প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
মেলেনি লাইসেন্স, পেছাচ্ছে জ্বালানী লোডিং
২০২৬ এপ্রিল ০১ ১৮:২৮:০১
স্বপন কুমার কুন্ডু, ঈশ্বরদী : লাইনেন্স না পাওয়ায় ৭ এপ্রিল হচ্ছে না রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানী (ইউরেনিয়াম) লোডিং। প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন প্রকল্পে জ্বালানী লোডিং ফের পেছানো হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন। অগ্নি নিরাপত্তা ইস্যুতে লাইসেন্স না পাওয়ায় আটকে গেছে পারমাণবিকের প্রথম ইউনিটের জ্বালানী লোডিং।
দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এখন দৃশ্যমান হয়েছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই প্রকল্প এরআগে উৎপাদনে যাওয়ার সময় একাধিকবার পিছিয়েছে। এমনকি প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে প্রায় দুই বছর আগে জ্বালানী (ইউরেনিয়াম) এসেছে। অবশেষে চলতি বছরের ১৫ মার্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক পত্রে জানা যায়, আগামী ৭ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে জ্বালানী লোডিং এর উদ্বোধন। অর্থাৎ পারমাণবিক চুল্লিতে বিক্রিয়ার জন্য সরবরাহ করা হবে জ্বালানী বা ইউরেনিয়াম রড। এসময় বলা হয় জ্বালানী লোডিং এর উদ্বোধনের সময় ভার্চুয়ালি অংশগ্রহন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
জ্বালানী লোডিং এর আগে আর্ন্তজাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনের (আইএইএ) তত্বাবধানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) কাছ থেকে পেতে হয় লাইসেন্স। এই বিয়য়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক চললেও মেলেনি জ্বালানী লোডিং এর অনুমোদন।
জ্বালানী লোডিং এর অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘সবই টিক ছিল, কিন্তু এখন একটু ক্রিটিক্যাল সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বলা হয়েছে। সেজন্য বেশী না, অল্প কয়েকদিনের জন্য জ্বালানী লোডিং শিফট করবে। তিনি আরও বলেন, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য-আমরা জান দিয়ে চেষ্টা করছি। এজন্য আমরা মসজিদ-মন্দির-উপসনালয়েও সকলকে প্রার্থনা করার জন্য অনুপ্রাণিত করছি।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, এর আগে নভেম্বরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কমপ্রিহেনসিভ সেফটি সিস্টেম টেস্ট সম্পন্ন হয়। ফিজিক্যাল স্টার্ট আপের (জ্বালানি লোডিং) প্রস্তুতির সামগ্রিক অবস্থা নিরীক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA), রাশিয়ার শিল্প ও কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা তদারকি সংক্রান্ত সংস্থা-ভিও সেফটি তিনটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল গত ৭ নভেম্বর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এসময় ২৫৭টি অবজারভেশন চিহ্নিত করা হয়। এসকল অবজারভেশনের মধ্যে ফের কিছু ক্ষেত্রে পুন:পরীক্ষা এবং অতিরিক্ত কিছু এসেসমেন্ট করার জন্য বলা হয়েছে। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যেই এগুলো সম্পন্ন হবে এবং তাড়াতাড়ি আমরা জ্বালানী লোডিং এর লাইসেন্স পেয়ে যাব।
এবিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন জানান, ১ তারিখের মধ্যে জ্বালানী লোডিং এর জন্য যে সমস্ত ডক্যুমেন্ট দেওয়ার কথা ছিল-সেগুলো আমরা দিয়েছি। বলা হয়েছিল, BAERA আমাদের কন্ডিশনাল লাইসেন্স দিবে- যদি আমাদের কোন গ্যাপ থাকে । যেহেতু ওনারা (BAERA) রেগুলেটরী ইনডিপেন্ডেড বডি, ওনাদের (BAERA) আরও কিছু অবজারভেশন আসছে। সেটা করতে আমাদের একটু সময় লাগবে।
পিডি ড. কবীর হোসেন আরও বলেন, মূলত: সমস্যা হয়েছে ফায়ার ফাইটিং সিষ্টেম-ফায়ার মেজারমেন্টে। ফায়ার ফাইটিং ডিপার্টমেন্টে ওনারা ফারদার ইন্সপেকশনে আসবেন। ফায়ার ইন্সপেকশন করবেন। তারপরে হয়ত জ্বালানী লোডিং। এগুলো প্রক্রিয়া করতে হয়ত সময় লেগে যেতে পারে। তারজন্য জ্বালানী লোডিং এর তারিখটা শিফট করতে হতে পারে- মনে হয় ৭ তারিখে হয়ত করতে পারবো না। তিনি আরও জানান, যে বিষয়গুলো নজরে আনা হয়েছে-তা সমাধান করে দ্রুতই লাইসেন্স পেতে চেষ্টা করা হবে।
জ্বালানী লোডিং এর লাইসেন্স পাবার আগে দুই দেশের (বাংলাদেশ ও রাশিয়া) সরকার প্রধানের সময় নিয়ে উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করায় অস্বস্তিতে পড়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার মাঝ রাত পর্যন্ত বৈঠক চলে বিজ্ঞান ভবনে। পরে জানানো হয়, পেছানো হচ্ছে জ্বালানী লোডিং উদ্বোধনের তারিখ।
জানা গেছে, জ্বালানী লোডিং এর উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই রসাটমের একটি টিম বাংলাদেশে এসেছে। রসাটমের উচ্চ পর্যায়ের আরো কয়েকজন প্রতিনিধি আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে পাল্টাপাল্টি আঘাত হানা হচ্ছে জ্বালানি স্থাপনায়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়মিত কমছে, বাড়ছে দাম। বাংলাদেশে ৭০ শতাংশের বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির উৎস কাতার উৎপাদন বন্ধ রাখতে পারে দীর্ঘ সময়। ফলে গ্যাস সংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানের পেণাস্ত্র হামলায় ‘ব্যাপক য়তি’ হওয়ায় শিগগিরই বাংলাদেশে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত সময়পোযোগী বলে মনে করেছিলেন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়রা।
প্রসঙ্গত: আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে সমীা চুক্তি এবং ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া প্রকল্পটিতে অর্থায়ন এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে।
মূল প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় এক লাখ তের হাজার কোটি টাকার সমান। এই ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। তবে করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করে ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত ধার্য করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ঋণ পরিশোধ শুরু করার সময়ও কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে।
প্রথম ইউনিটের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ এখনও শেষ হয়নি। প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এটি আগামী বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবমিলিয়ে, পুরো প্রকল্পের কাজ ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই অনুযায়ী, আগামী বছরের শুরুর দিকে রূপপুর থেকে প্রথম ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে সরবরাহের কথা রয়েছে।
(এসকেকে/এসপি/এপ্রিল ০১, ২০২৬)
