প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত
এনটিআরসিএ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ সময়ের দাবী
২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২৮ ১৮:০১:৩৫
নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে অবহেলিত হচ্ছে মাধ্যমিক স্তর একথা এখন সর্বজন স্বীকৃত। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার ৯৭ ভাগই বেসরকারি এমপিওভূক্ত শিক্ষা। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা যে পরিমাণে রাষ্ট্রের সুযোগ সুবিধা ভোগ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্তরা সে সুযোগ পায় না। অথচ রাষ্ট্রের সকল জনগণ শিক্ষাখাতে একই পরিমাণ সুযোগ ভোগ করার কথা। কিন্তু সমস্যা হলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় শিক্ষাকে নিয়ে যে পরিমাণে শব্দ করা হয় তার ধারে কাছেও কাজ নেই। এখনও পর্যন্ত শিক্ষায় ব্যয়িত অর্থ খরচ হিসেবেই দেখানো হয়। তা কখনও বিনিয়োগ হিসেবে ভাবা হয় না।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হলে প্রথমেই শিক্ষকদের মান উন্নত করতে হবে। শিক্ষকদের মান উন্নত করার জন্য যেমন আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন তেমনি ভালো শিক্ষক নিয়োগ দেয়া আরো জরুরি। অন্যদিকে ভালো বেতন কাঠামো না হলে মেধাবীরা এ পেশায় আকৃষ্ট হবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে যে বিষয় গুলোতে প্রাইভেট পড়ানো যায় সেই বিষয়গুলোতে মেধাবীরা কিছুটা আকৃষ্ট হচ্ছে। তাই সবদিক বিবেচনা করে ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে হলে একটি ভালো নিয়োগ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি। সেই লক্ষ্যেই সরকার শিক্ষক নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএ তৈরি করেন। দেশের বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে যুগান্তকারী সংযোজন ছিল এনটিআরসিএ (NTRCA - Non-Government Teachers' Registration and Certification Authority) গঠন। যেটি ২০০৫ সালে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে গঠিত নিবন্ধিত ও প্রত্যায়ণকারী প্রতিষ্ঠান। যার কাজ হলো পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন করে এবং এমপিওভূক্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ করে থাকে। প্রায় ৩০ হাজারের অধিক প্রতিষ্ঠানে এনটিআরসিএ নিয়োগের সুপারিশ করে থাকে। যার ফলে মানসম্মত শিক্ষার্থীরা নিয়োগ নেয়ার জন্য আবেদন করে আসছে যদিও এখন পর্যন্ত শিক্ষকতা পেশাকে আমরা উপরের স্তরে আনতে ব্যর্থ হয়েছি।
২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত শুধুমাত্র সার্টিফিকেট প্রদান করতো এনটিআরসিএ যার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা কমিটি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারতেন। পরবর্তী সময়ে নিয়োগের প্রক্রিয়াটিও এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ নিজ হাতে তুলে নেয়। ফলে দুর্নীতি মুক্ত থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে থাকে। একথা ধ্রুব সত্য যে এনটিআরসিএ নিয়োগ শুরু করার পর থেকে দেশের বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছুটা সু বাতাস বইতে শুরু করে। একটা সময় শিক্ষতাকে একটা শ্রেণি নেশা হিসেবেই নিয়েছিল কিন্তু তা ক্রমান্বয়ে পেশা হিসেবে তৈরি হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে এসব নিয়োগকে অতি মাত্রায় বাণিজ্যিকিকরণ করা হয়েছে। নিয়োগের এব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে যার ফলে শিক্ষক হিসেবে খুব বেশি ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। নিয়োগকর্তারা এটাকে উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে। তাই বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্যান্য চাকুরির তুলনায় যতকিঞ্চিৎ সুযোগ সুবিধা বাড়লেও ভালো মানের শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এটা বলা চলে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষকদের এন্ট্রি হলেও প্রশাসনিক পদগুলো রয়ে যায় মেধাবীদের কাছে অধরা এবং প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়া পূর্ণতা পায়নি। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই দলীয়করণ ও অর্থের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের ফলে বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন জেগেছে। যোগ্যরা নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন যার প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানে। যার প্রেক্ষিতে জনগণ ও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের একটা দাবী ছিল এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ-প্রধান নিয়োগের। বেসরকারি শিক্ষায় ব্যবস্থায় সম্প্রতি এ নতুন ধারা সংযোজন হওয়ার পরও আকাশে কালো মেঘের হাতছানি দেখা যাচ্ছে।
গত ২৯ জানুয়ারি এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ-প্রধান নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। যার মধ্যে রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন ১০ হাজার ২৭৮টি, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন ১৫০ টি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন ৩ হাজার ১৩১ টি পদ। প্রথমে আবেদনের সময় ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেয়া হলেও পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত করা হয়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ি ৮১ হাজারের উপরে আবেদন পরে। যা থেকে আমরা আশার আলো দেখতে পাই। কিন্তু সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর সাথে আলোচনায় শিক্ষকদের পক্ষ থেকে কিছু সংখ্যক শিক্ষক নেতা এনটিআরসিএ কর্তৃক প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহ-প্রধান নিয়োগের যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে তা বাতিল করে নিয়োগের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে হস্তান্তরের দাবী জানায়। যার ফলে শিক্ষকদের মাঝে চরম ক্ষোভের জন্ম নেয়। শুধুমাত্র আবেদনকারীরাই নয় সাধারণ শিক্ষক ও জনগণ এই প্রস্তাবের জন্য চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দীর্ঘ দিনের চাওয়া একটি সুন্দর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না বলেই মনে হয়। এমনিতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন ও পরবর্তী সময়ে এই ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে এলাকায় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অসেন্তাষ বিরাজ করে প্রায় সময় যার ফলে শিক্ষার মান নষ্ট হয়।
এছাড়াও স্থানীয় প্রভাবশালীরা অর্থের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান থাকায় নিজের ইচ্ছে মতো কাউকে পরোয়া না করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে যার কারনে প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে পড়ছে। এই এনটিআরসিএ গঠন করা হয়েছিল বিগত বিএনপি সরকারের আমলে। তাই বর্তমান প্রচেষ্টা থাকতে হবে বেসরকারি এমপিওভূক্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা। শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কোন বিকল্প নেই। অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়ে পড়ার মান বাড়ানো এখন সময়ের দাবী। নিয়োগ প্রক্রিয়া সুন্দর করে বদলী ব্যবস্থা চালু করলে শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে ব্যাপক কাজে লাগবে বলে শিক্ষকরা মনে করেন।
লেখক : শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী।
