প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী কে?
২০২৬ এপ্রিল ০৯ ১৭:২৭:১৪
শিতাংশু গুহ
আলোচিত বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডল মারা গেছেন (শনিবার ৪ঠা মার্চ ২০২৬)। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। তিনি স্বাভাবিক মৃত্যু-বরন করেছেন, কেউ তাঁকে খুন করেনি। আসলে কি তাই? ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ২০২২ সালের ২২শে মার্চ হৃদয় মন্ডল গ্রেফতার হ’ন, ১৯ দিন কারাগারে থেকে তিনি ১০ই এপ্রিল মুক্তি পান। ১৬ই আগষ্ট ২০২২ তাঁকে ধর্ম অবমাননা মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু ঘটে। ভাল শিক্ষক হিসাবে তাঁর সুনাম ছিলো। বিনোদপুর রাজকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি সিঁকি শতাব্দী বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৫৮, তিনি স্ত্রী, পুত্র ১৪, কন্যা ১০ রেখে যান। এ মৃত্যুকে কি অকাল মৃত্যু বলা যায়?
হৃদয় মন্ডল ইসলাম ধর্ম অবমাননা করেননি। বিনা অপরাধে তিনি জেল খেটেছেন। অপদস্থ হয়েছেন। লাঞ্ছিত হয়েছেন। তাঁর ছাত্ররা তাঁকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আসলে ছাত্ররা বয়স্কদের পরামর্শে শিক্ষককে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। এর পেছনে সেই পুরানো ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। হৃদয় মন্ডল স্কুলে পড়াচ্ছিলেন। গুটিকয় ছাত্র তাঁকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কিছু প্রশ্ন করছিলো, যেমন ডারউইনের জন্ম-বিবর্তনবাদ। তিনি শংকিত ছিলেন, প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু শিক্ষক হিসাবে ছাত্রের প্রশ্নের উত্তর দেয়া তাঁর দায়িত্ব। তিনি জানতেন না তার বক্তব্য রেকর্ড হচ্ছে। ডারউইনের জন্মতত্ব যেকোন ধর্মীয়তত্বের বিরুদ্ধ মতবাদ। তিনি ধরা খেলেন। ছাত্র-জনতা তাকে মারধর করলো, পুলিশে দিলো। এ অপমান কি তিনি কখনো ভুলতে পেরেছিলেন? এ অপমানের জ্বালায় কি তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ?
এমন ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম নয়, শেষও নয়, ইসলাম ও নবীর অবমাননার ভুয়া অজুহাতে হিন্দুরা প্রতিনিয়ত অত্যাচারিত হচ্ছে। রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও নেতা, জনগণ প্রায় সবাই হিন্দুদের বিপক্ষে। হিন্দু নির্যাতনের এটি একটি নুতন কৌশল। ২০১২ সালে রামু’র ঘটনা দিয়ে এর শুরু, আজো চলছে। ঐসময় জনৈক উত্তম বড়ুয়ার বিরুদ্ধে ইসলাম ও নবীর অবমাননার অভিযোগে ১০হাজার মুসলমান রামুর বৌদ্ধপল্লিতে ঝাঁপিয়ে পরে, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, মুর্ক্তি ভাঙ্গচুর, মারধর, বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস করে দেয়। গত ১৪ বছরে এর বিচার হয়নি। উত্তম বড়ুয়ার খোঁজ মেলেনি। মিলবে কি করে, উত্তম বড়ুয়া নামে ভুয়া ফেইসবুক একাউন্ট খুলে তৌহিদী জনতা এ অপকর্ম করে। এরপর ছোটবড় অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, বিচার হয়নি।
নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল ভক্তের ঘটনা সবার মনে থাকা কথা? তাকেও ইসলাম ধর্ম অবমাননার ভুয়া অভিযোগে নাজেহাল করা হয়। এক্ষত্রে একজন এমপি সেলিম ওসমান জড়িত ছিলেন। তিনি শিক্ষক শ্যামল ভক্তকে প্রকাশ্য জনারণ্যে ‘কান ধরে ওঠ-বস’ করান। পরে অবশ্য তিনি সাফাই গেয়ে বলেন, শ্যামল ভক্তকে জনরোষ থেকে বাঁচাতে তিনি ঐকাজ ক্যরেছেন? পরে প্রমান হলো শ্যামল ভক্ত ইসলাম অবমাননা করেননি। তার ছাত্ররা সাক্ষী দিলো। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। আরো পরে এই শিক্ষক বাধ্য হয়েছেন ওই অত্যাচারী এমপি’র পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে। এমপি সেলিম ওসমানের কিছুই হয়নি। ওসমান পরিবার তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ঘনিষ্ঠ ছিলো, কিছু হবার প্রশ্নই ওঠেনা। নাসিরনগর ঘটনায় এমপি হিন্দুদের ‘মালাউন’ বললেন, তারও কিচ্ছু হয়নি।
এরপর কত ঘটনা ঘটলো। রংপুর, কুমিল্লায় আগুন জ্বললো, হিন্দুর বাড়ীঘর পুড়লো, মন্দির ভাঙ্গলো, মানুষ মরলো, লুটপাট, নারী ধর্ষণ কিছুই বাকি থাকলো না? শুধু হিন্দু বিচার পেলোনা। প্রধানমন্ত্রী ‘কওমী মাতা’ হলেন, দেশ চালালেন ‘মদিনা সনদে’, জঙ্গী-মৌলবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলেন, একদিন এঁরা সবাই মিলে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশত্যাগে বাধ্য করলেন। কুমিল্লায় হিন্দুদের ওপর অত্যাচারকারী বাহার এমপি বা এমপি সেলিম ওসমান এখন ভারতে। পাপ বাপকেও ছাড়েনা। ড. ইউনূসের আমলে হাজারো শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে, এখন রাজনৈতিক সরকার আমলেও কেউ এদের কথা বলছে না? বলার কোন কারণ নেই, হিন্দু বলে শ্যামল ভক্ত বা হৃদয় মন্ডলের জন্যে কিন্তু শিক্ষক সমাজ তখন মাঠে নামেনি, তাই এখনও কেউ নামবে না। বিচারপতি সিন্হাকে বিদায় করার সময় অন্য বিচারপতিরা চুপ ছিলেন, মব ভায়োলেন্স একসাথে তাঁদের ১২জনকে বাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছে। এটাই প্রকৃতি’র নিয়ম।
লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।
