ঢাকা, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৪ চৈত্র ১৪৩২

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

কালিগঞ্জে অস্ত্রসহ ডাকাত সর্দার ইয়ার আলী ও তার সহযোগী উজ্জ্বল গ্রেপ্তার

২০২৬ মার্চ ২৮ ১৯:৩০:৫২
কালিগঞ্জে অস্ত্রসহ ডাকাত সর্দার ইয়ার আলী ও তার সহযোগী উজ্জ্বল গ্রেপ্তার

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও আন্তঃজেলা ডাকাত দলের প্রধান ইয়ার আলীকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের শংকরপুর গ্রামের আলমগীর হোসেনের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে তারই দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় পারিয়ে যাওয়ার সময় কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে তার সহযোগী আরিফুল ইসলাম উজ্জ্বলকে মটর সাইকেলসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ইয়ার আলী গ্রেপ্তারের পর এলাকাবাসীর মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

ইয়ার আলী(৪৪) কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের শংকরপুর গ্রামের আব্দুল জব্বার তরফদারের ও আরিফুল ইসলাম উজ্জ্বল (৩৪) বেনাদোনা গ্রামের মাহমুদ আলী বিশ্বাসের ছেলে।

কালিগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজীব হাসান জানান, আন্তঃজেলা ডাকাত দলের প্রধান ইয়ার আলী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চুরি, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। গোপন খবরের ভিত্তিতে তার ও র‌্যাব-৬ এর সাতক্ষীরার দায়িত্বপ্রাপ্ত জুনায়েদ জাহিদের সমন্বয়ে শুক্রবার আনুমানিক রাত সাড়ে ৭টার দিকে শংকরপুর গ্রামে এক যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে কৃষ্ণনগর এলাকার আলমগীরের বাড়ি থেকে ইয়ার আলী ও হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ সময় ইয়ার আলীর কাছ থেকে একটি ৯ এমএম পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি, ২টি ওয়াকিটকি সেট এবং ১০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ইয়ার আলীর বিরুদ্ধে কালিগঞ্জ,সাতক্ষীরা সদর,দেবহাটাসহ বিভিন্ন থানায় ডাকাতি, হত্যা, চাঁদাবাজি,ছিনতাইসহ ২৪ টির বেশী মামলা রয়েছে এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন। তার গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইয়ার আলীর দেওয়া তথ্য মতে ঢাকায় পালিয়ে যাওয়ার সময় কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে তার সহযোগী আরিফুল ইসলাম উজ্জ্বলকে মটর সাইকেলসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। গ্রেপ্তারকৃতদের শনিবার বিকেলে আদালতে পাঠানো হবে।

এদিকে কৃষ্ণনগরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ইয়ার আলী ও তার বাহিনীর সদস্যরা নিজস্ব ক্যামেরা ও ওয়াইফাই ব্যবহার করে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতেন। ওয়াইফাই ব্লক করা হলে তারা ওয়াকিটকিতে কথা বলতেন। এ ছাড়া বিশেষ সুবিধা দিয়ে কতিপয় পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখতো বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি মৌতলার এক বিকাশ এজেন্টকে জখম করে ১০ লাখ টাকা ছিনতাই এর ঘটনায় ইয়ার আলী সম্পৃক্ত ছিলো। তবে পুলিশ ও র‌্যাব এর জিজ্ঞাসাবাদে ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার ভাই বাহার আলীর মোটর সাইকেল ব্যবহার, মৌতলার এক ইয়াবা ব্যবসায়ি, রামনগরের ইয়াবা ব্যবসায়ি সাইফুল, ওই এলাকার বিল্লাল হোসেন, আলেক ওরফে ইসলাম, আশাশুনির জহুরুল ও হাবিবুল্লাহ জড়িত ছিল বলে স্বীকার করে। ইয়ার আলী গ্রেপ্তারের আগেই যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে তার ভাই সন্ত্রাসী বাহার আলী পালিয়ে যায়। এক মাস আগে ইয়ার আলীর অন্যতম সহযোগী তার ভগ্নিপতি একই গ্রামের রেজাউল ইসলাম অস্ত্রসহ দেবহাটা থেকে গ্রেপ্তার হয়। ২০২৪ সালের ১০ মে সদর উপজেলার যোগরাজপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা আবুল কালাম মোস্তফার বাড়িতে ডাকাতির ঘটনায় সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

কারাগারে যেয়ে গৃহকর্তা তাকে সনাক্ত করেন। এছাড়া দেবহাটার জগন্নাথপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সুভাস ঘোষের বাড়িতে ডাকাতি মামলা,সদর উপজেলার কাশেমপুর গ্রামের সিটি কলেজের পাশের এক বাড়িতে কৃষ্ণনগর ইউপি চেয়ারম্যান সাফিয়ার ব্যবহৃত প্রাইভেটকার পোড়ানো,সাফিয়ার বাড়ি জ্বালানোসহ বিভিন্ন মামলার আসামী ইয়ার আলী। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর ইয়ার আলী ও তার বাহিনীর হাতে এলাকার মানুুষ জিম্মি হয়ে পড়ে। তার নেতৃত্বে ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী ছেলেদের নিয়ে দ্বিতীয় বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এ বাহিনীর সদস্য সোতা গ্রামের আবু বক্কর, পলাশ, স্বাধীন, রাজগুল, শহীদুল, রফিকুল, ও শিমুলসহ কমপক্ষে ১৫ জন। বামনহাটি,চৌধুরাটি, সোতা,বালিয়াডাঙাসহ পার্শবর্তী গ্রাম গুলোতে তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র দেখিয়ে চাঁদাবাজির টাকা আদায় করে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যাবসায়ী ও চাকরিজীবীদের কাছ থেকে নিয়মিত লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করতো।

গত বছরের নভেম্বর মাসে সোতা এলাকার এক গ্রামপুলিশ মোসলেম এর স্ত্রী ইয়ার আলীর গুলিতে জখম হলে কোন মামলা করার সাহস হয়নি পরিবরের সদস্যরা। এমনকি সব কিছু জানার পরও পুলিশ ইয়ার আলীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। গত ২০ মার্চ বালিয়াডাঙা বাজারের নূর আলীর কাছে দুই টাকা টাকা চাঁদা দাবি করে ইয়ার আলী। দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় তার ৬০ বিঘা বোরো চাষের জমি থেকে মোটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি লুটপাট করার পর তার ছেলে মিয়ারাজ হোসেন বাবুকে অপহরণ করে দুই দিন আটক রাখা হয়। কৃষ্ণনগর এলাকায় ইয়ার আলীর বাহিনী সমান্তরাল প্রশাসন চালাতো। ইয়ার আলী সাতক্ষীরা সদরের যোগরাজপুরের অস্ত্রসহ কমপক্ষে এক ডজন মামলার আসামী সাদ্দাম হোসেন, রফিক পুলিশ, মনিরুলসহ কয়েকজনের একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন।

(আরকে/এসপি/মার্চ ২৮, ২০২৬)