ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২৪ ১৭:২৭:১৫
ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ড. মাহরুফ চৌধুরী


দুনিয়ার তাবৎ ভাষাই নদীর মতো; তার নিজস্ব উৎস, গতিপথ ও মোহনা নিয়ে নানা গ্রহণ, বর্জন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময়ের আবর্তনে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনচর্চা, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও পারস্পরিক বিনিময়ের মধ্য দিয়েই ভাষা গড়ে ওঠে এবং সমৃদ্ধি লাভ করে। বাস্তবতার আলোকে সামাজিক প্রয়োজনের মুখোমুখি হয়ে তা বাঁক নেয়, প্রয়োজনে বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়, কখনও স্থিতি খুঁজে পায়। ভাষা কোনো যান্ত্রিক বস্তু নয় যে গবেষণাগারের নকশা অনুযায়ী তাকে নির্মাণ বা প্রতিস্থাপন করা যাবে। ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সুইস ভাষাতাত্ত্বিক ফার্দিনাঁ দ্য সোস্যুর (১৮৫৭-১৯১৩), যিনি আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা, থেকে শুরু করে আধুনিক সমাজভাষাবিদদের (সোসিওলিঙ্গুয়িস্টস) কাজে প্রমাণিত হয়ে যে, ভাষা মূলত সামাজিক চুক্তি ও ব্যবহারের ফল; তার প্রকৃত প্রাণশক্তি মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি দিকও আছে যেখানে ক্ষমতাকেন্দ্রিক শক্তিগুলো নিজেদের ক্ষমতাকে নিষ্কন্টক ও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বারবার ভাষার এই স্বাভাবিক বিকাশকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। ভাষাকে বিশেষ প্রকৌশলের মাধ্যমে ঢালাই করে তারা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে সাংস্কৃতিক আধিপত্য তথা কালচারাল ও বুদ্ধিবৃত্তিক হেজিমনি যার লক্ষ্য কেবল যোগাযোগ নয়, নিজেদের অনুকূলে গণমানুষের চেতনার রূপান্তর।

ইতালীয় মার্ক্সবাদী চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসি (১৮৯১–১৯৩৭) তাঁর ‘হেজিমনি’ ধারণায় দেখিয়েছিলেন, শাসকগোষ্ঠী কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের বলপ্রয়োগ বা দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং আরও গভীর ও স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি ভাষার মাধ্যমে। তাঁর বিশ্লেষণে, আধিপত্যের সবচেয়ে কার্যকর রূপ হলো সেই অবস্থা, যখন শাসিতরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাসকের দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের বলে গ্রহণ করে যখন ক্ষমতার ভাষাই সাধারণ মানুষের ‘সাধারণ বুদ্ধি’ (কমন সেন্স) হয়ে ওঠে। এই নীরব মানসিক পরিকাঠামোই হেজিমনির প্রকৃত শক্তি। গ্রামসির ভাষায়, সমাজে একটি ‘নৈতিক-বৌদ্ধিক নেতৃত্ব’ (মোরাল এন্ড ইন্টাল্যাকচুয়েল লিডারশীপ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শাসকশ্রেণি নিজেদের অবস্থান স্থায়ী করে। এখানে ভাষা হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় উপাদান এবং সামাজিক প্রকৌশলের (সোসাল ইন্জিনিয়ারিঙ) হাতিয়ার। কারণ শব্দচয়ন, পরিভাষা নির্ধারণ, বয়ানের কাঠামো এসবের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয় কোন বিষয়কে কীভাবে ব্যাখ্যা করা ও দেখা হবে, কোন প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হবে, আর কোনটিকে প্রান্তে সরিয়ে রাখা হবে। ভাষা তাই কেবল বাস্তবতার প্রতিবিম্ব নয়; বরং সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার নির্মাতা। উদাহরণস্বরূপ, একটি আন্দোলনকে ‘অধিকার দাবি’ না বলে ‘অরাজকতা’ বলা হলে জনমতের প্রতিক্রিয়াই বদলে যায়।

অনুরূপভাবে, একটি প্রতিবাদকে ‘দেশদ্রোহ’ আখ্যা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে তার নৈতিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ শব্দই ধারণা বা ব্যাখ্যার কাঠামো তৈরি করে, আর সেই কাঠামোই তৈরি করে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। এই নির্মাণপ্রক্রিয়াকে যখন সচেতনভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন তা আর স্বাভাবিক ভাষাবিকাশ হিসেবে থাকে না; সেটা হয়ে ওঠে ভাষাপ্রকৌশল। ভাষাপ্রকৌশলের মাধ্যমে তখন শব্দের অভিধানগত অর্থই কেবল বদলায় না, বরং সেটা শব্দের প্রয়োগের সামাজিক অর্থবিন্যাসকেও পুনর্গঠন করে। কোন শব্দ গ্রহণযোগ্য, কোনটি সন্দেহজনক, কোনটি নিষিদ্ধ এই সীমারেখা টেনে দিয়ে ক্ষমতা চিন্তার ক্ষেত্রকে সংকুচিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে সমাজের ভাবনা, ইতিহাসের পাঠ এবং ভবিষ্যতের কল্পনাও সেই নির্ধারিত ভাষিক সীমানার ভেতর বন্দি হয়ে পড়ে। গ্রামসির তত্ত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সমাজে ভাষা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা তীব্র হয়, সেখানে আসলে ক্ষমতার লড়াইই চলছে। কারণ ভাষা নিয়ন্ত্রণ মানে চেতনা নিয়ন্ত্রণ; চেতনা নিয়ন্ত্রণ মানে ইতিহাস ও সম্ভাবনার দিকনির্দেশ নিয়ন্ত্রণ। তাই ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ কেবল সাংস্কৃতিক ঘটনা নয়; এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিংবা অভিসন্ধিযুক্ত গভীর রাজনৈতিক প্রকল্প।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলা ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাপ্রকৌশলের প্রথম বড় প্রয়াসের সূত্রপাত ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ১৮০০ সালে স্থাপিত এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের প্রয়োজন মেটাতেই গড়ে ওঠে ভারতীয় ভাষাগুলোয় দক্ষ কর্মচারী তৈরি এবং শাসনকে কার্যকর করা ছিল এর উদ্দেশ্য। বাংলা বিভাগ গঠনের পর সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের তত্ত্বাবধানে যে গদ্যরীতি নির্মিত হতে থাকে, তা বাংলা ভাষার আধুনিকীকরণে অবশ্যই ভূমিকা রাখে; কিন্তু সেই মান নির্ধারণ ছিল নিরপেক্ষ কোনো ভাষাবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর থেকে পরিচালিত একটি ব্রাহ্মন্যবাদী সাংস্কৃতিক বিন্যাস। এই পর্বে যে গদ্যরূপ প্রাধান্য পায়, তা ছিল সংস্কৃতনির্ভর, অলংকারমণ্ডিত এবং কৃত্রিমভাবে উচ্চকিত যা জনসাধারণের কথ্যভাষার সাথে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্কহীন হয়ে গড়ে ওঠে। উপনিবেশিক শাসন ও ব্রাহ্মণ্যবাদী পাণ্ডিত্য একত্রে এমন এক ভাষারূপ নির্মাণ করে, যা প্রশাসনিক প্রয়োজন ও নতুনভাবে গড়ে ওঠা ‘বাবু কালচার’-এর এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অভিজাত্যের মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়েছিল। ভাষাবিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিকদের দৃষ্টিতে এটি ছিল ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনের ধারার বাইরে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রূপায়ণ যেখানে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, অভিজাত শ্রেণী (এলিট ক্লাশ) তৈরির প্রক্রিয়ায় সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের চিহ্নে পরিণত হয়।

পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে সাহিত্যিক ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সক্রিয় অনুসরণে বাংলা ভাষার এই সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়া আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। যাই হোক, এর ফলাফল ছিল দ্বিমুখী। সংস্কৃতপ্রধান গদ্যরীতির প্রচলনের মাধ্যমে একদিকে ‘শুদ্ধ’ ও ‘অশুদ্ধ’ ভাষার বিভাজন তৈরি হয় যা ভাষাকে নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করার প্রবণতা সৃষ্টি করে; অন্যদিকে গড়ে ওঠে এক নতুন ভাষাগত অভিজাত সমাজ (এলিট সোসাইটি), যারা ভাষার ‘অধিকার’ নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করার দাবি তোলে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী যাদের কথ্যভাষা ছিল ফারসি-আরবি-উর্দু প্রভাবিত, সহজ ও প্রাকৃতিক ব্যবহারে বিকশিত ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক প্রান্তিকতায় (কালচারাল মার্জিনালাইজেশন) ঠেলে দেওয়া হয়। ভাষা হয়ে ওঠে শ্রেণী ও সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভাজনের সূক্ষ্ম কিন্তু কার্যকর প্রাচীর। এই ভাষাগত বৈষম্য কেবল রুচি বা রীতির প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদার প্রশ্ন। যারা সংস্কৃতঘেঁষা সাধুভাষা ব্যবহারে অদক্ষ, তাদেরকে ‘গেঁয়ো’ বা ‘গাইয়্যা’ তকমা দিয়ে অবমূল্যায়ন করা হতো যা আসলে ভাষার আড়ালে সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করে। ফলে ভাষাপ্রকৌশল এখানে নিরীহ সাহিত্যিক উৎকর্ষের প্রয়াস ছিল না; বরং তা হয়ে ওঠে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বাছাইপ্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্র নিজের উপযোগী ভাষাকে মানদণ্ডে পরিণত করে এবং বাকিদের প্রান্তে ঠেলে দেয়।

উপনিবেশিক শাসনের অবসানে বাংলামুলুকে, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাষায় দ্বিতীয় দফা ভাষাপ্রকৌশল আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ নিয়ে হাজির হয়। এবারের ভাষাপ্রকৌশলের প্রবণতা ছিল দ্বিমুখী। একদিকে ছিল ভারতকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারক ও বাহক একদল বুদ্ধিজীবী, যারা উপমহাদেশীয় ‘উচ্চ’ সংস্কৃতির নির্দিষ্ট মানদণ্ডে বাংলা ভাষাকে ঢালাই করতে আগ্রহী; অন্যদিকে ছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী, যারা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় একতার উপকরণ হিসেবে পুনর্গঠন করতে চেয়েছিল। ফলে ভাষা আর কেবল সাহিত্যিক রীতি বা ব্যাকরণগত মানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা সরাসরি ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে।

পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক এই ভাষাপ্রকৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালের পরপরই উর্দুকে একক রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ এবং ১৯৪৮ সালে গভর্নর জেনারেল হিসেবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকায় দেওয়া বক্তব্য, যেখানে তিনি ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, ভাষাকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতীকে রূপ দেয়। তুলনামূলক দৃষ্টিতে দেখা যায়, ভারতসহ দুনিয়ার বহু রাষ্ট্রেই একটি ভাষা ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে প্রশাসনিক সুবিধার্থে; কিন্তু পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে উর্দুকে আরোপের প্রচেষ্টাকে সেই সময়কার বামপন্থী বুদ্ধিজীবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এঅঞ্চলে কেন্দ্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হিসেবে প্রতিভাত হয়। ফলে এ রাষ্ট্রভাষা ভাষানীতিকে একটি সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ-কৌশল হিসেবে যুক্তি দাঁড় করানো সহজ হয়েছিল।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যার বেদনাদায়ক চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখি ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদদের আত্মদানে। ভাষার অধিকার আদায়ে আত্মাহুতি প্রমাণ করে যে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; তা আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকারবোধের কেন্দ্র। মাতৃভাষার দাবি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে রূপান্তরিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়, তা ছিল সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির পাশাপাশি রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম। ভাষা এখানে প্রতীকে পরিণত হয় অধিকারবঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মিলিত চেতনার প্রতীক হিসেবে। উনিশ শতকের শুরু থেকে এই ভূখণ্ডে ভাষা ক্রমশ রাজনীতির মোক্ষম অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। কখনো মানবিকীকরণের নামে, কখনোওবা আধুনিকীকরণের নামে ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ করার প্রচেষ্টা, কখনো রাষ্ট্রীয় একত্রীকরণের নামে একভাষিকতার আরোপ, আবার কখনো জাতীয়তাবাদের মোড়কে ভাষাকে আবেগীয় সমাবেশের কেন্দ্রে স্থাপন প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে। ফলে প্রশ্নটি কেবল কোন শব্দ গ্রহণযোগ্য বা ভাষার প্রকরণে কোন রীতি মান্য এতটুকু নয়; প্রশ্নটি হচ্ছে, কে ভাষার মান নির্ধারণ করবে এবং সেই মান নির্ধারণের মাধ্যমে কাদের কণ্ঠকে কেন্দ্রে আর কাদের কণ্ঠকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হবে।

বিগত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ব্যবহৃত ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শ্লোগানটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে অস্বাভাবিক দ্রুততায় জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ শব্দবন্ধটির ঐতিহাসিক শিকড় কিন্তু প্রথিত আছে ব্রিটিশবিরোধী উপনিবেশিক উপমহাদেশে প্রতিরোধ আন্দোলনে, বিশেষত বিপ্লবী চেতনার প্রকাশে। উপমহাদেশে এই শ্লোগানকে সর্বাধিক পরিচিত করে তুলেছিলেন বিপ্লবী ভগত সিং ও তাঁর সহযোদ্ধারা; ‘ইনকিলাব’ (বিপ্লব) এবং ‘জিন্দাবাদ’ (দীর্ঘজীবী হোক) এই দুটি শব্দ মিলিয়ে এটি ছিল নিপীড়নবিরোধী আকাঙ্ক্ষার এক প্রতিবাদী সাংকেতিক ভাষা। ফলে শব্দবন্ধটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য কোনো একক রাষ্ট্র বা মতাদর্শে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা উপনিবেশবিরোধী ও আধিপত্যবিনাশী সংগ্রামের সামষ্টিক স্মৃতির অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের একশ্রেণির রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী তাদের বয়ানের রাজনীতির ভেতর দিয়ে এই শ্লোগানটিকে পাকিস্তানপন্থিতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। ভাষাতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের বদলে এখানে দেখা যাচ্ছে একটি অর্থ-স্থানান্তর (সেমেন্টিক রিফ্রেইমিং) যেখানে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রতিবাদী উচ্চারণকে নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ভাষাগত ঐতিহ্যের সঙ্গে আটকে ফেলার প্রয়াস চলছে। এ ধরনের বয়ান তৈরির কৌশল নতুন নয়; রাজনৈতিক তত্ত্বে এটি ‘বয়ান নিয়ন্ত্রণ’ (ডিসকোর্স কন্ট্রোল) হিসেবে পরিচিত যেখানে শব্দের অর্থ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনমতের গতিপথ প্রভাবিত করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের যুবসমাজের কাছে ‘ইনকিলাব’ শব্দটির গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার পেছনে আধিপত্যবাদ বিরোধী জুলাই আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা শহীদ ওসমান হাদীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি যখন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শ্লোগানকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং পরবর্তীতে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন, তখন শব্দটি কেবল শ্লোগানের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদী চেতনার সাংগঠনিক রূপ। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে যে রাজনৈতিক আলোড়নের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা প্রমাণ করে শব্দ কখনও কখনও ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ ভাষা গণমানুষের আবেগকে সংক্রামিত ও সংগঠিত করে, আর সংগঠিত আবেগ রাজনৈতিক রূপান্তরের শক্তি তৈরি করে।

এখানেই প্রশ্ন জাগে: একটি শব্দবন্ধকে হঠাৎ করে অপাঙ্ক্তেয় ঘোষণার এই প্রচেষ্টা কি সত্যিই ভাষার বিশুদ্ধতার প্রশ্ন, নাকি ক্ষমতার অপকৌশল? যদি ভাষার বিশুদ্ধতার প্রশ্ন হতো, তবে ঐতিহাসিক ব্যবহার, প্রেক্ষিত ও অভিধার্থের আলোচনাই মুখ্য হতো। কিন্তু যখন একটি শব্দকে প্রশাসনিক বা নৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তখন বোঝা যায় এটি মূলত রাজনৈতিক আবেগকে পুনর্নির্দেশ করার প্রয়াস। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ‘কাঠামোকরণ প্রভাব’ (ফ্রেমিং ইফেক্ট) যেখানে একই শব্দকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে তার আবেগীয় প্রতিক্রিয়া বদলে যায়।

লক্ষ্যণীয় যে, বর্তমানের ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বিতর্ক ঐতিহাসিকভাবে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং পুরোনো হেজিমনিক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি। একটি নির্দিষ্ট শব্দবন্ধের ব্যবহার নিয়ে হঠাৎ করে ময়দান উত্তপ্ত করে তোলা নিছক ভাষাগত শুদ্ধতার অনুসন্ধান নয়; বরং এটি অর্থ-নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষেত্র পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা। ভাষাকে যদি সামাজিক প্রবাহের স্বাভাবিক গতিতে চলতে না দিয়ে ক্ষমতার বলয়ে আটকে রাখা হয়, তবে তা আবারও প্রমাণ করবে ভাষাপ্রকৌশল কখনও নিরপেক্ষ থাকে না; তা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিণতির দিকেই গড়িয়ে যায়। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এই অঞ্চলের মানুষের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে বারবার ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, এমনকি পরবর্তী নানা গণআন্দোলনেও এটি ছিল প্রতিরোধের ভাষা তথা অধিকারচেতনার স্লোগান। একটি শব্দবন্ধকে তার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবদ্ধ করা মানে ভাষার ভেতরে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়াস; যা শাসকের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তিরই বর্হিপ্রকাশ। ভাষাপ্রকৌশলে এমন ধারার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ভাষা তখন আর মুক্ত উচ্চারণ কিংবা মুক্তকন্ঠে বলার স্বাধীনতা (ফ্রীডোম অব স্পিচ) থাকে না; গণমানুষের মুখের ভাষা হয়ে ওঠে অনুমোদিত ও অননুমোদিত শব্দের তালিকা। এই প্রবণতা নতুন নয়; অতীতেও আমরা অনেক দেখেছি। ভাষাতত্ত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বহুবার দেখা গেছে, শব্দের অর্থকে সংকুচিত বা বিকৃত করে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পুনর্নির্মাণ করা হয়।

ফরাসি চিন্তক মিশেল ফুকো (১৯২৬ – ১৯৮৪) দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা কেবল দমন করে না; বরং জ্ঞান ও বয়ানের কাঠামো তৈরি করে কোন শব্দ গ্রহণযোগ্য, কোনটি বিতর্কিত, কোনটি নিষিদ্ধ এসব নির্ধারণের মধ্য দিয়েই ক্ষমতা কাজ করে। ফলে একটি ঐতিহাসিকভাবে বহুব্যঞ্জনাময় শব্দবন্ধকে ‘রাজনৈতিকভাবে সন্দেহজনক’ আখ্যা দেওয়া আসলে বয়ানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশল। আমাদের আরও স্মরণে রাখতে হবে, শহীদ ওসমান হাদীর বিচারের দাবিকে পাশ কাটিয়ে ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক তোলা কৌশলগতভাবে ‘ইস্যু স্থানান্তর’-এর একটি পরিচিত পদ্ধতি এবং প্রয়াস। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় একে প্রায়ই ‘ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার রাজনীতি’ (ডাইভারশন পলিটিক্স) বলা হয় যেখানে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন সামনে এলে তা থেকে জনমত সরিয়ে নিতে একটি আবেগতাড়িত, বিভাজনসৃষ্টিকারী ইস্যু সামনে আনা হয়। বিচার ও দায়বদ্ধতার আলোচনাকে আড়াল করতে শব্দের বিশুদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক উসকে দেওয়া তাই নিছক ভাষাগত উদ্বেগ নয়; বরং রাজনৈতিক অপকৌশল।

এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে: আমরা কি সত্যিই ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা করছি, নাকি ভাষাকে কেন্দ্র করে এমন এক আবেগঘন বিভাজন তৈরি করছি যা মূল প্রশ্ন ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অধিকারের দাবিকে আড়াল করে দেয়? ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, যখনই ক্ষমতা সংকটে পড়ে, তখনই বয়ানের পরিসরে নতুন উত্তাপ তৈরি হয়। বিশেষ কোন শব্দ তখন হয়ে ওঠে প্রতিস্থাপিত যুদ্ধক্ষেত্র। অথচ ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহকে রুদ্ধ করে কোনো সমাজ কখনও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারেনি; কারণ ভাষা শেষ পর্যন্ত মানুষের চেতনা, অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানেরই প্রতিফলন। সেই প্রতিফলনকে দমন করার চেষ্টা মানে বাস্তবতাকেই অস্বীকার করা।

রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালনার ভার যাদের উপর ন্যস্ত, তাদের মনে রাখতে হবে যে, গণমানুষের সামষ্টিক স্মৃতি থেকে পূর্ববর্তী শাসকের অন্যায়, অবিচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের ভয়তাড়িত জুলাইয়ের ট্রমা কখনও এত সহজে মুছে যাবে না। রাজনৈতিক দলীয় অন্ধত্ব কিংবা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থচিন্তা হয়তো তাৎক্ষণিক বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু ইতিহাস ও সাহিত্য আমাদের সতর্ক করে দেয়। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের (১৯০১–১৯৬০) ভাষায় বর্তমান সরকারের কাছে প্রশ্ন, ‘অন্ধ হলে কী প্রলয় বন্ধ থাকে’? বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অপকৌশল আসলে ক্ষমতার আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে এক স্থায়ী সতর্কবার্তা। চোখ বুজে থাকলে বিপর্যয় থেমে যায় না; বরং অদৃশ্য সঞ্চয়ের মতো তা জমতে থাকে এবং একসময় বিস্ফোরিত হয়। সময়ই তার সাক্ষ্য দেয়, যেমন দিয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবীকে অবহেলা করার মধ্য দিয়ে। ক্ষমতা প্রায়ই মানুষকে এক ধরনের অনৈতিক অন্ধত্বে আচ্ছন্ন করে। ক্ষমতাসীনদের একটি প্রচলিত বিশ্বাস হলো ভাষা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বয়ান নিয়ন্ত্রণ করা যাবে; আর বয়ান নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ইতিহাস পুনর্লিখন সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, আরোপিত বয়ান দীর্ঘস্থায়ী হয় না যদি তা জনগণের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়। সমাজ-মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, দমন করা স্মৃতি কখনও নিঃশেষ হয় না; তা দমিত অবস্থায় থেকে পুনরুত্থানের সুযোগ খোঁজে। যুগে যুগে দেশে দেশে স্বৈরাচারীরা নিজেদের ক্ষমতার ব্যবহারকে অমোঘ ভেবেছে; অথচ শেষ পর্যন্ত জনগণের সংগঠিত স্মৃতি ও প্রতিরোধই তাদের ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে।

বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে, জুলাই বিপ্লবের উত্তেজনা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে প্রশমিত হয়েছে, কিন্তু সামষ্টিক স্মৃতির দগদগে ক্ষত এখনো অম্লান। যে রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে বঞ্চিত, নিপীড়িত ও উত্তেজিত যুবসমাজ তাদের জীবনে একটি বিশেষ সময় অতিবাহিত করেছে, সেই ট্রমার সামষ্টিক স্মৃতির ভেতরে থাকা আবেগকে উপেক্ষা করা বা তা নিয়ে কৌশলী খেলা করা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। এই প্রেক্ষাপটে যদি ভাষাকে আবারও তথাকথিত বিশুদ্ধতার খাঁচায় বন্দি করার প্রয়াস নেওয়া হয় তবে তা বাংলা ভাষার ইতিহাসে তৃতীয় দফা ভাষাপ্রকৌশলের উদাহরণ হয়ে থাকবে। আরোপিত শুদ্ধতার মানদণ্ড সাধারণত সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়; ফলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। চারপাশে যে প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান, তা এই সত্যেরই পূর্বাভাস। রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে ভাষা-সংক্রান্ত বিতর্ককে অহেতুক উসকে দেওয়া কোনো সুদূরপ্রসারী নীতি হতে পারে না। বরং সরকারের নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব হওয়া উচিত রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং যারা বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে জাতিকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চায়, তাদের নিবৃত করা। ভাষা তখনই সুস্থ থাকে, যখন তা মানুষের স্বাভাবিক ব্যবহারের ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়; আর রাষ্ট্র তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন তা জনগণের স্মৃতি, আবেগ ও ন্যায়ের দাবিকে সরকার সম্মান করে।
একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই আমাদের সামনে আসে: প্রকৃত অর্থে ভাষা কার? ভাষা কোনো মন্ত্রণালয়ের দাপ্তরিক সম্পত্তি নয়, কোনো একক মতাদর্শের উত্তরাধিকারও নয়। এটি একটি যুথবদ্ধ জনগোষ্ঠীর সম্পদ, বিশেষ করে জনগণের সম্মিলিত সৃজন। ভাষা তাদের জীবন, শ্রম, ভালোবাসা, প্রতিবাদ, কান্না ও স্বপ্নের ভেতর দিয়ে কালের আবহে নির্মিত এক চলমান ঐতিহ্য।

সমাজভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় ভাষাকে দেখা হয় ‘যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা’ (লিভড এক্সপেরিয়েন্স)-এর অংশ হিসেবে; অর্থাৎ ভাষা কেবল ব্যাকরণ বা শব্দতালিকার সমষ্টি নয়, বরং সামষ্টিক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ। যে জনগণ ভাষা ব্যবহার করে, তারাই শেষ পর্যন্ত ভাষার রূপ নির্ধারণ করে। ইতিহাসে বাংলা ভাষার প্রকৌশলের প্রয়োগ যাঁরা করেছেন, বিশেষ করে উপনিবেশিক প্রশাসক, ব্রাহ্মণ্যবাদী পণ্ডিত, জাতীয়তাবাদী শিল্পী-সাহিত্যিক কিংবা তথাকথিত সুশীল অভিজাতগোষ্ঠী তাঁরা প্রত্যেকেই ভাষাকে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কখনো শাসনের সুবিধার্থে, কখনো সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায়, কখনো জাতীয় পরিচয়ের একমাত্রিক কাঠামো নির্মাণে। কিন্তু তাদের নির্ধারিত মান কখনও স্থায়ী হয়নি, যদি না সেটা জনগণের দৈনন্দিন ব্যবহার ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে। ভাষার চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করেছে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনচর্যায় তথা হাটে-বাজারে, মাঠে-ঘাটে, কল-কারখানায়, মঞ্চে-ময়দানে, উৎসবে-আন্দোলনে। ফলে আজ যদি গণমানুষের প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে ভাষা তার সহজ-সরল, জীবনমুখী রূপে ফিরে যেতে চায়, সেটি কোনো বিচ্যুতি নয়; বরং ভাষার স্বাভাবিক প্রবণতা ও জীবনবাস্তবতায় তার পুনর্জাগরণ।

বানভাঙা জোয়ারের মতো জনগণের কণ্ঠস্বর যখন প্রতিষ্ঠাকামী ভাষাপ্রকৌশলকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন সেটিই ভাষার প্রকৃত গণতন্ত্রায়ন। ভাষার গণতন্ত্রায়ন মানে এই নয় যে সব রীতি ভেঙে পড়বে; বরং মানে হলো ভাষার নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়া কোন বিশেষ গোষ্ঠীর হাত থেকে সরে এসে বহুস্বরের সম্মিলনে বিকশিত হবে। এখানে ভাষা হয়ে ওঠে অংশগ্রহণমূলক কেন্দ্র থেকে প্রান্তে নয়, প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে প্রবাহিত। এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি প্রশ্ন তোলা যায়: দেশে সত্যিকার অর্থে নির্বাচিত সরকারের সামনে পাহাড়সম সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলায় ব্যবহৃত বিশেষ শব্দগুচ্ছ নিয়ে ময়দান উত্তপ্ত কেন? কারণ ভাষা মানে কেবল শব্দের বিন্যাস নয়; তা পরিচয়, স্মৃতি, ইতিহাস ও ক্ষমতার প্রশ্ন। শব্দের ভেতরেই থাকে অতীতের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। তাই ভাষাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা মানে সেই পরিচয় ও স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। শাসকদের মনে রাখতে হবে যে, ইতিহাসের শিক্ষা সুস্পষ্ট: ভাষাকে শাসন করে, ভয় দেখিয়ে বা প্রশাসনিক বিধিনিষেধে বেঁধে স্থায়ীভাবে দমন করা যায় না। আমাদের ভাষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। ভাষা বেঁচে থাকে জনগণের মুখে তার অবাধ প্রয়োগে এবং অন্যায় দেখলে প্রতিবাদে উচ্চারিত হওয়ার সাহসে। যখনই ক্ষমতা ভাষাকে সংকুচিত করতে চেয়েছে, তখনই প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠেছে। কারণ ভাষা শেষ পর্যন্ত মানুষের আর মানুষের সম্মিলিত চেতনা কোনো ক্ষমতাধরের প্রকৌশলের খাঁচায় দীর্ঘকাল বন্দি থাকে না।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।