ঢাকা, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

সেলিম সামাদ মারা গেছেন 

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২৩ ১৭:৫৯:১০
সেলিম সামাদ মারা গেছেন 

শিতাংশু গুহ


বন্ধু সেলিম সামাদ মারা গেছে। এমনিতে যোগাযোগ ছিলো, ওর প্রতিটি রিপোর্ট আমায় পাঠাতো। তবে জানতাম না, ওর ক্যান্সার হয়েছিলো। কথা হতোনা। সাংবাদিক হিসাবে একজন ভাল রিপোর্টার ছিলো, ‘অশোকা ফেলো’। মানুষ হিসাবে সেলিম সামাদ একজন সৎ, দেশপ্রেমিক, ভাল মানুষ ছিলো। আমি তাঁকে চিনি আশির দশকে ঢাকা থেকে, সম্ভবত: মধ্য আশি থেকে, তখনই সেলিম সামাদ একজন ভাল রিপোর্টার। ওর ভাই নাসিম-কে আমি চিনি, শুধু সেলিম সামাদের ভাই হিসাবে নয়, আমাদের বন্ধু ইয়াসমিনের স্বামী হিসাবে। ইয়াসমিন আমার সহকর্মী ছিলো, আমরা ঢাকায় একটি কলেজে পড়াতাম; ইয়াসমিন সমাজকল্যাণ, আমি রসায়ন। নাসিম-ইয়াসমিনরা এখন অষ্ট্রেলিয়া থাকে, যোগযোগ নেই? সন্তান নিয়ে ওঁরা একবার আমেরিকা এসেছিলো, আমাদের সাথে একবেলা কাটিয়ে গেছে।

সেলিম সামাদের পরিবারটি ভাল। সে নিজেও ছিলো ‘নিপাট ভদ্রলোক’। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ তো বটেই, কিছুটা আওয়ামী ঘরানার মানুষ হলেও কেন জানি সেলিম সামাদ ‘জুলাই-৩৬’ র সমর্থক হয়ে যায়! না, এনিয়ে আমার কখনো ওর সাথে কথা হয়নি, তবে ওর সমর্থন কোন ক্ষতিকারক কিছু ছিলোনা, হয়তো আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র প্রতি কিছুটা বিরক্ত হয়েই ও ‘জুলাই-৩৬’-কে সমর্থন দেয়? ২০০১’র পর সেলিম সামাদ বেশ কিছুকাল নিউইয়র্কে বসবাস করে, থাকতো কানাডা কিন্তু নিউইয়র্কে অবাধ যাতায়াত ছিলো। এরপর পরিবার কানাডায় রেখে সেলিম সামাদ দেশে ফিরে যায়। ঐসময় বিএনপি’র বিরুদ্ধে আন্দোলনে সেলিম সামাদ আমাদের সমর্থন যুগিয়েছিল। আমরা তখন সেলিম সামাদের ভাষায় বেশকিছু ‘হালাল আড্ডা’ মারতাম। তেমন একটি আড্ডা ছিলো কুইন্সে ফাহিম রেজা নূরের বাসায়, সম্ভবত: ‘হালাল আড্ডা’ শব্দটির উৎপত্তি ওখান থেকেই।

বন্ধুত্ব সর্বদা সরল রেখায় চলেনা, ঢাকায় ছিলো পেশার বন্ধুত্ব, নিউইয়র্কে সামাজিক। সামাজিক বন্ধুত্বে অন্যরা কখনো-সখনো ঝামেলা পাকায় বটে? তবে তা অস্থায়ী, স্বল্পকালীন। ঢাকায় সেলিম সামাদ ও আমি দু’জনই ছিলাম প্রেসক্লাব কেন্দ্রিক এবং একই সাংবাদিক ফোরামের, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ফোরাম? এই ফোরামের অনেকেই এখন হত্যা মামলায় জেলে। যদিও এঁরা খুনি নয়, তবে শেখ হাসিনাকে অতিমাত্রায় ‘তেল’ দেয়ার অপরাধে অপরাধী। সেলিম সামাদ আমার মতই ‘তেল’ দিতে শেখেনি, তাই জীবনে তেমন উন্নতি হয়নি। আমি জেলবন্দি সকল সাংবাদিকের মুক্তি চাই, দোস্ত সেলিম সামাদ তো চিরতরে মুক্ত। এই ‘দোস্ত’ শব্দটিও সেলিম সামাদের। বলতো, ‘হালাল দোস্তি’। এই হালাল শব্দটি সেলিম সামাদ কেন ব্যবহার করেছিলো সেটাও বলে ফেলি? এক আড্ডায় আমরা সবাই ‘বিয়ার’ খাচ্ছিলাম, কিন্তু একজন হালাল বিয়ার খুঁজছিলেন, তিনি এলকোহল খাননা, তখন সেই আড্ডায় এলকোহলবিহীন হালাল বিয়ার নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়, আড্ডাটি’র নাম হয় ‘হালাল আড্ডা’, আর আমাদের বন্ধুত্ব ‘হালাল দোস্তী’। সেলিম সামাদ প্রকৃত ‘অসাম্প্রদায়িক’ ছিলো।

আগে তো আমরা তেমন ছবিটবি তুলতাম না, বা তুললেও রাখতাম না, তবু মনে হলো সেলিম সামাদের সাথে ছবি আছে, তাই খুজলাম, পুরানো ফাইল খুঁজে সেলিম সামাদের সাথে নিউইয়র্কে আমাদের একটি অনুষ্ঠানের নিউজ ও ছবি পেলাম। নিউজটি সেলিম সামাদেরই করা, সেখানে সে আমার কথা লিখেছে, নিউজিটি ইংরেজিতে, বাংলা করে ছবিসহ দিলাম। ছবিটি নিউইয়র্কের, ৪ঠা ডিসেম্বর ২০০৫-র। ছবি ক্যাপশন হচ্ছে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব নিউইয়র্ক আয়োজিত আলোচনা ফোরাম। আমার পাশে ছিলেন (ডান থেকে) মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী (ছবিতে নেই), বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সভাপতি ড. মহসিন আলী এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা সীতাংশু গুহ। সেলিম সামাদ সৈয়দ মোহাম্মদুল্ল্যাহ’র (মহসিন আলীর ডানপাশে) নামটি লিখতে হয়তো ভুলে গিয়েছিলো।

রিপোর্টটি এরকম: রবিবার সকালে তুষারপাত হচ্ছিল। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব নিউইয়র্ক আয়োজিত সভায় বেশ উপস্থিতি ছিলো। বাংলাদেশি আমেরিকানরা যে আলোচনা ফোরামে অংশ নিয়েছিলেন তার বেশিরভাগই সরকারের নীতির সমালোচক ছিলেন। সভাটি আমার ভাল সাংবাদিক বন্ধু, একজন সামাজিক ন্যায়বিচার কর্মী সিতাংশু গুহ দ্বারা ৪ঠা ডিসেম্বর ২০০৫-এ আয়োজন করা হয়েছিল। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি আমেরিকানদের সঙ্গে এটাই ছিল আমার প্রথম সাক্ষাৎ। আলোচনায় মূলত ধর্মীয় স্বাধীনতা, মুসলিম জিহাদী, ইসলামী জঙ্গিবাদ, ভয়ঙ্কর সামরিক গোয়েন্দা (ডিজিএফআই) এর সাথে আমার অগ্নিপরীক্ষা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে সীতাংশু বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ছাড়েন। গত শীতে মন্ট্রিয়লের কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক এক সেমিনারে বহু বছর পর তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি বাংলাদেশে হিন্দু, আহমদীয়া মুসলিম, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষের একজন কর্মী। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধে বাংলাদেশ ইসলামি উগ্রজাতীয়তাবাদী সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নীতিনির্ধারক, মানবাধিকার নেটওয়ার্ক, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে থাকেন। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর 'নির্যাতনের ভয়ে' তিনি আর কখনোই বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন না। তিনি বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে একজন স্পষ্টবাদী কর্মী, এখন তিনি ক্রমবর্ধমান ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, যা ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

আমি প্রায়শই ভাবি যে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত অপরাধীদের দায়মুক্তি প্রত্যাহারের দাবি মানবাধিকার কর্মীরা কেন দাবি করেন না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কর্মরত কিছু অপরাধী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ইউরোপের অভিবাসী। কানাডা সম্প্রতি "যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, ২০০০’ এর অধীনে অভিবাসী এবং শরণার্থী দাবিদারদের তদন্ত শুরু করেছে। আমি নিজে একজন সাংবাদিক এবং সামাজিক সংঘাতের গবেষক এবং ১৯৮০-১৯৯১ সালে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে (সিএইচটি) জাতিগত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উপর নিপীড়ন এবং জাতিগত নির্মূলের সাক্ষী। নিয়মতান্ত্রিক নিপীড়ন, গণহত্যা এবং নারীদের যৌন নির্যাতনের বিষয়ে আমার বেশকিছু নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, সামরিক বাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই দশক ধরে সন্ত্রাসের রাজত্ব ছড়িয়ে দিয়েছে এবং মানবতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপরাধ করেছে।

সেলিম সামাদ ন্যাটো আগ্রাসনের পরে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা জিহাদিদের অবশিষ্টাংশের গোপন আগমনের একটি হুইসেল-ব্লোয়ার। টাইম ম্যাগাজিন, TEHELKA.com ও ডেইলি টাইমসে বাংলাদেশ নিরাপত্তা বাহিনীর সন্ত্রাস রফতানি নিয়ে তার নিবন্ধ ঝামেলার সৃষ্টি করেছিল। সামরিক নিরাপত্তা বাহিনী (ডিজিএফআই) তাকে দু'বার আটক করে নির্যাতন করে। ২০০২ সালে ব্রিটিশ চ্যানেল ৪ টিভির জন্য একটি ডকুমেন্টারি তৈরির জন্য তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ডিজিএফআই দ্বারা তার আটক এবং নির্যাতন আন্তর্জাতিক মহলে হৈচৈ সৃষ্টি করে, এবং ২০০৩ এর গোড়ার দিকে তিনি মুক্তি পান। মুক্তির পর ডিজিএফআই তাকে নজরদারিতে রাখে। ২০০৭ সালে সামরিক নিয়ন্ত্রিত সরকার তাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়। তিনি জুম্ম জনগণের সংঘাত, নিরাপত্তা, জোরপূর্বক অভিবাসন এবং জাতিগত সংকট নিয়ে বইয়ের সহ-রচনা করেছেন এবং অসংখ্য নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। কানাডায় ৫ বছর নির্বাসনে থাকার পরে, তিনি সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছেন।

নিউইয়র্কে এখন বরফ পড়তে শুরু করেছে (২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বেলা ১টা), ব্লিজার্ড ওয়ার্নিং আছে, ১ফুটের বেশি তুষারপাত হওয়ার কথা। এই বিষণ্ণ দুপুরে পরপর দু’টি মৃত্যু সংবাদ পেলাম। একটি সেলিম সামাদ। অন্যটি আমাদের এক পরম শুভানুধ্যায়ী অগ্রজ পবিত্র চৌধুরী। তিনি আজই সকালে (৮:৩৭ মিনিট) মারা গেছেন। মৃত্যুকাল তার বয়স হয়েছিলো ৮৫, সেই তুলনায় সেলিম সামাদের মৃত্যু কিছুটা আগেই হলো, সেলিম সামাদ হয়তো সবে ৭০ পেরিয়েছে। সেলিম সামাদ, দোস্ত যেখানেই থাক, ভাল থাক। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল তাঁর পাগলামী নিয়ে কিছুকথা লিখেছেন, শেখ হাসিনা’র আমলে তিনি লন্ডনে প্রেস-মিনিষ্টার হিসাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, আবার সেটা বাতিলও হয়েছিলো। রষ্ট্রদ্রোহীতার দায়ে তিনি বিএনপি আমলে গ্রেফতার হ’ন, পরে তত্বাবধায়ক সরকার আমলে মামলা বাতিল হয়। আমরা ধারণায় সেলিম সামাদের জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল, ‘জুলাই-৩৬’ সমর্থন দেয়া।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।