ঢাকা, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ৮ চৈত্র ১৪৩২

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

দার্শনিক ইবনে তাইমিয়ার ধর্মতাত্ত্বিক ভাবনা: আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহ ও হৃদয়বৃত্তির রক্তক্ষরণ

২০২৬ মার্চ ২২ ১৭:১১:০৬
দার্শনিক ইবনে তাইমিয়ার ধর্মতাত্ত্বিক ভাবনা: আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহ ও হৃদয়বৃত্তির রক্তক্ষরণ

দেলোয়ার জাহিদ


ঈদ উৎসবকে সামনে রেখে হঠাৎ করেই কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে চলে এলাম। রুটিনমাফিক জীবনযাপনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এক অন্যরকম পথচলা। বৈশ্বিক সংঘাত, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ভিড়ে নিজের অন্তরে খুঁজে ফিরছিলাম কিছুটা শান্তি—এক এমন মানসিক ও আবেগিক ভারসাম্য, যেখানে বাহ্যিক ঝড়ঝাপটা সত্ত্বেও মানুষ নিজেকে স্থির ও সমাহিত রাখতে পারে।

এই শান্তি মানে জীবনের সংকটহীনতা নয়, বরং প্রতিকূলতার মাঝেও স্থির থাকার শক্তি অর্জন। আত্মসচেতনতা, গ্রহণযোগ্যতা, জীবনের লক্ষ্য ও চিন্তা–আবেগ–কর্মের সমন্বয়ই সত্যিকার অভ্যন্তরীণ শান্তির উৎস।

বোস্টনের উচ্ছল ও দ্রুতগতির সমাজে এমন শান্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রযুক্তিগত উন্নতির চূড়ায় থেকেও আধুনিক মানুষ আজ অস্থিরতা ও একাকীত্বে আক্রান্ত। ভোগ ও আসক্তিই যেন তাদের মানসিক ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। এ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই আমার এক প্রিয় ভাগ্নে নাসিম আক্তার, নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, আমাকে একটি ছোট বই পড়তে দিল—শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহর “হৃদয়ের রোগ ও তার প্রতিকার।”

এই গ্রন্থটি কয়েক ঘণ্টায় আমাকে গভীর আত্ম-মননে ডুবিয়ে দিল। একজন ইসলামিক চিন্তাবিদ এমন সূক্ষ্মভাবে হৃদয়ের অশান্তির উৎস ও তার নিরাময়ের পথ নির্দেশ করতে পারেন—ভাবিনি। বইটি পড়ে মনে হলো, আধুনিক জীবনের অবসাদ, ভয় ও মানসিক বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ হলো নিজের ভেতরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।

ভালো কিছু করে দেখানোর প্রতিযোগিতা, ব্যর্থতার ভয় এবং অন্যের স্বীকৃতির লোভ আমাদের মানসিক শান্তিকে ক্ষয় করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তুলনা ও হীনম্মন্যতাকে উসকে দিচ্ছে, আর বস্তুবাদ সৃষ্টি করছে অসন্তোষ। ফলে মানুষ ক্ষণিক আনন্দকে শান্তি মনে করে, অথচ সত্যিকারের শান্তি মিলছে না কারোই —বরং গভীর অভাববোধে ভরে উঠছে মন।

ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, অভ্যন্তরীণ শান্তি কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, একটি চলমান আত্ম-শুদ্ধির প্রক্রিয়া। তিনি নির্দেশ করেন কয়েকটি মৌলিক গুণের অনুশীলন—

আত্মসচেতনতা: নিজের দুর্বলতা ও উদ্দেশ্য শনাক্ত করে নিজেকে বুঝে নেওয়া।

গ্রহণশীলতা: জীবনের পরিবর্তন ও অপূর্ণতাকে গ্রহণ করা।

উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধ: নৈতিকতা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন।

মননশীলতা: প্রার্থনা, ধ্যান ও আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে মন পরিষ্কার রাখা।

সহমর্মিতা ও ক্ষমা: রাগ ও বিদ্বেষের বোঝা থেকে মনকে মুক্ত করা।

ভারসাম্য: আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সংযম রক্ষা।

তিনি বলেন, হৃদয় হলো দেহের অধিপতি—এর পবিত্রতা বা কলুষতা মানুষের আচরণ নির্ধারণ করে। ঈর্ষা, অহংকার, কপটতা, অতিরিক্ত ভোগবিলাস ও ঈমানের দুর্বলতা—এসবই হৃদয়ের ব্যাধি। আর এসবের প্রতিকার হলো তওবা, জিকির, দোয়া, আন্তরিকতা, বিনয় ও সৎ মানুষের সান্নিধ্য।

“হৃদয়ের রোগ ও তার প্রতিকার” শুধু একটি ইসলামী আধ্যাত্মিক গ্রন্থ নয়, এটি নৈতিক মনোবিজ্ঞানের এক অসাধারণ নথি—যেখানে ধর্ম ও যুক্তি, মনন ও নৈতিকতা একসূত্রে গাঁথা। ইবনে তাইমিয়্যাহ দেখিয়েছেন, প্রতিটি আধ্যাত্মিক অসুস্থতার নিরাময় আছে, কিন্তু তা খুঁজে পায় সেই মানুষ, যে সত্যিকারের আত্মসমালোচনা করে ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।

বিশ্বজুড়ে যখন নীতিহীনতা, সংঘাত ও যুদ্ধ মানবতাকে ক্ষয় করছে, তখন ধর্মীয় দর্শনের নৈতিক সারাংশ—অর্থাৎ যুক্তি ও বিবেকের সঙ্গে বিশ্বাসের মিলন—এই মানবিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে অপরিহার্য। যুক্তি রাষ্ট্রকে দেয় কাঠামো; ধর্মীয় চেতনা দেয় সহানুভূতি। এই দুইয়ের সংমিশ্রণেই সম্ভব শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র ও মানবিক সমাজ গঠন।

আজ, যখন পৃথিবী ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান সংকটে নিঃশেষ হতে বসেছে, তখন আমাদের একমাত্র আশ্রয়—নিজের হৃদয়কে শুদ্ধ করা, মানবিক মূল্যবোধে ফিরে আসা, এবং শান্তিকে নিজেরই ভেতর থেকে খুঁজে নেওয়া।

লেখক : স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা; সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক।