ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬, ১০ চৈত্র ১৪৩২

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

অভাবের ঈদ বনাম বিত্তবানের বিলাসিতা

২০২৬ মার্চ ২৪ ১৮:২৯:১৭
অভাবের ঈদ বনাম বিত্তবানের বিলাসিতা

মীর আব্দুর আলীম


আকাশের এক কোণে রূপালি বাঁকা চাঁদ উঠেছে। এই চাঁদ কারো জন্য পরম আরাধ্য আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে, আবার কারো জন্য বয়ে আনে এক দীর্ঘশ্বাসমাখা রজনী। উৎসবের আলোকসজ্জায় যখন শহর সেজে ওঠে, যখন অভিজাত বিপণিবিতানগুলোতে আভিজাত্যের লড়াই চলে, ঠিক তখনই গলির অন্ধকার কোণে বসে এক বাবা তার সন্তানের ছেঁড়া জামার তালিগুলো গোনে। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এই হাহাকারের গল্পগুলোই যেন আমার এবারের জাতীয় এক দৈনিকের ঈদ সংখ্যায় লেখা ‘অভাবের ঈদ’ কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে “ওরে খোকা, সাজবি নাকি? ঈদ যে এলো দ্বারে! / ছেঁড়া জামার তালিগুলো ঢাকিস অলংকারে।”
কি অদ্ভুত এই বৈষম্য! একদিকে হাজার টাকার আতর আর রেশমি পাঞ্জাবির সুঘ্রাণ, অন্যদিকে ক্ষুধার জ্বালায় দিশেহারা মানুষের মলিন মুখ। আমরা যখন কয়েক পদের ফিন্নি আর কোর্মা নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি, তখন পাশের বস্তিতে এক শিশু হয়তো এক বাটি সেমাইয়ের আশায় নির্ঘুম রাত কাটায়। এই ঈদ কি তবে কেবল সামর্থ্যবানদের? নাকি উৎসবের নামে আমরা এক নিষ্ঠুর সামাজিক বিভাজনকে উদযাপন করছি?

আত্মসম্মানের ক্ষুধার রাজত্ব: একজন আত্মমর্যাদাশীল মানুষ তখনই অন্যের দুয়ারে হাত পাতে, যখন ক্ষুধার আগুন তার সমস্ত মেরুদণ্ডকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। ঔ কবিতায় বলেছি “মানসম্মান তোলা থাক ঐ সিন্দুকে আজ তাালা, পেটের জ্বালায় সব হয়েছে আজ যে দিশেহারা।” আমাদের সমাজে আজ দাতার সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু গ্রহীতার সম্মান কি বেড়েছে? বিত্তবানের বাড়ির সামনে তপ্ত রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা সেই ক্ষুধার্ত মানুষটি কি কেবল কিছু টাকার কাঙাল? না, সে আসলে আমাদের বিবেকের কাছে বিচার চাইছে। আমরা যখন জাকাত বা সাহায্যের নামে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের হাত ধরি, তখন কি আমরা তাদের অভাবকে উপহাস করি না? উৎসবের প্রকৃত মহিমা তো দানে নয়, বরং সহমর্মিতায়। সিন্দুকে বন্দি রাখা সম্মানের চেয়ে ক্ষুধার জ্বালা যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে সমাজ হিসেবে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।

অট্টালিকার উচ্ছিষ্ট ও রাজকীয় আহারের বিদ্রূপ: শহুরে অট্টালিকার ডাস্টবিনগুলো আজ আমাদের সমাজের রুচির পরিচয় দেয়। বিয়ের দাওয়াতে বা ঈদের ভোজ শেষে যে খাবারগুলো আমরা অবহেলায় ফেলে দিই, কবিতার ভাষায় তাই আজ অভাবীর কাছে ‘অমৃত আহার’। কি নিদারুণ সত্য! “অর্ধেক খাওয়া ফিন্নি কিংবা নরম কোনো হাড়, ওটাই তো আজ রাজকীয় সব অমৃত আহার।” ধনীর বিলাসিতা আর অপচয় যখন চরমে ওঠে, তখন পাশের বাড়ির ক্ষুধার্ত শিশুটি ডাস্টবিনের সেই উচ্ছিষ্টে উৎসবের স্বাদ খোঁজে। আমাদের উদ্বৃত্ত খাবার দিয়ে হয়তো অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব ছিল, কিন্তু আমরা বেছে নিয়েছি লোকদেখানো আভিজাত্য। এই বৈষম্যের পাহাড় আমাদের হৃদয়ে কোনো কাঁপুনি ধরায় না কি? আমাদের প্লেটের প্রতিটি দানা কি সেই অভুক্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে না?

উৎসব যখন বেঁচে থাকার যুদ্ধ: আমাদের কাছে ঈদ মানে নতুন ব্র্যান্ডের পোশাক, আইফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ায় রঙিন ছবির মেলা। কিন্তু যাদের জন্য ঈদ মানে বেঁচে থাকার এক অবিরাম যুদ্ধ, তাদের কাছে এই উৎসব এক নীরব অভিশাপের মতো। তারা নতুন জামা চায় না, তারা চায় দুবেলা পেট ভরে ভাত। তারা আতর চায় না, তারা চায় সন্তানের মুখে এক চিলতে হাসি। আমার কবিতার শেষ পঙক্তিটি আমাদের হৃদয়ে আঘাত আরো বাড়ায় “উৎসব মানে আমাদের কাছে বেঁচে থাকার যুদ্ধ, একটু সেমাই জুটলেই তবে মনটা হয় যে শুদ্ধ।” যেখানে এক মুঠো সেমাই পেলেই জীবন ধন্য মনে হয়, সেখানে আমাদের বিলাসিতা কি এক প্রকার নির্লজ্জতা নয়?

ঐতিহ্যের ঈদ বনাম হাহাকারের ব্যবচ্ছেদ: এক সময় ঈদ মানে ছিল পাড়া-প্রতিবেশী মিলে এক অনাবিল আনন্দ। বিত্তবানরা তাদের আঙিনায় বড় ডেকচিতে রান্না করতেন, আর গ্রামের প্রতিটি অভাবী মানুষের ঘরে সেই খাবারের ঘ্রাণ পৌঁছে যেত। আজ সেই সামষ্টিক আনন্দ রূপ নিয়েছে ব্যক্তিগত বিলাসিতায়। অট্টালিকার সুউচ্চ দেয়াল আজ পাশের কুঁড়েঘরের হাহাকারকে আড়াল করে দেয়। আমরা যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুমে বসে দামী সেমাইয়ের স্বাদ নিই, তখন সেই দেয়ালের ওপাশেই হয়তো কোনো মা তার সন্তানকে সান্ত্বনা দিচ্ছে এই বলে যে— “আজ রাতে ঘুমালে কাল হয়তো খাবার জুটবে।” এই বিচ্ছিন্নতা কি আমাদের আধুনিকতার অভিশাপ নয়?

শিশুমনের দীর্ঘশ্বাস উৎসবের নিষ্ঠুর বৈষম্য: একটি শিশুর কাছে ঈদ মানে নতুন জামার মচমচে শব্দ আর রঙিন জুতো। কিন্তু কবিতার সেই খোকা যখন দেখে তার বয়সী অন্য শিশুরা দামী ব্র্যান্ডের পোশাকে সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর তার পরনে কেবল ‘ছেঁড়া জামার তালি’, তখন তার অবুঝ মনে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তার দায় কার? এই মনস্তাত্ত্বিক বৈষম্য তাকে সমাজের প্রতি বিমুখ করে তোলে। বিত্তবানরা যদি তাদের সন্তানদের জন্য কেনা দামী পোশাকের বাজেটের সামান্য অংশ বাঁচিয়ে একটি পথশিশুর গায়ে নতুন জামা তুলে দিত, তবে সেই শিশুর চোখের উজ্জ্বলতা আকাশের চাঁদের চেয়েও বেশি আলো ছড়াত।

লোক দেখানো দান ও আধ্যাত্মিক শূন্যতা: আজকাল আমাদের দান-খয়রাত অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক আর কমেন্ট পাওয়ার সস্তা হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভাবী মানুষের হাতে পাঁচ কেজি চাল তুলে দিয়ে দশজন মিলে ছবি তোলা কি দান, নাকি তাদের দারিদ্র্যকে পুঁজি করে নিজেদের মহত্ত্ব প্রচার? কবিতায় বলা হয়েছে “তপ্ত রোদে দীর্ঘ লাইন, বিত্তবানের বাড়ি / যাকাত নিতেই কাটলো সময়, নেই তো আহামরি।” এই দীর্ঘ লাইন মানুষের আত্মাকে অপমান করে। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হলো- এক হাত দিলে অন্য হাত যেন না জানে। কিন্তু আমাদের প্রদর্শনীমূলক সংস্কৃতি আজ আধ্যাত্মিকতাকে গ্রাস করেছে। যে দানে বিনয় নেই, যে দানে গ্রহীতার সম্মান নেই, সেই দান কি স্রষ্টার দরবারে কোনো মূল্য রাখে?

বাজার সিন্ডিকেট ও মধ্যবিত্তের নীরব কান্না: উৎসব এলেই একদল অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী করে তোলে। এতে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হয় নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। বিত্তবানদের জন্য হয়তো চড়া দাম কোনো সমস্যা নয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য একটি ভালো মানের সেমাই বা এক কেজি চিনি কেনা আজ যুদ্ধের নামান্তর। এই ব্যবসায়িক নিষ্ঠুরতা ঈদের আনন্দকে বিষাদে পরিণত করে। যারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মুনাফা লুটছেন, তারাও হয়তো দামী পাঞ্জাবি পরে ঈদগাহে সামনের কাতারে দাঁড়াবেন। কিন্তু তাদের সেই মুনাফার আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের ক্ষুধার দীর্ঘশ্বাস।

ত্যাগের মহিমা বনাম ভোগের উন্মাদনা: ঈদুল ফিতরের মূল সুর হলো ত্যাগ। কিন্তু আমরা এই পবিত্র উৎসবকে আজ ভোগের উন্মাদনায় পরিণত করেছি। কে কত দামী গাড়ি নিয়ে ঈদগাহে গেল, কার বাড়ির রান্না কত বেশি রাজকীয় হলো এগুলোই এখন আলোচনার বিষয়। অথচ প্রকৃত আনন্দ ছিল নিজের ভাগের অংশটুকু অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়ায়। কবিতার শেষ অংশে বলা হয়েছে “একটু সেমাই জুটলেই তবে মনটা হয় যে শুদ্ধ।” এই সামান্য সেমাইটুকু জোগাড় করে দেওয়া কি খুব কঠিন কাজ? যদি প্রতিটি সামর্থ্যবান পরিবার কেবল তাদের অপচয়টুকু রোধ করে অভাবীদের পাশে দাঁড়াত, তবে এ দেশে কোনো শিশুর ঈদ আর ‘অভাবের ঈদ’ হতো না।

ধনীর বিবেক ও মানবিক দায়বদ্ধতা: ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী ধনীর সম্পদে গরিবের হক আছে। এটি কোনো করুণা নয়, বরং তাদের প্রাপ্য। অথচ আমরা সেই হক প্রদান করি এমনভাবে, যেন আমরা খুব বড় দাতা। এই দম্ভ আর অহংকার আমাদের আত্মাকে অন্ধ করে দিয়েছে। ঈদ আমাদের শেখায় ত্যাগের মহিমা, কিন্তু আমরা শিখছি ভোগের উৎসব। আজ যদি ধনীদের হৃদয়ে অভাবী মানুষের জন্য সামান্য দরদ তৈরি না হয়, তবে সেই উৎসব কি স্রষ্টার দরবারে কবুল হবে? বিত্তবানদের প্রতি বিনীত প্রার্থনা আপনার জাকাত কিংবা দান যেন লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষের অপমান না হয়। তাদের ঘরে গিয়ে নিভৃতে পৌঁছে দিন তাদের প্রাপ্য।

পরিশেষে, ঈদ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি আমাদের মানবিকতা পরীক্ষার দিন। আমার কবিতার সেই আর্তি যেন আমাদের পাষাণ হৃদয়ে কম্পন ধরায়। আসুন, আলোকসজ্জার পেছনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে আমরা দূর করি। আমাদের উচ্ছিষ্ট নয়, বরং আমাদের ভালোবাসা আর সম্মান যেন পৌঁছায় সেইসব মানুষের কাছে, যারা বছরের পর বছর কেবল অভাবের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। বিবেকের আদালতে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে—আমরা কি কেবল নিজের আনন্দই খুঁজেছি, নাকি অন্যের কান্না মোছাতে পেরেছি? এই ঈদে আমাদের হাত হোক প্রসারিত, হৃদয় হোক পঙ্কিলতামুক্ত। তবেই নীল আকাশে উদিত ঈদের চাঁদ সত্যিকারের সার্থকতা বয়ে আনবে।

লেখক : সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।