ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

একাধিক হত্যা মামলা থেকে বাঁচতে সাক্ষী ও তার স্বামীকে চুরির বদনাম দিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন

২০২৬ এপ্রিল ০৭ ১৯:৩১:৪৫
একাধিক হত্যা মামলা থেকে বাঁচতে সাক্ষী ও তার স্বামীকে চুরির বদনাম দিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : একটি শ্যালো মেশিনের ছোট পাইপ চুরি করে বিক্রির অভিযোগে সাতক্ষীরা সদরের কুচপুকুর নামক স্থানে এক দম্পতিকে গাছে বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পর নির্যাতনকারিরা ওই দম্পত্তির গাছে বাঁধা ছবি চোর আখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। গত বুধবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত এ নির্যাতন চালানো হয়।

অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ ও ৮ আগষ্ট কুচপুকুরে ঘরবাড়ি লুটপাট ও ঘর জ¦ালানো, ২০১৭ সালে রাসেল কবীর হতা , ২০১৯ সালে নজরুল হত্যা, ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর হাতে অস্ত্র, স্বর্ণ ও টাকাসহ গ্রেপ্তার হওয়া কুচপুকুরের শাহাজাহানের ছেলে মুকুল, অজিয়ারের ছেলে মগফুর ও একই গ্রামের শাহীনুরসহ একটি মহল পরিকল্পিতভাবে হত্যা মামলার সাক্ষী হিসেবে লাভলী ও তার স্বামী শরিফুল ইসলামের উপর এ নির্যাতন চালিয়েছে।

সাতক্ষীরা শহরের রসুলপুরের মোকছেদ গাজীর ছেলে বর্তমানে শহরতলীর কুচপুকুরে বসবাসকারি শরিফুল ইসলাম জানান, পাঁচ বছর আগে তার সঙ্গে কুচপুকুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের মেয়ে লাভলীর সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর থেকে তিনি কুচপুকুরে বসবাস শুরু করে শ্বশুরের চার বিঘা জমি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

তিনি জানান, ২০১৯ সালের ২২ জুলাই তার চাচা শ্বশুর কুচপুকুরের নজরুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার ৭ নম্বর চার্জশীটভুক্ত আসামী শাজাহানের ছেলে মুকুল ও ৬ নং আসামী অজিয়ার মোড়লের ছেলে মকফুর। একইভাবে ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তার শ্বশুর সিরাজুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা এবং ওই বছরের ৪ মার্চ তার চাচা শ্বশুর নজরুল ইসলামের ঘরবাড়ি লুটপাট শেষে জ্বালিয়ে দেওয়া মামলার আসামী মুকুল ও মগফুর। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল তার (শরিফুল) শ্যালক রাসেল কবীরকে গুলি ও বোমা মেরে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারভুক্ত ৪ নং আসামী মুকুল। এ ছাড়া তারই অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৭ মার্চ সাতক্ষীরা সেনা ক্যাম্পের সদস্যরা বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সাড়ে ছয় শত গ্রাম সোনা, একটি ৯ এমএম পিস্তল, ১০ রাউ- গুলি, নগদ ১২ লাখ টাকা, কয়েক হাজার ডলার, ৫ টি পাসপোর্ট বইসহ মুকুলসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। শ্বশুর, চাচা শ্বশুর ও শ্যালক হত্যা মামলার সাক্ষী তার স্ত্রী লাভলী খাতুন। এ সব মামলার সাক্ষী গ্রহণের কাজ শেষ পর্যায়ে। যে কারণে মুকুল, তার বাবা শাহজাহান, মখফুরসহ একটি গ্রুপ তাদেরকে হত্যার চেষ্টাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট সরকার পবির্তনের পর তার শ্বশুর ও চাচা শ্বশুরদের ঘরবাড়ি লুটপাট শেষে জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়।

৮ আগষ্ট তার বাড়ি লুটপাট শেষে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। গত পহেলা এপ্রিল দুপুর ১২টার দিকে তার স্ত্রী লাভলী খাতুন একটি কুড়িয়ে পাওয়া মটরের ছোট পাইপ এক ভাংড়ী বিক্রেতার কাছে বিক্রি করার পর তাকে(শরিফুল) চুরির অভিযোগে চাচা শ্বশুর নজরুল ইসলামের পুকুর পাড়ে কাঁঠাল গাছের সঙ্গে বেঁধে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায় মুকুল, মখফুর, শাহাজাহান, শাহীনসহ কয়েকজন। তার স্ত্রী লাভলী তাকে ছাড়াতে এলে তাকেও গাছের সাথে বেঁধে মারপিট করে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে চোর নাম দিয়ে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ১২টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত তাদেরকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের পর সদর থানার উপপরিদর্শক তুফান দুল্লাল মন্ডল তাদের দুজনকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে থানায় নিয়ে যান। পরে তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ না দেওয়ায় বা কোন প্রমান না থাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি আবারো হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

তিনি অভিযোগ করেন, তিনটি হত্যা মামলা, একটি ঘর জ্বালানো মামলাসহ কয়েকটি মামলা থেকে বাঁচাতে মুকুল, তার বাবা শাহাজাহন, মগফুর ও শাহীনসহ কয়েকজন পরিকল্পিতভাবে তাকে চুরির অভিযোগ দিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন করেছে।

এ ব্যাপারে মগফুর হোসেন জানান, তাদের গ্রামের গফুরের শ্যালো মেশিনের চুরি যাওয়া পাইপ বিক্রি করার অভিযোগে শািরফুল ও লাভলীকে মারপিট করা হয়।

সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক তুফান দুলাল মন্ডল জানান, খবর পেয়ে তিনি গাছে বাঁধা শরিফুল ও লাভলীকে মুক্ত করেন। চিকিৎসা শেষে শরিফুলকে থানায় আনা হয়। চুরির অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় তাকে সন্ধ্যার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

(আরকে/এসপি/এপ্রিল ০৭, ২০২৬)