নাটক ‘দেয়াল’। এখনো দেয়াল রচিত হচ্ছে। জানি না সে দেয়াল কাকে রক্ষা করবে। নাকি আমরাই দেয়ালে দেয়ালে কান পাতবো। ওই তো আসছে কিশোর-গেরিলা। ‘দেয়াল’ নাটকে যারা অভিনয় করেছেন তারা হলেনÑ অভিজিত বিশ্বাস। অনিক ইসলাম। এহসানুর রহমান। ফারজানা চুমকি। হাবিবা আজিজ হ্যাপী। মিলু চৌধুরী প্রমুখ।

নাটকটির কলাকুশলীরা হলেন- সেলিম আল দীন, নির্দেশনা- অনিক ইসলাম। সহকারী নির্দেশনা- ওয়াহিদ, আলো- ওয়াসিম আহমেদ। যাঁদের কথা না বললেই নয়- কথা- সেলিম আল দীন। সুর- শিমূল ইউসুফ- কথা শুভাসিস সিনহা- ইউসুফ হাসান অর্ক।

নাটক তো সবসময়ই জীবনের ব্যাখ্যা করে। আড়ালে থিয়েটার তখন ফুল হয়ে ফুটে। জয় হোক। “বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে ঝংকৃত হোক বাংলা নাটকের শাশ্বত সুর।”

যাঁর কথা না বললে বাংলাদেশ পেতাম না। পেতাম না- ঢাকা থিয়েটার। তিনি নাসির উদ্দীন ইউসুফ, প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, ঢাকা থিয়েটার।

(পিএস/এএস/জানুয়ারি ১৫, ২০২৬)