ঢাকা, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

বাংলাদেশের জনগণের আস্থায় নতুন সূচনা

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১৩ ১৭:৩৮:০৪
বাংলাদেশের জনগণের আস্থায় নতুন সূচনা

মীর আব্দুল আলীম


নির্বাচনের দিনগুলো কেবল ভোটের হিসাব নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রহর। নাগরিকরা প্রতিটি পদক্ষেপে আশা, আস্থা এবং দেশের ভবিষ্যতের স্বপ্নে জড়ায়। এই বিশ্বাসই দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি। আজকের বিজয় মানে কেবল একটি ব্যক্তি বা দল নয়; এটি দেশের মানুষের স্বপ্ন, আশা এবং বিশ্বাসের বিজয়। এই প্রভাতে শুধু নির্বাচন জয় উদযাপন না, বরং দেশের নৈতিক উন্নয়ন, স্বচ্ছতা, সমন্বয় এবং সামাজিক অংশগ্রহণের গুরুত্বকেও স্বীকৃতি দিই আমরা। দেশের প্রকৃত শক্তি, স্থায়ী উন্নয়ন এবং সামাজিক ঐক্যও এই প্রভাতেই প্রকাশ পায়।

বিজয়ীদের অভিনন্দন: যাঁরা নির্বাচনে জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার দীপ জ্বালিয়েছেন, তাঁদের অভিনন্দন জানানো কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বরং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। নির্বাচিত হওয়া মানে শুধু একটি পদ গ্রহণ নয়; এটি দেশের মানুষের আশা, স্বপ্ন এবং আস্থা শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে কাজ করার অঙ্গীকার। বিজয়ীরা এখন দেশের মানুষের বিশ্বাসের ধারক ও বাহক। এই বিশ্বাসের দায়িত্ব পালনে সততা, নৈতিকতা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করা অপরিহার্য। বিজয়ীদের জন্য শুভেচ্ছা একটি নৈতিক আহ্বানও বটে, আপনার কাজ দেশের কল্যাণের পথে হোক, ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়। মানুষের আস্থা এবং সম্মানকে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করলে দেশের উন্নয়ন সত্যিই বাস্তবায়িত হবে।

যাঁরা আজ বিজয়ের দ্বার স্পর্শ করতে পারেননি, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা অপরিহার্য। গণতন্ত্রে হারের মানে শেষ কথা নয়; বরং এটি নতুন দায়িত্ব ও নতুন সুযোগের সূচনা। হারা পক্ষের অভিজ্ঞতা, নীতি এবং পরামর্শও দেশের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানে নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করা। রাজনৈতিক পরাজয় কখনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। হারা পক্ষকেও দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে হবে, পরামর্শ, সমন্বয় এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এটি দেশের জন্য কার্যকর অবদানের সুযোগও তৈরি করে।

নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়; এটি দেশের নৈতিক পরীক্ষাও বটে। ভোটের মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস প্রকাশিত হয়। তবে গণতন্ত্রের প্রকৃত মান বোঝার জন্য শুধু ভোটের দিন নয়, দিনের পর দিন প্রশাসন, নীতি, বিচার, সামাজিক সংহতি এবং নাগরিক অংশগ্রহণও দেখতে হবে। গণতন্ত্র মানে স্বাধীনতা, ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ। বিজয়ীরা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করার সময় এই মূল্যবোধগুলো মেনে চললে রাষ্ট্র স্থিতিশীল হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল পক্ষকে দেশের আইন ও নীতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই, তবে দেশের কাজের জন্য সমন্বয় অপরিহার্য। বিজয়ী ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা মিলিত হয়ে জাতির কল্যাণে কাজ করলে প্রকৃত অর্থে দেশ এগোবে। রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও দেশের প্রকৃত স্বার্থ সবসময় সবার আগে। সমন্বয় মানে শুধু সবাইকে এক ছাদের নিচে আনা নয়; বরং দেশের বিভিন্ন মত, অভিজ্ঞতা এবং সম্পদকে দেশের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা। বিজয়ীরা এবং বিরোধীরা একে অপরের সঙ্গে সুসংগঠিতভাবে কাজ করলে দেশ ত্বরান্বিত উন্নয়নের পথে এগোবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অবদানকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময়ের পর জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সচল করা, এটি সাহসী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ডঃ ইউনুসসহ সংশ্লিষ্টরা তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেছেন, যা রাজনৈতিক স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত। এই উদ্যোগ নতুন সরকারের জন্য মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এটি প্রমাণ করে ক্ষমতার পরিমাণই শেষ কথা নয়; দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি স্থায়ী প্রভাব ফেলবে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জরুরী। স্বচ্ছতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি। যেকোনো সরকারকে জনগণের সঙ্গে তার কাজের হিসাব শেয়ার করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ এটাই নিশ্চিত করেছে। স্বচ্ছতা শুধু আচার-আচরণ নয়, এটি নেতৃত্বের নৈতিক শক্তি, জনগণের আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী উন্নয়নের মূল ভিত্তি। এটি সকল রাজনৈতিক দলের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত।

নতুন নির্বাচিত সরকার এখন শুধুমাত্র ক্ষমতা গ্রহণের স্তরে নয়, বরং তারেক জিয়ার সরকার বিশাল দায়িত্বের মুখোমুখি, যা দেশের ভাগ্য নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়। তাদের হাতে দেশের মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশা নির্ভর করছে, সেইসঙ্গে অতীত সরকারের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও অর্পিত হয়েছে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নীতি এবং প্রতিটি পরিকল্পনা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সুপরিকল্পিত নীতি, দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।

দেশের সার্বিক উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন বিজয়ীরা শুধু নির্বাচনী জয়কে মনে রাখবেন না, বরং রাজনৈতিক প্রথা, নৈতিকতা, ন্যায় এবং জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন। সরকারের প্রতিটি কর্মসূচি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত এবং কর্মকাণ্ডে অংশীদারিত্ব বোধ করতে পারে, সেটিই প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বীকৃতি।

হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। 'সবার আগে বাংলাদেশ' তারেক রহমানের এই শ্লোগান ভুলে গেলে চলবে না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, তবে তা যেন কখনো বিভাজন বা প্রতিহিংসার রূপ না নেয়। দেশের উন্নয়ন, শান্তি ও স্থায়ী সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে সকলকে সহমর্মিতা ও সংযম দেখাতে হবে। রাজনৈতিক বিজয় কেবল ক্ষমতার বিষয় নয়; এটি দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এক যজ্ঞ। দেশের উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন জনগণকে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করা হবে। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা। নাগরিকরা যেন সরকারের নীতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারে, সেটিই প্রকৃত গণতন্ত্র।

শুধু নির্বাচনী বিজয় নয়, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অপরিহার্য। শিক্ষার মান বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। শক্তিশালী নীতি এবং বাস্তবায়নশীল প্রশাসন ছাড়া দেশের উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থাকে। নাগরিকরা উন্নত জীবনযাত্রা, নিরাপদ সমাজ এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ আশা করে। এই প্রত্যাশা পূরণে সকল রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা এবং দক্ষ প্রশাসন অপরিহার্য। বিজয়ী ও হারা সবার অংশীদারিত্বে দেশের উন্নয়ন হবে স্থায়ী ও সমৃদ্ধ।

দেশ গড়তে সমাজের ঐক্য জরুরি। রাজনীতিতে সমন্বয় ও সংহতির অভাব থাকলে বিভাজন ও সংঘাত বাড়ে। বিজয়ী ও যারা বিজয়ী হতে পারেননি তাঁদের সবার দায়িত্ব দেশের ঐক্য রক্ষা করা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, তবে তা যেন কখনো বিভাজন বা বিদ্বেষে রূপ না নেয়। দেশের কাজের জন্য সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ সকলকে মিলেই গড়তে হবে। এই প্রভাত হোক নতুন সূচনার প্রতীক। যেখানে রাষ্ট্র হবে সকলের, দায়িত্ব হবে সকলের, আর দেশের উন্নয়ন হবে মানুষের আশা অনুযায়ী। বিজয়ী ও নাগরিক সবার অংশীদারিত্বে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হবে। গণতন্ত্র হোক জীবন্ত, স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী।

শিক্ষার উন্নয়ন ও মানব সম্পদকে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন শুধুমাত্র অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক সূচকে নয়; মূল ভিত্তি হলো মানুষ ও শিক্ষার মান। একটি দেশের শক্তি তার শিক্ষিত, সৃজনশীল এবং নৈতিক নাগরিকদের মধ্যেই নিহিত। নতুন সরকারকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন পর্যন্ত। শিক্ষিত নাগরিকরা শুধু দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং সামাজিক ন্যায় ও স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করে। প্রযুক্তি ও আধুনিকায়নের গুরুত্বও অপরিহার্য। বিজয় মানে শুধু রাজনৈতিক জয় নয়, দেশের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সূচনা। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল প্রশাসন, স্মার্ট সিটি প্রকল্প এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগ দেশের উন্নয়নের গতি দ্বিগুণ করতে পারে। নতুন সরকারকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সমর্থন দিয়ে দেশের প্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা জরুরি। দেশের গণতন্ত্র ও শাসনের মান শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করে। বিজয়ী সরকারকে দেশের নীতি ও চর্চার মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বচ্ছ প্রশাসন, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করবে। শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক বা কৌশলগত দিক নয়, দেশের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলতে চাই, আজকের বিজয়ের প্রভাতে শুধুমাত্র আনন্দ উদযাপন নায়; আমরা গ্রহণ করছি এক নতুন দায়িত্ব, এক নতুন আহ্বান। দেশের মানুষের আশা, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশাকে শক্তি করে আমরা যেন একটি শক্তিশালী, স্থায়ী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারি। হিংসা, বিদ্বেষ বা বিভাজনকে পেছনে ফেলে সমন্বয়, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বকে আমরা প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি।

এই প্রভাত হোক নতুন সূচনার প্রতীক। যেখানে বিজয় কেবল একটি পদবী নয়, বরং দেশের মানুষের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির এক শক্তিশালী দিশা। আজকের বিজয়ী এবং সব নাগরিক মিলে দেশের উন্নয়নের যাত্রাকে ধারাবাহিক, নৈতিক এবং সুষম করে তুলবেন এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের। গণতন্ত্র হোক জীবন্ত, স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী; এবং বিজয়ের আলো ঝিকিমিকি করে উদ্ভাসিত হোক দেশের প্রতিটি কোণে।

লেখক :সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক।