প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
ওড়াকান্দির স্নানোৎসব
২০২৬ মার্চ ১৬ ২০:২৮:০০
তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : লাখ লাখ মতুয়া ভক্তের অংশগ্রহণে আজ সোমবার থেকে শুরু হয়েছে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার শ্রীধাম ওড়াকান্দির স্নানোৎসব ও মহা-বারুণীর মেলা।
মতুয়াবাদের প্রবত্তক শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ২১৫ তম অবির্ভাব তিথি উপলক্ষে এ স্নানো উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।
আজ সোমবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে থেকে শুরু হয়েছে এ স্নানোৎসব।, চলবে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সকাল পৌনে ৯টা পর্যন্ত। এ উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের মহা-বারুণীর মেলা চলবে বুধবার ( ১৮ মার্চ) রাত পর্যন্ত। মেলায় দেশজ, কুটির শিল্প, মৃৎ শিল্প, খেলনা সহ খাদ্য ও মিষ্টির দোকান বসেছে। এরআগে, সারা দেশ থেকে লাখ লাখ মতুয়াভক্ত লাল নিশান উড়িয়ে ঢাক, ঢল বাজিয়ে চারিদিক হরিবোল ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে ওড়াকান্দির ঠাকুর বাড়িতে আসেন । তারপর হরি মন্দিরে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন ও মাতম শেষে অংশ নেন স্নানে।
প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে পাপ থেকে মুক্তি ও পূণ্য লাভের আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত, ভারত সহ বিদেশের ১৫ লাক্ষাধিক পূর্ণাথী অংশ নিবে এ স্নান উৎসবে। এমনটি জানিয়েছেন ওড়াকান্দির ঠাকুর পরিবারের সদস্যরা । এ উপলক্ষে ওড়াকান্দির ঠাকুর বাড়ির আশাপাশের অন্তঃত ৫ কিলোমিটার এলাকাসহ সারা জেলা জুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
এবছর ১৭ মার্চ মঙ্গলবার ব্রহ্মমূহুর্তে বাংলাদেশ মতুয়া মহাসংঘের মহাসংঘাদিপতি ও ঠাকুর পরিবারের প্রবীণ সদস্য শ্রীমতি সীমাদেবী ঠাকুরের নেতৃত্বে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও পূজাঅর্চণা করা হবে। তার কামনা সারবরে (বড় পুকুর) স্নান করে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় বিশেষ প্রার্থণায় অংশ নেবেন।
এবছর স্নান উৎসবে যোগ দেওয়া লাখ-লাথ ভক্তদের সমাগমে মুখরিত হয়ে উঠছে ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়ি। ভক্তরা মন্দিরে পূজাঅর্চনা শেষে ঠাকুর বাড়ির কামনা সারবর ও শান্তি সরবরে স্নান করে ঠাকুরের কাছে পাপ থেকে মুক্তি, পুন্য লাভের আশায় প্রার্থনা করেন।
এদিকে স্নান ও মেলা শান্তিপূর্নভাবে সম্পন্ন করতে গোপালগঞ্জ-০১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিম, গোপালগঞ্জ-০২ আসনের ডা. কেএম বাবর সহ প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার সভা করে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।এছাড়া রোববার (১৫ মার্চ) ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক ওড়াকান্দি ঠাকুর বাড়ি পরিদর্শন করে নিরাপত্তার বিষয়টি তদারকি করেন। নিরাপত্তায় কোন ঘাটতি হবেনা বলে গণমাধ্যম কর্মীদের জানান। ইতিমধ্যে সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর, জেলা প্রশাসক মোঃ আরিফ- উজ- জামান, পুলিশ সুপার মোঃ হাবীবুল্লাহসহ পদস্থ কর্মকর্তারা ওড়াকান্দি পরিদর্শন করেছেন।
স্নানোৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি ও শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ষষ্ঠ পুরুষ শ্রী অমিতাভ ঠাকুর বলেন, এ উৎসবকে ঘিরে ভক্তদের বসবাস ও প্রসাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের পাশাপাশি মতুয়া ঘরানার ৬ শতাধিক স্বেচ্ছাসবক ভক্তদের থাকা ও প্রসাদ বিতরণ করবেন। পাশাপাশি তারা ঠাকুর বাড়িতে পূণ্যার্থী প্রবেশ ও বের হওয়া সার্বিক বিষটি নিরাপদে তদারকি করবেন। এছাড়া ভক্তদের সেবায় একাধিক মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা রয়েছে ।আশাকরছি সবার সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ন ভাবে সম্পন্ন হবে।
ঠাকুর পরিবারের তন্যতম সদস্য ও কাশিয়ানী উপজেলা পরিষদের একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মতুয়া আচার্য সুব্রত ঠাকুর হিল্টু বলেন, দেশ বিদেশের ১৫ লক্ষাধিক মানুষ ওড়াকান্দির বারুনী মেলা ও স্নানোৎসবে যোগ দিতে আসবেন। আমরা ষষ্ঠ পুরুষ হিসেবে এ উৎসব উদযাপন করে চলেছি। এতে আমরা বিশ্বের মানবজাতির শান্তি কামনায় প্রার্থণা করি। এবারও সেটার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার মোঃ হাবীবুল্লাহ বলেন, আমি ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ি পরিদর্শন করেছি। কমিটির লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। মতুয়া ভক্তদের অনুষ্ঠানটি যাতে শান্তিপূর্ন ভাবে সম্পন্ন হয় সে বিষয়ে পুলিশ বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। কোন ধরনের অপ্রিতিকর ঘটনা এড়াতে সিসি ক্যামেরা সহ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে এ উৎসব নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে শেষ করতে ঠাকুরবাড়ি পরিদর্শন করে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোঃ আরিফ- উজ- জামান। তিনি বলেন, ঠাকুর বাড়ি এলাকায় সুউচ্চ পর্যবেক্ষন চৌকি ও প্রবেশ পথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অর্ধশতাধিক সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। র্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এ বিষয়ে আয়োজক কমিটির সঙ্গে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার সভা করেছে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে লাখ লাখ মতুয়া ভক্তের স্নানোৎসবটি সম্পন্ন করতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
উল্লেখ্য, নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের ত্রাণ কর্তা হিসাবে ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ ফাল্গুন মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে কাশিয়ানী উপজেলার সাফলিডাঙ্গা গ্রামে আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রী-শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর। পাশ্ববর্তী ওড়াকান্দি গ্রাম ঠাকুরের সাধনা ও লীল ভূমির স্থল হয়ে ওঠে। সেখান থেকে ঠাকুর প্রচার করেন মতুয়াবাদ। ঠাকুরের অনুসারীদের বলা হয় মতুয়া। বিশ্বের কোটি-কোটি মতুয়ার কাছে ওড়াকান্দি মহাপবিত্র পুণ্যভূমিতে পরিনত হয়েছে । পরবর্তিতে তাঁর ছেলে শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ওড়াকান্দিতে হরিচাঁদ ঠাকুরের অবির্ভাব তিথি ঘিরে স্নানোৎসব ও মহাবারুণীর মেলা প্রচলন করেন । এ স্নানোৎসব ১৫০ বছরের ধরে চলে আসছে।
২০২১ সালের ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওড়াকান্দির ঠাকুর বাড়ি সফরে আসেন। এদিন তিনি শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে পূজাঅর্চনা শেষে ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের সাথে কুশল বিনিময় করেন।
(বি/এসপি/মার্চ ১৬, ২০২৬)
