প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
নারী উন্নয়ন থেকে নারী-নির্ভর অর্থনীতি
বিক্ষিপ্ত উদ্যোগগুলো এক ছাতার নিচে না আনলে বাংলাদেশ কী হারাচ্ছে
২০২৬ জানুয়ারি ১৭ ১৮:৪৯:৩৮
মো. ইমদাদুল হক সোহাগ
গত এক দশকে বাংলাদেশ নারী উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধীরে ধীরে কল্যাণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ নারীদের ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ, নারী উদ্যোক্তাদের স্বীকৃতি ও ব্র্যান্ডিং সহায়তা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বৃহৎ পরিসরে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এই নীতিগত পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ। নারীরা এখন আর কেবল সামাজিক সহায়তার সুবিধাভোগী নন; ক্রমেই তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
এলডিসি-পরবর্তী উত্তরণের প্রাক্কালে এই পরিবর্তনের তাৎপর্য আরও গভীর। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রশ্নে নারীদের কার্যকর অর্থনৈতিক সংযুক্তি আর বিকল্প নয়; এটি এখন জাতীয় সক্ষমতার একটি মূল স্তম্ভ। কিন্তু এই অগ্রগতির ভেতরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে—দক্ষতা তৈরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই দক্ষতা কি টেকসইভাবে অর্থনীতিতে রূপ নিচ্ছে?
দক্ষতা আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা নেই
প্রতিবছর আনুমানিক ২.৫ থেকে ৩ লক্ষ নারী বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের আওতায় আসছেন। নারী বিষয়ক দপ্তর, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত, যুব উন্নয়ন কার্যক্রম এবং এসএমই সহায়তা কাঠামো—সবখানেই নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ চলছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক দক্ষতা থেকে শুরু করে ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সিং, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা সেবা খাত—প্রশিক্ষণের বৈচিত্র্যও কম নয়।
কিন্তু বিভিন্ন কর্মসূচি পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয় যে, প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যেই একটি বড় অংশ আয়মুখী কার্যক্রম থেকে সরে যায়। অনুমান করা হয়, এই হার ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। বাস্তবে এর অর্থ হলো—প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার নারী প্রশিক্ষণ পেয়েও বাজারে টিকে থাকতে পারছেন না।
এই বাস্তবতা নারীদের সক্ষমতা বা আগ্রহের অভাবের প্রতিফলন নয়। বরং এটি একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কিন্তু প্রশিক্ষণ–পরবর্তী সহায়তা দুর্বল থাকে। পণ্য বা সেবা তৈরি হয়, কিন্তু বাজারে পৌঁছানোর পথ অনিশ্চিত থাকে। অর্থায়ন, পরামর্শ, মেন্টরশিপ ও নিয়মিত ফলো-আপের অভাবে অনেক উদ্যোগ শুরুর আগেই থেমে যায়।
ঝরে পড়ার মূল্য কেবল সামাজিক নয়, অর্থনৈতিকও
নারী উদ্যোক্তারা যখন আয়মুখী কর্মকাণ্ডে টিকে থাকতে পারেন না, তখন এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষুদ্র নারী-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করে, আয় বণ্টনে ভারসাম্য আনে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা জোরদার করে।
রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, একজন নারী পরিচালিত ক্ষুদ্র উদ্যোগ মাসে গড়ে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা নেট আয় করতে পারে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা সরাসরি অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। এই হিসাবে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার নারী যখন বাজার থেকে ঝরে পড়েন, তখন বাংলাদেশ হারায় আনুমানিক ১৬,৮০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মূল্য।
এটি কোনো তাত্ত্বিক হিসাব নয়। এটি উৎপাদন, আয় ও প্রবৃদ্ধির বাস্তব ক্ষতি। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে, যখন শুল্ক–সুবিধা কমবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে, তখন এই ধরনের সুযোগ-ব্যয় বহন করা বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।
বিক্ষিপ্ত উদ্যোগ ও ‘স্যাটেলাইট সিনড্রোম’
নারী অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন আর একটি মন্ত্রণালয়ের একক কাজ নয়। আইসিটি খাত ডিজিটাল দক্ষতা তৈরি করছে, যুব উন্নয়ন কর্মসূচি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, শিল্প ও এসএমই সংশ্লিষ্ট কাঠামো অর্থায়ন ও সহায়তা দিচ্ছে। উদ্যোগের পরিমাণ ও পরিসর—দুটোই বড়।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই উদ্যোগগুলো প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। এগুলো যেন আলাদা আলাদা স্যাটেলাইট—নিজ নিজ কক্ষপথে কাজ করছে, কিন্তু কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা সমন্বিত দিকনির্দেশনা নেই। একজন নারী হয়তো এক দপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ পান, অন্য দপ্তর থেকে যন্ত্রপাতি বা সীমিত সহায়তা পান, কিন্তু তার একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিচয় তৈরি হয় না। সমস্যা উদ্যোগের পুনরাবৃত্তি নয়; সমস্যা হলো একটি যৌথ কার্যকর কাঠামোর অভাব।
কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্রোফাইল না থাকায় নারীরা ব্যাংক, বড় ক্রেতা কিংবা সংগঠিত বাজারে দৃশ্যমান হতে পারেন না। এই বিক্ষিপ্ততাই আস্থাহীনতা তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত ঝরে পড়ার কারণ হয়।
প্রকল্পের বাইরে গিয়ে সিস্টেম ভাবার সময়
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। কেবল নতুন প্রকল্প যোগ করার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন হলো বিদ্যমান উদ্যোগগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা—যেখানে প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, বাজার সংযোগ এবং ফলো-আপ একসাথে কাজ করবে।
একটি জাতীয় নারী উদ্যোক্তা কাঠামো (National Women Enterprise Framework) এই ভূমিকা পালন করতে পারে। এর ভিত্তি হতে পারে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রশিক্ষণ তথ্য, উদ্যোক্তা প্রোফাইল, বাজার সংযোগ এবং ডিজিটাল ক্রেডিট মূল্যায়ন একত্রে থাকবে। এতে নারীরা বারবার নতুন করে শুরু না করে ধাপে ধাপে বিশ্বাসযোগ্যতা ও সক্ষমতা তৈরি করতে পারবেন।
মাননীয় সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বের প্রেক্ষাপট
এই সমন্বিত রূপান্তর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের প্রশ্নটি অবিচ্ছেদ্য। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মাননীয় সিনিয়র সচিব বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের নাম। দেশের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি যে সময় কাঠামোগত কাঁচের দেয়াল ভেঙেছিলেন, তা কেবল একটি ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না; বরং তা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে নারীর নেতৃত্বের সক্ষমতার একটি দৃঢ় ঘোষণা। মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে কাজ করার সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে নীতিনির্ধারণী স্তরে বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক বিরল দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে—যেখানে কাগুজে নীতি নয়, মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনই হয়ে ওঠে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু।
পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক সংস্কারে তাঁর ভূমিকা এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। সরকারি ক্যালেন্ডারে বাংলা ও আরবি হিজরি মাসের সময়নিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত সমন্বয়—বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে—রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে মানুষের জীবনের আরও কাছাকাছি এনেছে। একইভাবে, অনলাইন আবেদন, পরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার কঠোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সময়নিষ্ঠতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছে, যার সুফল সারা দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করছে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি ও দৃঢ় নেতৃত্ব থাকলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন কেবল সম্ভবই নয়, টেকসইও হয়।
এখনই প্রয়োজন নীতিগত স্পষ্টতা
এই মুহূর্তে সংকট উপকরণের নয়; সংকট সিদ্ধান্তের। প্রশিক্ষণ আছে, ডিজিটাল অবকাঠামো আছে, অর্থায়নের কাঠামোও রয়েছে। নেই কেবল একটি একীভূত নীতিগত নির্দেশনা। তিনটি বিষয় এখন অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
প্রথমত, সরকারি প্রশিক্ষণ বা উদ্যোক্তা সহায়তা পাওয়া প্রতিটি নারীর জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল অর্থনৈতিক প্রোফাইল।
দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণ–পরবর্তী অন্তত ২৪ মাস ফলাফল ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করা এবং সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে উদ্যোগের স্থায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া।
তৃতীয়ত, বাজার সংযোগ ছাড়া কোনো উদ্যোক্তা কর্মসূচিকে কার্যকর হিসেবে বিবেচনা না করা।
এই পদক্ষেপগুলো নতুন প্রতিষ্ঠান দাবি করে না; এগুলো সমন্বয়, স্পষ্ট ম্যান্ডেট ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন দাবি করে।
বাংলাদেশে দক্ষ নারী আছে, বাজার আছে, প্রশাসনিক সক্ষমতাও আছে। ঘাটতি কেবল সমন্বয়ের।
বিক্ষিপ্ত উদ্যোগ অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে, কিন্তু নারী-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে না। একটি সমন্বিত, ফলাফলভিত্তিক কাঠামোর আওতায় উদ্যোগগুলোকে আনতে পারলেই টেকসই পরিবর্তন সম্ভব—যেখানে নারীরা সাময়িক প্রকল্পের অংশগ্রহণকারী নয়, বরং স্থায়ী অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠবেন।
নারী উন্নয়নকে নারী-নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর এখন আর সামাজিক আকাঙ্ক্ষা নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা। আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।
লেখক : ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, উদ্যোক্তা ও কলাম লেখক।
