প্রচ্ছদ » ফিচার » বিস্তারিত
সবুজ পাহাড় আর নীল জলরাশির মিতালি: কাপ্তাইয়ের মায়াবী জনপদ
২০২৬ মার্চ ১৮ ১৮:৩১:৩৮
রিপন মারমা, রাঙ্গামাটি : প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে রাঙ্গামাটির কাপ্তাইকে। একদিকে বিশাল নীল জলরাশি, অন্যদিকে আকাশছোঁয়া সবুজ পাহাড়। এই পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদী যেন বঙ্গোপসাগরের দিকে ধাবমান এক রূপালি রেখা। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের প্রবেশমুখেই পর্যটকদের স্বাগত জানায় ঐতিহাসিক রাম পাহাড় ও সীতা পাহাড়। আর এই দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে প্রমত্তা কর্ণফুলী বয়ে গিয়ে মিশেছে চট্টগ্রামের মোহনায়।
কাপ্তাইয়ের এই দুই পাহাড়ের সাথে জড়িয়ে আছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও রামায়ণের ইতিহাস। লোককথা অনুযায়ী, ত্রেতা যুগে পিতৃসত্য পালনের জন্য বনবাসকালে শ্রী রামচন্দ্র, দেবী সীতা ও লক্ষণ এই পাহাড়ে অবস্থান করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদীতে দেবী সীতা স্নান করতেন, যার নামানুসারে পাহাড় দুটির নামকরণ। বর্তমানে সীতা পাহাড়ের একটি মন্দির রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর নির্দিষ্ট তিথিতে পুণ্যার্থীরা ভিড় করেন। ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, রাম পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট এবং সীতা পাহাড়ের উচ্চতা ১৫০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত।
বন্যপ্রাণী ও বন রক্ষা একসময় কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ছিল হরেক প্রজাতির বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। তবে কালের বিবর্তনে বন সংকুচিত হওয়া ও শিকারিদের অত্যাচারে বন্য মুরগি ও বিভিন্ন দুর্লভ পাখি এখন বিলুপ্তপ্রায়। তবে আশার কথা হলো, এই বনে এখনো প্রায় ৫৫টি বন্য হাতির একটি বিশাল দল বিচরণ করছে। অতি সম্প্রতি এই দলে একটি হাতি শাবকের জন্ম হয়েছে, যা বনের প্রাণবৈচিত্র্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। হাতি ও বানর ছাড়াও মাঝেমধ্যে এখানে বিশাল অজগর সাপের দেখা মেলে।
বনের এই ঐতিহ্য রক্ষায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক স্বাধীন। অত্যন্ত সাহসী ও স্বাধীনচেতা এই কর্মকর্তা বন্যপ্রাণী শিকার রোধ এবং বনভূমি পুনরুদ্ধারে কঠোর ভূমিকা রাখছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
পর্যটনের অপার হাতছানি কাপ্তাই মানেই বৈচিত্র্যের মেলা। এখানকার আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের হাতছানি দেয়। দেশের একমাত্র কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এশিয়ার বৃহত্তম কেপিএম (KPM) পেপার মিলস। সবুজের চাদরে ডাকা ওয়াগ্গা চা বাগান এবং পাহাড়ের ঢালে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত 'নিসর্গ রিভার ভ্যালী এন্ড পড হাউস'।
ঐতিহাসিক চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার এবং নৌবাহিনীর নজরকাড়া পিকনিক স্পট ও নৌ-বিহারের সুযোগ।
যারা ট্রেকিং পছন্দ করেন, তাদের কাছে সীতা পাহাড়ের চূড়া অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখান থেকে কাপ্তাই লেক ও কর্ণফুলী নদীর সর্পিলাকার রূপ অপূর্ব দেখায়। রাম ও সীতা পাহাড় কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্যেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সব মিলিয়ে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ও এর আশপাশের এলাকা বাংলাদেশের পর্যটন খাতের এক অমূল্য সম্পদ। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বন্যপ্রাণী ও বনভূমি রক্ষা করা না গেলে এই সৌন্দর্য অচিরেই ম্লান হয়ে যেতে পারে। সরকারি নজরদারি ও স্থানীয় সচেতনতাই পারে কাপ্তাইয়ের এই ঐতিহ্যকে আজীবন টিকিয়ে রাখতে।
(আরএম/এসপি/মার্চ ১৮, ২০২৬)
